কোরবানি পশুর সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

ড. মোঃ ইকবাল সরোয়ার | মঙ্গলবার , ২৬ মে, ২০২৬ at ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ

মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ উল আযহা তথা কোরবানির ঈদ আগামী ২৮ মে, ২০২৬ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মহান আল্লাহর সন্তষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহিম (🙂 তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (:)-কে কোরবানি দিতে উদ্যত হওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষিতে ও মহান ত্যাগের মহিমার স্মরণে পালিত হয় পবিত্র ঈদ উল আযহা। সামর্থবান মুসলিমদের জন্য পশু কোরবানি ওয়াজিব। বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালেেয়র অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেবে গত (২০২৫ সালে) ঈদ উল আযহায় বাংলাদেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে গরুমহিষ কোরবানি হয়েছে ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৫টি; ছাগল ভেড়া কোরবানি ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি এবং অন্যান্য পশু (উট, দুম্বা ইত্যাদি) কোরবানি হয়েছে ৯৬০টি। ঢাকা বিভাগে পশু কোরবানি হয়েছে ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে পশু কোরবানি হয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৭৩১টি। বাংলাদেশে প্রধান এলাকা সমুহে এই বৃহৎ সংখ্যক পশুর এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পবিত্র ঈদ উল আযহার সময় বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। মুসলিম বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে পশু কোরবানির জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সেসব দেশে যারা কোরবানি দিবেন তারা পছন্দ সই পশু ক্রয় করে নির্ধারিত স্থানে দিয়ে দেন। পরবর্তীতে কোরবানির ঈদের দিন পশুগুলোকে হালাল ও স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে জবেহ করে চামড়া, হাড়, মাংস ও বর্জ্য পৃথক করে কোরবানি দাতার নিকট প্রেরণ করেন। চামড়া সমূহ প্রক্রিয়াজাত করার জন্য নির্ধারিত স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে পরিবেশ যেমন সুন্দর থাকে তেমনি কোরবানির মাংস সমূহও রোগ জীবাণুমুক্ত থাকে।

মানুষের নানাবিধ চাহিদা ও ভোগের একটি বিরাট অংশ পরিণত হচ্ছে বহুমাত্রিক বর্জ্যে। গৃহস্থালী, শিল্প কারখানা, মেডিকেল, বাজার, যানবাহন ও সমুদ্রযান ইত্যাদি বিভিন্ন উৎস থেকে মূলত: কঠিন, তরল ও বায়বীয় বর্জ্য উৎপাদিত হয়। তেমনি ভাবে ঈদ উল আযহায় পশু কোরবানি ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরণের বর্জ্য উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশে আগামী ঈদ উল আযহা পরবর্তী টেকসই পরিবেশের জন্য মূলত যে চ্যালেঞ্জ সমূহ মোকাবেলা করতে হবে তার মধ্যে অন্যতম হলো: কোরবানি পশু ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বর্জ্যের যথাযথব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশের শহর এলাকায় এখনো পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না উঠায় টেকসই নগর পরিবেশ নিশ্চত করা বিশাল একটা চ্যালেঞ্জ। নগর পরিবেশের এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে একটি মূখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে পরিগণিত। এজন্য সকল পর্যায় থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কোরবানি পশু ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি। কোরবানি পশুর সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করে প্রতি বছর দেশের প্রধান সিটি কর্পোরেশনগুলোতে এলাকা ভিত্তিক পশু বিক্রি ও পশু কোরবানি দেয়ার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় এবং সেসব স্থানে পশু কোরবানি দিতে উৎসাহিত করা হয়, যাতে সহজে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সহজে অল্প সময়ের মধ্যে পশু কোরবানির বর্জ্য সঠিক ভাবে অপসারণ করা যায়।

কোরবানির বর্জ্য বলতে, পশুর যে অংশ খাওয়া যায় না, ফেলে দেয়া হয় সে অংশকে বুঝায়। যেমনপশু জবাই করার পর নির্গত রক্ত, পাকস্থলীতে থাকা অপাচ্য খাবার ও গোবর, পশুর পরিপাকতন্ত্রের অংশ, অপ্রয়োজনীয় হাড়, পায়ের খুর, শিং এবং চর্বি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় নিজেদের কোরবানি পশু নিজেরা বা অদক্ষ মাঠ পর্যায়ের কর্মী দ্বারা জবেহ করে চামড়া, হাড়, মাংস ও বর্জ্যসমূহ পৃথক করে। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, অসাবধনতার কারণে কোরবানি পশুর মাংসে রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে, অদক্ষ কর্মীর হাতের কারণে মূল্যবান চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয় এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে পরিবেশ দূষণ হয়। আমাদের দেশে দেখা যায়, কোরবানির ঈদ পরবর্তী কয়েকদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মহানগরীতে অপরিকল্পিতভাবে পশু কোরবানি দেয়াতে এবং সচেতনতার অভাবে রক্ত সমূহ জমাট থেকে কয়েকদিন জুড়ে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ায়। পশু জবাই পরবর্তী মাংসের উচ্ছিষ্ট অংশ যত্রতত্র ফেলে দেয়ার ফলেও দুইতিনদিন পর এগুলো পচে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং পরিবেশ দূষণ করে। অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়, বিভিন্ন পশু বর্জ্য ও চাটাই সমূহ জলাশয় ও পানির ড্রেনেজ লাইনে ফেলে রাখা হয় পরবর্তীতে যা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যহত করে। সামনের মাসেই আসছে বর্ষাকাল। কোরবানির ঈদ পরবর্তী বৃষ্টির পানিতে এসমস্ত বর্জ্য মিশ্রিত হয়ে নোংরা পরিবেশের সাথে বৃদ্ধি করতে পারে মশার উপদ্রব, ফলে ডেঙ্গু সহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমনিতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা ৫শ ছুঁই ছুঁই, তার উপর মশাবাহিত ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে দেশে অবস্থা হবে ভয়াবহ। সূতরাং এই বিষয়ে আমাদের যথাযথ পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা জরুরি।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন সমূহ আসন্ন ঈদ উল আযহা উপলক্ষে কোরবানি পশুর বর্জ্য পরিবেশ সম্মতভাবে ও দ্রুততম সময়ে অপসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। যেমনডিএনসিসি ঈদ উল আযহার দিন দুপুর ১২ টা থেকে পরবর্তী ৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম দিনের কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং নাগরিকদের মধ্যে ১ লক্ষ ৪০ হাজার বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ, ৪০ লক্ষ টন ব্লিচিং পাউডার ও ১ লক্ষ ৫০ হাজার লিটার স্যাভলন বিতরণ শুরু করেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা শাহাদাত হোসেন কোরবানি পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বন্দন নগরীর জন্য। যেমনচট্টগ্রামের ৪১টি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ছুটি বাতিল করে তিন দাপে বর্জ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রস্তত রাখা হয়েছে ৩৫০টি মতো যানবাহন। চট্টগ্রামে বর্ষায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেজন্য পশুর বর্জ্য নালা ও খালে না ফেলার জন্য করা হচ্ছে মাইকিং। কোরবানি পশুর বর্জ্য পরিবেশ সম্মত উপায়ে অপসারণ করতে হলে প্রয়োজননির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি পশু জবাই করা, কোরবানি পশুর রক্ত দ্রুততম সময়ে মাটি চাপা দেয়া, এবং নির্দিষ্ট ব্যাগে উচ্ছিষ্ট অংশ সমূহ জমা করতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ। কোরবানি পশু উম্মুক্ত রাস্তায় বা গলি পথে জবাই না করে এলাকার সকলে একটি নির্দিষ্ট মাঠে কোরবানি পশু জবাই করার উদ্যোগ প্রয়োজন। কোরবানি পশু জবাই করার পূর্বেই পর্যাপ্ত পানি, ঝাড়ু, ব্লিচিং পাউডার, ও বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যাগ সাথে রাখা উচিত। কোরবানি পশুর চামড়া ও মাংসের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে ধর্মীয় ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানি পশু জবাই ও মাংস প্রস্তত বিষয়ে মসজিদের ইমাম ও মাংস প্রস্ততকারীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষন প্রয়োজন। বাংলাদেশের গরুর চামড়া একটি অন্যতম রপ্তানীযোগ্য জাতীয় সম্পদ। বাংলাদেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ পশু চামড়া সংগৃহীত হয়, তার অধিকাংশ আসে ঈদ উল আযহার কোরবানি পশু থেকে। কিন্ত চামড়া ছড়ানোর যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় এই জাতীয় সম্পদের গুণগত মান বজায় থাকে না এবং উপরন্তু পাশ্ববর্তী এলাকায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। পশুর উচ্ছিষ্ট বর্জ্য বাতাসকে দ্রুত দূষিত করে এবং রোগব্যাধির বিস্তার ঘটায়, বিধায় কোরবানিদাতার প্রথম কাজ হওয়া উচিৎ পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা।

লেখক: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকোরবানি : একাল-সেকাল
পরবর্তী নিবন্ধস্মৃতির পাতায় কুরবানির ঈদ