গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ

এমআরডিআই আয়োজিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভা

| সোমবার , ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:৩৪ পূর্বাহ্ণ

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে নীতিগত আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিভাগের গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। তারা বলেন, বিচ্ছিন্ন ও আংশিক পদক্ষেপের পরিবর্তে সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কার, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার জরুরি। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব স্ব–নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও জোরদার করার তাগিদ দেন তারা।

তাদের মতে, স্পষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং পাঠক–দর্শকের জন্য কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর উপায় হতে পারে। তারা আরও বলেন, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের পেশাগত ও নৈতিক মান নিশ্চিত করা গেলে সংবাদমাধ্যমের প্রতি পাঠক–দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়ন এবং কার্যকর স্ব–নিয়ন্ত্রণের একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো যাচাইয়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসেবে গতকাল রোববার চট্টগ্রামে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। খুলনা, বরিশাল ও সিলেটের পর এটি এমআরডিআই–এর বিভাগীয় মতবিনিময় সভার চতুর্থ আয়োজন, যা হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশ–এর অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভস (সিএফএলআই)-এর আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। সভায় চট্টগ্রাম ও বিভাগের অন্যান্য জেলা থেকে সংবাদমাধ্যমের মালিক ও প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদ সিদ্ধান্তগ্রহীতা, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় এমআরডিআই–এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, স্ব–নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ তত কমবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় নিজস্ব জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার প্রতি পাঠক–দর্শকের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পাঠক, শ্রোতা ও দর্শকের সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা থাকবে, ততক্ষণ সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে। এই আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি সাংবাদিকদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন। সংবাদমাধ্যম সংস্কারে এমআরডিআই–এর পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০২৫–২০৩০)-এর অংশ হিসেবে স্ব–নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সভায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে নীতিগত আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সুপারিশগুলো দেশের সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হওয়ায় এগুলো বাস্তবায়নে স্বচ্ছ, সমন্বিত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ প্রয়োজন।

তারা মত দেন, সংস্কার বাস্তবায়ন কার্যক্রম নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সীমিত না রেখে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। আইন, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় সামগ্রিক সংস্কারই সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সংস্কারের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান এবং দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, ‘সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা শুধু আমাদের একার কথা নয়; সম্পাদক, মালিক ও সাংবাদিকসহ পুরো ইন্ডাস্ট্রির সম্মিলিত মতামত। একটি স্বাধীন স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠনের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে এবং নিজস্ব নৈতিক আচরণবিধির ভিত্তিতে কার্যকর স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

এই বিষয়ে রেজোয়ানুল হক রাজা, পরিচালক, নিউজ এন্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, চ্যানেল এস, বলেন, ‘আমরা যত বেশি খাঁটি ও পেশাদার সাংবাদিকতা করতে পারব, বাইরে থেকে আসা চাপ মোকাবিলা করার মতো শক্তি ও সাহস তত বেশি পাব। এটাই স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মূল কথা। আমরা অন্যের জবাবদিহিতা চাওয়ার আগে নিজেদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। নিজেদের দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই আমরা অন্যদের ব্যাপারে জোর দিয়ে কথা বলতে পারব।’

আলোচনায় আরও অংশ নেন দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম রমিজউদ্দীন চৌধুরী, সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ, দৈনিক পিপলস ভিউ সম্পাদক ওসমান গণি মনসুর, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদুল করিম কচি, চট্টগ্রাম এডিটরস ক্লাব সভাপতি এম আলী হোসেন, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ, ইলমার প্রধান নির্বাহী জেসমিন সুলতানা পারু, ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) এর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী ড. মো: আরিফুর রহমান, ইন্টিগ্রেটেড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট এফোর্ট (আইএসডিই) নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজির হোসেন, চবি যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ বিভাগীয় প্রধান শাহাব উদ্দিন নিপু, বিজেসি ট্র্‌াস্ট ইউনির্ভাসিটি বাংলাদেশের জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজের বিভাগীয় প্রধান ইয়াসের সিলমি, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজের বিভাগীয় প্রধান দিলরুবা আক্তার, টিভি জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি শামসুল হক হায়দারী, দৈনিক রাঙ্গামাটির সম্পাদক আনোয়ার আল হক, দৈনিক সচিত্র নোয়াখালীর সম্পাদক আমিরুল ইসলাম হারুন, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রিপন চাকমা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান। খবর প্রেস বিজ্ঞপ্তির।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআগামী নির্বাচন অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম হবে সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সমপ্রীতির নগরী