খাগড়াছড়িতে অতি ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে শুরু হয়ে বৃষ্টি চলে ভোর ৪টা পর্যন্ত। ভারী বর্ষণের পাশাপাশি উজানে ঢলের কারণে মাইনী নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। মাত্র ৩ ঘণ্টায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মেরুং, কবাখালি ও বোয়ালখালীর নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়। দীঘিনালা–মেরুং সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। ডুবে যায় আমনের ক্ষেত। অনেক এলাকায় পানি বেড়ে যাওয়ায় ঘর–বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। আকস্মিক বৃষ্টির কারণে ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। এছাড়া পাহাড় ধসের কারণে খাগড়াছড়ি–দীঘিনালা সড়কে যানবাহন চলাচল দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল। পরে সড়ক বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ প্রচেষ্টায় সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা সুজিত দে ও লোকমান হোসেন জানান, হঠাৎ করেই বৃষ্টিপাত শুরু হয়। রাত ১২টায় শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত অবিরাম বর্ষণ চলে। ভোর ৪টা থেকে পানি ঢুকতে শুরু করে। দীঘিনালার চৌমুহনী এলাকার জগন্নাথ পাড়ার বাসিন্দা মৃদুল নাথ জানান, রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে দেখি ঘরে পানি ঢুকে গেছে। গত মাসের শুরুতে যে বন্যা হয়েছিল তখন আমাদের বাসায় পানি ঢুকেনি। কিন্তু গতরাতের মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানি ঢুকে গেছে। আশপাশের যে পাহাড়ি ছড়াগুলো রয়েছে সেগুলোতেও প্রচুর পানি। আশপাশের এলাকা ডুবে গেছে। মাইনী নদীর পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি পাহাড়ি ছড়াগুলো হরকা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড তৈরি হয়েছে। বোয়ালখালী ছড়ার পানি বেড়ে জামতলীর নিচু এলাকা ডুবে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা গণেশ ত্রিপুরা জানান, রাতে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ভোর থেকে সব বদলে যায়। ছড়ায় খুব একটা পানি ছিল না। এতো বৃষ্টি এ বছরে আর দেখিনি। মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা টানা বর্ষণ হয়েছে। ছড়ার উপরের দিকে তৈদুছড়াসহ অন্যান্য যে এলাকাগুলো রয়েছে সেখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। ছড়ার পানি বেড়ে এখানকার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূধি চাকমা বলেন, গতকাল রাতে ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে এতো অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড আগে হয়নি।
এদিকে খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসে দীঘিনালা–সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল প্রায় ৪ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। সড়ক থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর দুপুর ১টা থেকে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৌম্য তালুকদার বলেন, খাগড়াছড়ি–দীঘিনালা সড়কের ৫ মাইল ও ৯ মাইল এলাকায় সড়ক ধসে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। যে অংশটি ধসেছে সেটি বেশ বড়। তবে আমরা খবর পাওয়ার পর মাটি সরানোর কাজ শুরু করি। সকাল ৯টা থেকে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
খামার ডুবে মারা গেল ১৫০০ মুরগী : জেলার দীঘিনালার সুধীর মেম্বার পাড়ায় বোয়ালখালী ছড়ার পানি বেড়ে তলিয়ে গেছে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা ইয়াসিন আক্তারের মুরগীর খামার। মারা গেছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ সোনালী মুরগী। ১৭ বছর ধরে খামার করা ইয়াসিন আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখী হননি বলে জানান।
গতকাল বিকেলে তার ক্ষতিগ্রস্ত খামারে গেলে তিনি জানান, আমরা তো ঘুমাই গেছি বলতেও পারি না। যখন উঠছি দেখি খামার ঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। দুটা মুরগীর শেডে ১৫০০ মুরগী ছিল। সব মারা গেছে। আমার ৩.৫ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকার মত ক্ষতি হবে। আমি তো ঋণ করে মুরগীর খামার করেছি। কিস্তিওয়ালা মানবে না। সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য পেলে আমি একটু দাঁড়াতে পারব। ইয়াসমিনের ভাই ওসমান গণি বলেন, তারা অনেক কষ্টে খামারটা গড়ে তুলেছে। দেড় হাজার মুরগী ছিল। প্রতিটি মুরগীর ওজন ৫শ গ্রাম হয়েছে। আর অল্প কিছুদিন পর বিক্রি করার কথা ছিল। কিন্তু রাতের বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ইয়াসমিন আক্তারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তানজিল পারভেজ বলেন, পাহাড়ি ঢলে ও ভারী বর্ষণে ইয়াসমিন আক্তারের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি শুনেছি। জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত খামারির পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর যৌথভাবে আমরা তাকে সহযোগিতা করব।












