গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

মুসলেহ্‌উদ্দিন মুহম্মদ বদরুল | সোমবার , ৫ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ


পাক-ভারত-বাংলা উপ মহাদেশের যে সকল কিংবদন্তি, জননন্দিত রাজনৈতিক নেতৃবর্গ দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজকে উৎসর্গ করেছিলেন তম্মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অন্যতম।

শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ বলা হয় তাঁকে। যেমন বঙ্গবন্ধু, শেরে বাংলা, মজলুম জননেতা বিশেষণগুলো উচ্চারণ করলেই কাকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে বুঝতে অসুবিধা হয় না তেমনি গণতন্ত্রের মানসপুত্র বললেই কোন সেই মহান ব্যক্তি তা’ সহজেই অনুমেয়। উল্লেখিত উপাধিগুলো ব্যক্তির নামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক গুরু ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও সুপরিচিত, কিংবদন্তী এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুবার্ষিকী ৫ ডিসেম্বর।

গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে গেছেন এই মহান নেতা। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক
রাজনীতিবিদ হিসেবেও তিনি এ দেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে একজন সূর্য সন্তান হিসেবে সুপরিচিত। পাক আমলে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদী ছিলেন রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই নক্ষত্রসমূহ থেকে বিচ্ছুরিত হয়েছে রাজনীতিতে সততা, নীতি-নৈতিকতার আলো, দেশপ্রেমের আলো।

পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের এক সম্‌ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের খ্যাতনামা বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দী ও নামকরা উর্দু সাহিত্যিক খুজাস্তা আখতার বানুর কনিষ্ঠ সন্তান। তাঁর পরিবারের সদস্যবর্গ তৎকালীন ভারতবর্ষের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের প্রথা অনুসারে উর্দুভাষী ছিলেন। কিন্তু, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল সোহরাওয়ার্দীর গভীর অনুরাগ। তাই, তিনি নিজ উদ্যোগে বাংলা ভাষা শেখেন এবং বাংলার চর্চা করেন। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষাজীবন শুরু করার পর ভর্তি হন সেইন্ট জ্যাভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর সোহরাওয়ার্দী তাঁর মায়ের নির্দেশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা এবং সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময় নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ১৯২৪ সালে কলকাতা করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র, ১৯৩৭ সালে ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার শ্রম ও বাণিজ্যমন্ত্রী, ১৯৪৩-৪৫ সালে খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী, ১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪-৫৫ সালে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী এবং ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত ১৩ মাস পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম ও প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরে গণতন্ত্রকামী বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনেও ছিল তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব।

জীবদ্দশায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাই, তৎকালীন যে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন সেই স্থানটিকে স্বাধীনতার পর নামকরণ করা হয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’।

পূর্ব বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ ও বৈষম্যের প্রতিবাদে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আর সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন পুরোধা হিসেবে সোহরাওয়ার্দী স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ইতিহাসের পাতায়। ইতিহাসের নায়ক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ৭১ বছর বয়সে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের একটি হোটেল কক্ষে নিঃসঙ্গ অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ঢাকা হাইকোর্টের পাশে তিন নেতার মাজারে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন উপ মহাদেশের অবিসংবাদিত নেতা, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আল্লাহ এই প্রিয় নেতাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন। আমিন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সমাজব্রতী