স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে বলে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা আসার পর চট্টগ্রামের গ্রামেগঞ্জে আবারও শুরু হয়েছে নির্বাচনী তোড়জোড়। ইউনিয়নের চায়ের দোকান থেকে হাট–বাজার, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে উঠান বৈঠক–সবখানেই এখন আলোচনায় নির্বাচন। সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীরা নীরবে–নিভৃতে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। কেউ এলাকায় সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হচ্ছেন, কেউ ছুটছেন আত্মীয়–স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে। আবার কেউ কেউ এরই মধ্যে নিজের প্রার্থিতার জানান দিতে শুরু করেছেন প্রকাশ্যেই। ফলে বেশ জমতে শুরু করেছে নির্বাচনী আবহ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকেই চট্টগ্রামের গ্রামীণ জনপদে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে এই তৎপরতা শুরু হলেও সামপ্রতিক সময়ে তা আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে। নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর ইসি জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে এবং চলতি সেপ্টেম্বরেই তফসিল সম্পর্কে বলা যাবে এবং নভেম্বরেই নির্বাচন হতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, জেলার ১৬টি উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ১৮৯টি। এসব ইউনিয়নে ভোটকেন্দ্র ১ হাজার ৮১৭টি এবং ভোটকক্ষ ৮ হাজার ১৪৩টি। এর মধ্যে স্থায়ী ভোটকেন্দ্র ১ হাজার ৭৮৮টি ও অস্থায়ী ২৯টি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা ৪১ লাখ ৩৭ হাজার ৪২৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২১ লাখ ৮৫ হাজার ২৪০ এবং নারী ভোটার ১৯ লাখ ৫২ হাজার ১৭১ জন।
চট্টগ্রামের ১৮৯টি ইউনিয়ন শুধু সংখ্যার দিক থেকেই বড় নির্বাচনী এলাকা নয়, ভোটারের দিক থেকেও এটি জেলার সবচেয়ে বিস্তৃত স্থানীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী এখন মাঠে। জেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত, পরিদর্শন ও ভোটারসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ–চার স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
এদিকে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল এখনো ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠ সরগরম করে তুলছেন। বিভিন্ন ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে একাধিক ব্যক্তির নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের অনেকে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন। কেউ নিয়মিত সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন, কেউ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছেন। আবার কেউ ভোটারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। কোথাও কোথাও একই দলের একাধিক প্রার্থী এবং আন্তঃকোন্দলেরও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও সহিংসতারও আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে।
এবারের স্থানীয় নির্বাচন আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় রাজনৈতিকভাবে কিছুটা ভিন্ন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না–এমন পরিবর্তনের কারণে দলগুলোর স্থানীয় পর্যায়ের হিসাব–নিকাশও বদলে গেছে। ফলে দলীয় মনোনয়ন বা প্রতীকের পরিবর্তে ব্যক্তি পরিচিতি, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান এবং নিজস্ব ভোটব্যাংক অনেক প্রার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তৃণমূল পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় নেতারাও নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সামনে আনার চেষ্টা করছেন। কোথাও একাধিক প্রার্থী থাকায় অভ্যন্তরীণ সমীকরণও তৈরি হচ্ছে। আবার কোনো কোনো ইউনিয়নে পুরোনো জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। এসব এলাকায় নতুন মুখও আলোচনায় আসছেন।
এবারের নির্বাচনে তরুণ প্রার্থীদের উপস্থিতিও বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। দীর্ঘদিনের স্থানীয় রাজনীতির বাইরে থাকা অনেক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মানবিক কর্মকাণ্ড, ক্রীড়া ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করে এখন নির্বাচনী মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ সরাসরি ভোটের কথা না বললেও নিয়মিত গণসংযোগ করছেন।
চট্টগ্রামের ১৮৯ ইউনিয়নের মধ্যে ভোটার সংখ্যার দিক থেকেও রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। কোনো ইউনিয়নে ভোটার তুলনামূলক কম, আবার কোনো ইউনিয়নে বেশি ভোটার রয়েছে। ফলে প্রতিটি ইউনিয়নের নির্বাচনী সমীকরণও আলাদা। কোথাও পারিবারিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও রাজনৈতিক সংগঠন, আবার কোথাও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, জাতীয় নির্বাচন যেখানে মূলত দল ও জাতীয় ইস্যুকেন্দ্রিক, সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনেক বেশি ব্যক্তি ও এলাকাকেন্দ্রিক। চেয়ারম্যান বা সদস্য প্রার্থীকে ভোটাররা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। কে এলাকায় থাকেন, বিপদে–আপদে পাশে দাঁড়ান, সামাজিক বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রাখেন কিংবা সরকারি সেবা পেতে সহযোগিতা করেন–এসব বিষয়ও ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচন কমিশনেও বেশ জোরেশোরে প্রস্তুতি চলছে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, চট্টগ্রামের ১৮৯ ইউনিয়নের জন্য চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে আগস্টে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মোট ভোটার ছিল ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৯ জন। পরবর্তী যাচাই–বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ লাখ ৩৭ হাজার ৪২৭ জন।
ইউনিয়ন পরিষদের ভোটারেরা নির্বাচনে ভোট প্রদান এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। বিশেষ করে বিগত ইউনিয়ন পরিষদ বাতিল করার পর উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিজেদের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে একেকজন কয়েকটি করে ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পালন করছেন। এতে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ার পাশাপাশি নাগরিক সুবিধাগুলোও ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। বিশেষ করে জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এতে করে তফসিল ঘোষণার আগেই চট্টগ্রামের গ্রামীণ জনপদে নির্বাচনের উত্তাপ বাড়ছে। ১৮৯ ইউনিয়নের ৪১ লাখের বেশি ভোটারকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের গণসংযোগ, সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে সরব হওয়া এবং সমর্থক–কর্মীদের সংগঠিত করার তৎপরতা আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়বে। তফসিল ঘোষণার পর এই নীরব প্রস্তুতিই প্রকাশ্য নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেবে বলেও সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।











