কিংবদন্তি সমাজসেবক বাদশা মিয়া চৌধুরী স্মরণে

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন | মঙ্গলবার , ৪ আগস্ট, ২০২৬ at ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষা ও সমাজ সেবায় কিংবদন্তি বাদশা মিয়া চৌধুরী ১৯১৫ সালে ২০ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার মাদার্শা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মনু মিয়া চৌধুরী এবং মাতার নাম মমতাজ বেগম। গ্রামের বাড়ির সামনে মক্তবেই তার প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোথায় পড়েছেন সে তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তৃতীয় শ্রেণিতে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন নিজ বাড়ি থেকে প্রায় ২ মাইল দূরে ফতেয়াবাদ হাই স্কুলে এবং সেখান থেকে তিনি ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে ৪ বিষয়ে লেটার মার্কসহ মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৩৩ খ্রি. বাদশা মিয়া চৌধুরী চট্টগ্রাম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে আইএসসি পাশ করেন। এখানেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। এরপর তিনি চলে যান কলকাতায়। সেখানে তিনি প্রত্যক্ষ সাহচর্যে আসেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত আইনবিদ ড. সানাউল্লাহ ব্যারিষ্টারের। তিনিও মাদার্শা গ্রামের সন্তান। চট্টগ্রামের বিশেষত মাদার্শা গ্রামের ছেলে হিসেবে তিনি বাদশা মিয়া চৌধুরীকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন। তিনি সেখান থেকে এম.কম পাশ করে আইনে ডিগ্রী অর্জন করেন। জীবনের এই পর্যায়ে আসতে তাকে অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।

কর্মজীবনে বাদশা মিয়া চৌধুরী প্রথম পাকিস্তান সরকারের কর বিভাগে সরকারি চাকরিতে স্পেশাল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ইনকাম ট্যাক্স অফিসার হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। কর বিভাগে সরকারি চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন আইন পেশায় চলে আসেন এবং ইনকাম ট্যাক্স এডভাইজার ও প্র্যাকটিশনার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই পেশায় তিনি অত্যন্ত সফলতা অর্জন করেন। চট্টগ্রামে শিক্ষা ও সমাজসেবায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, বিশেষ করে চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে একদল নিবেদিত প্রাণ সমাজকর্মী চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে অনন্য সাধারণ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারা সবাই ছিলেন খান বাহাদুর আবদুল আজিজ প্রতিষ্ঠিত মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির সদস্য। তাদের অন্যতম ছিলেন বাদশা মিয়া চৌধুরী। এক যুগেরও কম সময়ের মধ্যে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রাম আইন কলেজ, চট্টগ্রাম সিটি কলেজ (প্রথমে এর নাম চট্টগ্রাম নাইট কলেজ), চট্টগ্রাম গার্লস কলেজ (বর্তমান নাম চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ), মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি হাই স্কুল, এমইএস কলেজ, কাজেম আলী নাইট স্কুল। নিজ গ্রাম হাটহাজারীর মাদার্শা ইউনিয়নে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মাদার্শা হাই স্কুল। এছাড়া চাঁদপুরে কিছু সময় সরকারী চাকরিকালীন সময়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চাঁদপুর কলেজ, যেটি বর্তমানে চাঁদপুর সরকারী কলেজ হিসেবে পরিচিত। কাজেম আলী স্কুলকে দৈন্যদশা থেকে উত্তরণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে এই প্রতিষ্ঠান গুলি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বহু দাবি সংগ্রামের পর ১৯৬৫ সালের ১৭ জানুয়ারী পশ্চিম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে মন্ত্রীসভার বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল এ ব্যাপারে অর্থ অনুমোদন দেন। তখন পর্যন্ত বাদশা মিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে শিক্ষা অনুরাগী ব্যক্তিবর্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ‘দৈনিক আজাদী’ পত্রিকার ভূমিকা ছিল খুবই উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলনের সঙ্গে ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করে দৈনিক আজাদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এজন্য কুমিল্লায় দৈনিক আজাদী পত্রিকা প্রকাশ্যে পোড়ানো হয়।

১৯৫৭ সালে চট্টগ্রামে একটি মহিলা কলেজ (নাসিরাবাদ মহিলা কলেজ) প্রতিষ্ঠিত হলেও আরেকটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালের ৫ই আগস্ট বাদশা মিয়া চৌধুরী তার ভায়রা তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম সহ জেলা প্রশাসকের অফিসে এক সভায় যাচ্ছিলেন মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য (পরবর্তীতে তা এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়)। কিন্তু বিকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর স্ট্রোক হয় এবং সেই রাতেই আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে আন্দরকিল্লা নজির আহম্মদ রোডস্থ মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির ক্যাম্পাসের ভিতরে ও আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। আগামীকাল ৫ই আগস্ট মরহুম বাদশা মিয়া চৌধুরীর ৫৯ তম মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের এই দিনে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।

লেখক : চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের উপপরিচালক (প্রশাসন)

পূর্ববর্তী নিবন্ধআবাসন খাত : সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
পরবর্তী নিবন্ধরাষ্ট্র, নগর ও জনসংখ্যা: বাংলাদেশের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি