ঘামে ভেজা মজুরি কেন আটকে থাকে

মুহাম্মদ এনামুল হক মিঠু | শনিবার , ৯ মে, ২০২৬ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি নিঃসন্দেহে তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে। বিশ্ববাজারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ আজ এক শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সেই গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন বাস্তবতা কি সত্যিই ততটা উজ্জ্বল?

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনও অনেক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন, ওভারটাইম (ওটি) এবং অন্যান্য ভাতা সময়মতো পরিশোধ করা হয় না। কখনও সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনও মাসের পর মাস বেতন আটকে থাকে। অথচ শ্রমিকরা প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের বাইরে অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে উৎপাদনের চাকা সচল রাখেন। তাদের এই ঘামঝরা পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য না দেওয়া শুধু অন্যায় নয়, এটি সরাসরি অমানবিক আচরণ ।

একজন শ্রমিকের জীবনের সাথে এই বেতন ও ভাতা কতটা গভীরভাবে জড়িত, তা আমরা অনেকেই উপলব্ধি করি না। তাদের মাসিক আয়ের ওপর নির্ভর করে সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা সহ সবকিছু। বেতন আটকে গেলে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, একটি পরিবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধারদেনা করে বা অর্ধাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হন তারা।

শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেতন প্রদান বাধ্যতামূলক। একইভাবে ওভারটাইমের অর্থও যথাযথ হারে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান নানা অজুহাতে এই নিয়ম লঙ্ঘন করে থাকে। কখনও আর্থিক সংকট, কখনও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, কারণ যাই হোক না কেন, এর দায় শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

এটি শুধু মানবিকতার প্রশ্ন নয়, বরং একটি দেশের সুনামের সাথেও জড়িত। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার ওপর। যদি বারবার শ্রমিক অসন্তোষ, বেতন বকেয়া বা অমানবিক আচরণের খবর প্রকাশ পায়, তবে বিদেশি ক্রেতারা আস্থা হারাতে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো শিল্পখাত।

এ অবস্থায় প্রয়োজন কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত পরিদর্শন জোরদার করতে হবে এবং বেতন বকেয়া রাখার মতো অপরাধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি মালিকপক্ষকেও উপলব্ধি করতে হবে, শ্রমিকরা কেবল উৎপাদনের একটি উপাদান নয়, তারা এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না করে উন্নয়নের গল্প কখনও পূর্ণতা পায় না।

অতএব, সময় এসেছে সচেতন হওয়ার। শ্রমিকদের বেতন, ওভারটাইম ও অন্যান্য ভাতা সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করা শুধু আইনগত দায়িত্ব নয়, এটি মানবিক দায়বদ্ধতা। কারণ, যে হাতগুলো আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, সেই হাতগুলো যেন বঞ্চনার শৃঙ্খলে আবদ্ধ না থাকে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক
পরবর্তী নিবন্ধকর্মের ফল