কিশোরটির সাথে অমানবিক আচরণ

জলাতঙ্ক সন্দেহে বেঁধে রাখা হয়, পানিও দেওয়া হয়নি তিন হাসপাতাল ঘুরে আবার চমেকে কিশোরটি জলাতঙ্ক আক্রান্ত নয় : চিকিৎসক

জাহেদুল কবির | সোমবার , ১১ মে, ২০২৬ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মূল গেটের বিপরীতে ওষুধের দোকানের সরু গলিতে আনুমানিক ১২ বছরের এক কিশোর হাঁটু গেড়ে বসে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করছিল। কয়েক ফুট দূর থেকে দৃশ্যটি দেখছিলেন উৎসুক লোকজন। ভয়ে কেউ ওই কিশোরের কাছে ঘেঁষছেন না। কেউ বলাবলি করছেন, ছেলেটিকে কোনো একসময় কুকুর কামড়েছে, তাই তার জলাতঙ্ক হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত শনিবারে এ ধরনের ভিডিও ভাইরাল হয়। সাধারণ লোকজনের ধারণা, ছেলেটি যেহেতু জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়েছে, তাই সে যদি কাউকে কামড় দেয়, তবে তারও জলাতঙ্ক হবে। এর মধ্যে কিছু লোক তাকে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে।

চিকিৎসকরা বলছেন, জলাতঙ্ক রোগ বা র‌্যাবিস ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। কামড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ানোর প্রশ্নই আসে না। পরে স্থানীয় কিছু সমাজকর্মী ছেলেটিকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যান। চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে পাঠান আন্দরকিল্লার ২৫০ শয্যার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। সেখান থেকে তাকে রেফার করা হয় সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসকরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে নিশ্চিত হন ছেলেটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়নি। তবে তার শারীরিক, মানসিক ও ব্রেনের সমস্যা রয়েছে। ছেলেটিকে তাই বিআইটিআইডি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফের চমেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।

বিআইটিআইডি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ আজাদীকে বলেন, এক কিশোরকে আমাদের হাসপাতালে আনা হয়। আমরা নিশ্চিত হয়েছি ছেলেটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত নয়। তবে ছেলেটির কিছু অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করলাম। সেটি হলো, সে হাঁটু ও হাতের তালুয় ভর করে হাঁটে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সে কিছু কিছু কথা বলতে পারে, কিছু আবার অসংলগ্ন। বেশ কয়েকজন আমাদের জানিয়েছেন, ছেলেটি কুমিল্লা থেকে এসেছে। ওখানে তাকে তারা দেখেছে। সে মাবাবা ছাড়া পথশিশু হিসেবে বেড়ে উঠেছে। পথেঘাটে থাকার কারণে কুকুরের অনুকরণে ডাকা আত্মস্থ করেছে। আমরা পরে তাকে চমেক হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছি।

আরিফুর রহমান নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ছেলেটি কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে আওয়াজ করছিল। এ সময় লোকজন ভয়ে তার কাছে যাচ্ছিল না। এর মধ্যে কয়েকজন লোক এসে তাকে বিদ্যুতের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে। ছেলেটি বারবার পানি খেতে চায়। কেউ তাকে পানি দিচ্ছিল না। সবাই তার ছবি ও ভিডিও করায় ব্যস্ত। এর মধ্যে অনেক ভিডিও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের লোকজন আসে। পরে স্থানীয় কিছু লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।

সৈয়দ ওমর নামে এক ব্যক্তি বলেন, বিষয়টি অমানবিক। জলাতঙ্ক সন্দেহে ছেলেটির সাথে যা হয়েছে তা মানার মতো নয়। আমরা জানি, জলাতঙ্ক রোগীরা পানি খেতে চায় না, কিন্তু এই ছেলে পানি খেতে চাওয়ার পরেও তাকে কেউ পানি দেয়নি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেয়াল দিয়ে দীঘি দখল
পরবর্তী নিবন্ধজনতা ব্যাংকের সাবেক পাঁচ কর্মকর্তার ৮ বছর করে কারাদণ্ড