কেন এবার শীত আসতে বিলম্ব

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ

নগরে গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। একইদিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। আগের দিন অর্থাৎ সোমবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের এ তথ্যে স্পষ্ট বর্তমানে স্বাভাবিক তাপামাত্রা বিরাজ করছে না। মৌসুম অনুযায়ী তাপমাত্রা কমার বদলে বেড়েছে। ফলে মৌসুম শুরু হলেও চট্টগ্রামে এখনো অনুভূত হচ্ছে না শীত। অথচ অতীতে মধ্য নভেম্বর হালকা শীত শুরু হত। যা ধীরে ধীরে ডিসেম্বর মাস থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত স্থায়ী হত। ওই হিসেবে মৌসুম শুরু হলেও নগরে এখনো শীত পড়ছে না। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এবার শীত আসতে বিলম্ব হচ্ছে?

এদিকে প্রায় প্রতিদিন আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাস দিলেও নগরে কুয়াশাও তেমন পড়ছে না। অবশ্য গ্রামে শহরের চেয়ে ফাঁকা জায়গার আধিক্য থাকায় ভোরবেলা সেখানে কুয়াশা পড়ছে। এর প্রভাবে হালকা শীতও অনুভূত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

শীত আসতে বিলম্বের কারণ : শীত অনুভূত হওয়ার অন্যতম উপাদান মৌসুমী বায়ু। বাংলাদেশে শীত মৌসুমে শুষ্ক মৌসুমী বায়ু আসে উত্তর-পূর্ব থেকে। মূলত এ বায়ুর প্রভাবে এখানে অনুভূত হয় শীত। এবার শীতকালীন বায়ু-প্রবাহ এখনো শুরু হয়নি। তাই শীতও অনুভূত হচ্ছে না।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, বর্তমানে দক্ষিণ আন্দামান সাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে একটি লঘুচাপ। যেটা সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে দক্ষিণপূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরো ঘণীভূত হতে পারে। এর বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। আবহাওয়াবিদগণ বলছেন, বাংলাদেশ থেকে দূরে অবস্থান করলেও এ লঘুচাপটির প্রভাবে এ সময়ে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে প্রবাহিত হচ্ছে না শীতকালীন বায়ুপ্রবাহ।

আবহাওয়া অধিদপ্তর ডিসেম্বর মাসের জন্য দেয়া দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে বঙ্গোপসাগরে ১-২টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি নিম্নচাপে রূপ নিতে পারে। এর আগে গত মাসেও (নভেম্বর) দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে ১০ নভেম্বর দক্ষিণ পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। সু-স্পষ্ট লঘুচাপটি ১২ নভেম্বর দুর্বল লঘুচাপে পরিণত হয় এবং পরদিন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এছাড়া ১৭ নভেম্বর আরেকটি লঘুচপ সৃষ্টি হয়। যেটা ২০ নভেম্বর নিম্নচাপে পরিণত হয়। অবশ্য ২৩ নভেম্বর আবারো লঘুচাপে পরিণত হয় এবং ২৪ নভেম্বর গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। লঘুচাপের প্রভাবে গত মাসেও স্বাভাবিক বায়ু প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। উল্লেখ্য গত মাসেও সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের বেশি ছিল।

মধ্য ডিসেম্বরে শীতের আভাস : আবহাওয়া অধিদপ্তর ডিসেম্বর মাসের জন্য দেয়া দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের তথ্য অনুযায়ী, এ মাসে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পারে। মাসের শেষার্ধ্বে দেশের কোথাও কোথাও ১-২টি মৃদু (৮-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) অথবা মাঝারি (৬-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। দেশের নদী অববাহিকায় ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত মাঝারি থেকে ঘন এবং অন্যত্র হালকা মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে।

এছাড়া নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মাসে (জানুয়ারি) দেশে ২-৩টি মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। যার মধ্যে দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহে (৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রূপ নিতে পারে। জানুয়ারি মাসে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে এবং নদ-নদী অববাহিকায় মাঝারি অথবা ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র হালকা অথবা মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আবহাওয়ার ভাষায় শীতকাল হচ্ছে তিন মাস। সেটা হচ্ছে ডিসেম্বর, জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি। ওই হিসেবে শীতের মৌসুম সবে মাত্র শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণপ্রান্তে। মৌসুমের শুরুতে উত্তরাঞ্চলে শীত একটু অনুভূত হয়। চট্টগ্রামে সেটা আসতে একটু সময় নেয়। তাই এখানে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বা একটু পরে শীত অনুভূত হতে পারে। এ আবহাওয়াাবিদ বলেন, সাগরে একটা লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা হচ্ছে। সেটাও তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। তবে এটা ৯ তারিখের পর কেটে যেতে পারে। এরপর শীতকালীন বায়ু-প্রবাহ অর্থাৎ উত্তর, উত্তর-পূর্ব বায়ু প্রবাহ স্বাভাবিক হলে শীতের অনুভূতি শুরু হবে। ফলে বর্তমানে আবহাওয়ার যে অবস্থান সেটা দেখে মনে হচ্ছে ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে এসে চট্টগ্রামে শীত অনুভূত হতে পারে। এরপর সেটা ধীরে ধীরে বাড়বে। সবচেয়ে শীতল মাস থাকবে জানুয়ারি।

সম্ভাব্য লঘুচাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা অনেক দূরে। তারপরও স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহকে একটু বাধাগ্রস্ত করছে। যার কারণে গরমের অনুভূতিটা একটু থেকে যায়। তাই লঘুচাপ কেটে গেলে শীতের যে স্বাভাবিক বায়ু প্রবাহ সেটা শুরু হবে এবং শীত অনুভূত হবে।

গ্রামে কুয়াশা পড়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, শহরের বিষয়টি একটু ভিন্ন। এখানে দূষণ বেশি। অবকাঠামো বেশি, ফাঁকা জায়গা কম। কিন্তু গ্রামে ফাঁকা জায়গা বেশি। ফাঁকা জায়গায় বায়ু প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে সেখানে কুয়াশা পড়ছে। আমরাও কুয়াশার পূর্বাভাস দিচ্ছি। যেহেতু গ্রামে কুয়াশা পড়া শুরু হয়েছে তাই শীতটাও অনুভূত হচ্ছে।