চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনভূমির দখলসহ বনজসম্পদ পাচার ঠেকাতে তৎপর বনবিভাগ

অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পর বনায়ন সৃজন, বালুভর্তি ডাম্পার ট্রাক ও বিপুল গাছ জব্দ, জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা, টহল ব্যবস্থা জোরদার

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনভূমির দখল ঠেকাতে নড়েচড়ে বসেছে বনবিভাগ। বনের গাছপালা উজাড় এবং বালুসহ বনজসম্পদ পাচার রোধেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। দিনের বেলার ন্যায় রাতেও ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে সশস্ত্র বনকর্মীদের টহল ব্যবস্থা। এতে কর্তৃপক্ষ আশা করছেন-সংরক্ষিত বনভূমি দখল রোধ করাসহ বনের ভেতর ঢুকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অনেকাংশে রোধ হবে।

শুধুমাত্র গত একসপ্তাহসহ কয়েকমাসের অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ সংরক্ষিত বনভূমি। সেখানে বনায়ন সৃজনসহ তা রক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব জায়গায় বনভূমি দখল নেওয়ার পর তা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে সেখানকার দখলবাজদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা রুজু করা হয়। এছাড়াও বনের ভেতর থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা বালু পরিবহনের সময় দুটি ডাম্পার ট্রাক, গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির কেটে ফেলা বিপুল পরিমাণ বনের গাছ জব্দসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে।

সরজমিন দেখা গেছে- কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের অধীন পাঁচটি বিট তথা ডুলাহাজারা, ফাঁসিয়াখালী, নলবিলা বিট, কাকারা ও মানিকপুর বনবিটের আওতাধীণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বনভূমির টিলা ও সমতল জায়গার যেসব স্থানে দখল করে নেওয়ার পর সেখানে অবৈধ বসতি স্থাপন করা হয়েছিল সেখানকার স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কার্যালয় সূত্র জানায়- ডুলাহাজারা বনবিটের ডুলাহাজারা স্টেশন সংলগ্ন সংরক্ষিত বনভূমির জায়গায় মুরগির ফার্ম উচ্ছেদের পর দখলবাজের বিরুদ্ধে পিওআর মামলা রুজু করা হয়েছে। মালুমঘাট বাজার সংলগ্ন বনভূমি থেকে প্রায় ২০টি অবৈধ বসতি উচ্ছেদের পর দুটি পিওআর মামলা রুজু করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত প্রায় ৪ হেক্টর বনভূমিজুড়ে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বৃক্ষরোপন কর্মসূচী উদ্বোধনের পর বনায়নের আওতায় নেওয়া হয়েছে। ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক সংলগ্ন এলাকায় স্কেভেটর দিয়ে ৩ স্থানে বিশালায়তের গর্ত করে দেওয়া হয়েছে, যাতে বনের ভেতর থেকে অবৈধ পন্থায় বালু উত্তোলনের পর পরিবহন করতে না পারে। রিজার্ভ পাড়া সংলগ্ন সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার দায়ে ৩টি পিওআরসহ একাধিক ইউডিওআর মামলা রুজু করা হয়েছে। বনকর্মীরা টহলরত অবস্থায় ৮৩ ঘনফুট গর্জন গোল কাঠ ডাম্পারসহ জব্দ এবং ১টি মামলা রুজু করা হয়েছে।

ফাঁসিয়াখালী বিটের অধীন সুয়াজিন্নাহ এলাকায় বনভূমি থেকে একটি অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে জায়গা উদ্ধারসহ মামলা রুজু করা হয়েছে। ছাইরাখালীতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ বসতি উচ্ছেদ এবং কেটে ফেলা ছাতিয়ান গোল কাঠসহ এক বনদস্যুকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। কোচা কাটায় ২টি মামলা রুজু এবং নয়াপাড়া, পেত্নীর ছড়ায় নিয়মিত নৈশকালীন অভিযান চলমান রাখা হয়েছে।

নলবিলা বিট কাম চেক স্টেশনের বার আউলিয়া নগর এলাকায় আদালতের নির্দেশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দখলে নেওয়া বনভূমি। প্যাঁচামারার দুই জায়গায় অবৈধ স্থাপনা তৈরির সময় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে। ইসলাম নগরের বনভূমি থেকে দুটি অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করা হয়েছে।

এ সময় বনকর্মীরা স্থানীয় কতিপয় নেতার নেতৃত্বে বনকর্মীদের ওপর হামলে পড়ার ঘটনা ঘটে। কাকারা বনবিটের পাহাড়তলীতে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করে দখলবাজের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে বালু পরিবহনের সময় দুটি ডাম্পার ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। শাহ ওমর নগর এলাকায় রাতের অভিযানে ১০৩ ঘনফুট আকাশমণি গোলকাঠসহ ডাম্পার গাড়ি জব্দ এবং মামলা রুজু করা হয়েছে। একই জাগায় আবারো আকাশমণি বল্লী জব্দ করা পরবর্তী মামলা দেওয়া হয়েছে। মানিকপুর বিট কাম চেক স্টেশনের আওতাধীণ ভিলেজার পাড়ায় পাহাড় কাটার চেষ্টাকালে অভিযান চালাতে গেলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। সেখান থেকে পাহাড় কাটায় ব্যবহৃত কোদালসহ বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করা হয়।

ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. খসরুল আমিন দৈনিক আজাদীকে জানান-ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জাধীণ বিভিন্ন বিটের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বনভূমি দখলে নিয়ে সেখানে অবৈধভাবে বসতি স্থাপন গড়ার কারবার বহুবছর ধরে প্রচলন ছিল। বর্তমানে এসব বিটের যেসব জায়গায় বনভূমি দখলসহ বনজসম্পদ ক্ষতির চেষ্টা করা হয়েছে তখনই বনবিভাগ সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে দখলদারিত্ব রোধ করে দিয়েছে।


রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন, ‘রেঞ্জের আওতাধীণ সকল বনবিট কর্মকর্তাসহ সকল বনকর্মীদের কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, এর পর থেকে কোথাও সংরক্ষিত বনভূমি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট বনকর্মীদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোন অবস্থাতেই সংরক্ষিত বনভূমি দখল এবং বনাঞ্চলের গাছপালা কাটাসহ সাবাড় করার ঘটনা সহ্য করা হবে না।’

এ ব্যাপারে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ-শিক্ষানবীশ) মো. কামরুল হাসান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘এই রেঞ্জে যোগদানের পর থেকেই দেখে এবং শুনে আসতেছি, এখানে অতীতে ব্যাপকভাবে সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করাসহ নতুন করে কেউ যাতে সংরক্ষিত বনভূমি দখল করতে না পারে সেজন্য বনবিভাগের নিয়োজিত সকল বিটের কর্মীকে সশস্ত্র অবস্থায় দিনে ও রাতে টহল ব্যবস্থা জোরদারের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কোথাও বনভূমি দখলচেষ্টার খবর আসলেই সাথে সাথে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার মাধ্যমে সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে প্রবেশও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধক্যানভাসে ফিলিস্তিনি শিশুদের মুক্তির স্বপ্ন