কাল আজকাল

কামরুল হাসান বাদল

বৃহস্পতিবার , ৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
38

শ্রম বাজার, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং আমাদের প্রস্তুতি
“শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল কক্ষে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপমাত্রায় দিনরাত সোয়েটার বোনায় ব্যস্ত ১২০টি নিটিং মেশিন। পাশেই কম্পিউটারে সোয়াটারের নকশা ও নির্দেশনা ঠিক করে দিচ্ছেন কিছু কর্মী। ওই নকশা ও নির্দেশনা মেনেই কাজ করে যাচ্ছে যন্ত্রগুলো। সাভারে ঢাকা ইপিজেডের সফটেক্স সোয়েটার কারখানার চিত্র এটি। এক সময় যেখানে প্রতি পালায় অন্তত ৭০০ শ্রমিক কাজ করত কারখানার নিটিং বিভাগে সেখানে এখন কাজ করছে ২২ জন। যন্ত্রে তৈরি সোয়েটারগুলো গোছানোই এখন তাদের মূল কাজ। কারখানার হেড অব অপারেশন তাহজীব উল গনি শাহজি জানালেন এ কারখানায় কাপড় বোনায় আর শ্রমিকের হাত নেই।” গত রোববার বিডিনিউজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ।
এটি বাংলাদেশের একটি আধুনিক কারখানার চিত্র। আধুনিক এই মেশিন সম্পর্কে ওই কারখানার কর্মকর্তাটি বলেন, “কম্পিউটারে তৈরি একটি সোয়েটারের নকশা ও পরিমাপ পেনড্রাইভ দিয়ে মেশিনে যুক্ত করে দিলেই হলো। এখন একজন শ্রমিক একাই পাঁচটি মেশিন দেখভাল করতে পারেন। বুননের মূল কাজটি মেশিনই করে। মানুষ শুধু সেগুলো বুঝে নেয়।”
জানা গেল ওই কারখানায় এখন জার্মানি ও চীনের তৈরি ১৯২ টি স্বয়ংক্রিয় মেশিনে নিটিংয়ের কাজ হচ্ছে। এক সময় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক যৌথভাবে যা উৎপাদন করত এখন অর্ধেক শ্রমিক দিয়ে এইসব মেশিনের সাহায্যে তার চেয়ে অনেক বেশি কাজ হচ্ছে।
এটি বাংলাদেশের একটি আধুনিক নীট কারখানার চিত্র। ধরে নিতে পারি দেশের অনেক শিল্পকারখানায় ইতিমধ্যে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে।
দেশের বৃহত্তম রফতানিকারক শিল্প পোশাক খাতের এই চিত্র একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও বড় একটি শঙ্কার পূর্বাভাসও দিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশগুলোর জন্য এমন সংবাদ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সতর্ক বার্তাও বয়ে আনলো।
নতুন শতাব্দির দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগ থেকে বিশ্বে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। এর ধাক্কা বাংলাদেশও এসে লেগেছে। এতক্ষণ যে কারখানার বয়ানটি পাঠকদের সামনে দিলাম সেটি আসলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবেরই একটি চিত্র।
বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ১৭৮৪ সালে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বের প্রথম শিল্প বিপ্লব। এর প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কার সূচনা করে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের। এর প্রায় একশ বছর পর ১৯৬৯ সালে আবিষ্কৃত ইন্টারনেট তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে নিয়ে চলেছে বিশ্বকে।
এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবটি হচ্ছে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর। যা শ্রমিকের প্রয়োজন কমিয়ে একেবারে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসবে। প্রযুক্তিই তখন মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে। অনেক লোকের কাজ এখন একটি মেশিনই করবে। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়বে কোটি কোটি মানুষ। এই বিপ্লবে উন্নত দেশ যেখানে লোকসংখ্যা কম কিন্তু সম্পদ বেশি তারাই লাভবান হবে। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশ, যেসব দেশ বিশ্বের শ্রম বাজারের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল তাদের পড়তে হবে বিপর্যয়ে।
দেখা যাচ্ছে একটি মেশিনে আপনি কয়েকশ গ্রাম কাটা সবজি ফেলে দিলেন। তারপর আপনার দায়িত্ব শেষ। এরপর মেশিনটিই তা ধুয়ে এর সঙ্গে প্রয়োজনমতো মশলা-লবণ-তেল মিশিয়ে রান্না করে খাবার উপযোগী করে আপনাকে তৈরি করে দেবে। আগে আমরা টিভিতে টিভি স্টেশন কর্তৃক পরিবেশিত অনুষ্ঠানই দেখতে পেতাম। গান শোনার জন্য আলাদা সাউন্ড সিস্টেম বা মাধ্যম ব্যবহার করতাম। কম্পিউটার ছিল আলাদা কাজের জন্য। মোবাইলে বা কম্পিউটারে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের অ্যাপসগুলো ব্যবহার করতাম। এখন একটি স্মার্ট টিভিতে আপনি এই সবকিছুই করতে পারছেন। টিভি দেখা, গুগল সার্চ করা থেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া তাও টিভিতেই করতে পারছেন।
এখন অনেক কিছুই চলছে হাওয়ার ওপর। যেমন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাক্সি কোম্পানি উবারের নিজস্ব কোনো ট্যাক্সি নেই। ফেসবুকের নেই কোনো কন্টেন্ট। অনলাইন শপগুলোর কোনো শোরুম নেই-নেই গুদাম বা স্টোররুম। যেমন নেই বিখ্যাত আলীবাবা কোম্পানির। এখন ডাকলেই হাতের কাছে উবার পাচ্ছেন। কয়েক বছরের মধ্যে ডাকলেই উবার বা তেমন কোনো কোম্পানির গাড়ি আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে। তবে সেখানে ড্রাইভিং সিটে কেউ থাকবে না। আপনি গাড়িতে উঠে আপনার গন্তব্যটি শুধু মোবাইলে নির্ধারণ করে দেবেন অর্থাৎ ‘ডেসটিনেশন’ টি চিহ্নিত করবেন। বাদবাকি কাজ গাড়িই করবে আপনি শুধু বিলের অ্যামাউনটি মোবাইলের মাধ্যমে ট্রান্সফার করে দেবেন। তখন আপনার মোবাইল ফোনটিই হয়ে উঠবে আপনার জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রক। কখন আপনাকে প্রেসার মাপতে হবে, আপনার হার্টের এখন কী অবস্থা, কতদিন আগে আপনি চেকআপ করিয়েছিলেন, আপনার ডায়াবেটিস বেড়েছে কি কমেছে সব তথ্যই আপনাকে জানাবে আপনার মোবাইল ফোনসেটটি। এমনকি ফ্রিজে কী পরিমাণ জিনিস আছে আর কী কী দরকার হবে আগামী সপ্তাহের জন্য তাও জানিয়ে দেবে আপনার ঘরে ফ্রিজটি।
চিকিৎসা বিজ্ঞানেও এর ঢেউ লেগে গেছে। বংশগত রোগ কমাতে নিরোগ জিন আসবে। আসবে কঠিন রোগের প্রতিষেধক। শরীরে কাটাকুটিও কমিয়ে ফেলবে চিকিৎসা-বিজ্ঞান। মানুষের আয়ু বেড়ে যাবে। দীর্ঘ হবে মানুষের যৌবনকাল। মানুষকে নিরাপদ রাখতে আসবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটিং পদ্ধতি।
ডাক্তারের চেম্বারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার দুঃসহ যাতনাও ভোগ করতে হবে না মানুষকে।
অর্থাৎ এক নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন বিশ্বের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা। এই পরিস্থিতি গ্রহণ, মোকাবেলা এবং তার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার প্রস্তুতি কতটুকু আমাদের? আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রাণ অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার বড় যোগানদাতা দুটি খাত তৈরি পোশাক শিল্প ও বৈদেশিক রেমিট্যান্স দুটোই শ্রমিক নির্ভর। এরমধ্যে আমাদের অধিকাংশ শ্রমিকই অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত। সামনের সেই কঠিন সময় মোকাবেলা করার মতো দীর্ঘকালীন কোনো পরিকল্পনা কি আমাদের আদৌ আছে? ইতিমধ্যেই আমাদের শ্রম বাজার সংকুচিত হতে শুরু করেছে। লেখার শুরুতে যে কারখানার বর্ণনা দিয়েছি সে ধরনের কারখানা দেশে নতুনভাবে গড়ে উঠলেও উন্নত দেশগুলোতে বেশ আগেই শুরু হয়েছে। ফলে সেসব দেশে কর্মহীন হয়ে পড়ার ঘটনা বেশ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। অনেক দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কারখানায় শ্রমিক বা লোক ছাঁটাই শুরু হয়ে গেছে। এর ফলে সেসব দেশের মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। যেখানে সেদেশের মানুষ বেকার থাকবে সেখানে, সেসব দেশে বাইরের শ্রমিকের কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সামনে বিপুল পরিমাণ শ্রমিক বেকার হয়ে দেশে ফিরে আসবে। দেশের অন্যান্য কারখানাও আধুনিকায়ন হবে। সেসব কারখানায়ও শ্রমিকের চাহিদা কমে যাবে। একটি কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কাজেই এই চাপ বাংলাদেশের জন্য কোনো সুসংবাদ বয়ে আনবে না।
আমাদের পরলোকমনস্ক সমাজে এটি আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। রোহিঙ্গাদের মতো, ‘আল্লাহ যখন পাঠাইছে, খাওয়াইবেনও তিনি’ ভেবে ভেবে জপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে কেন এখনো প্রচুর মানুষ না খেয়ে মরে? ইয়ামেনে কেন লাখ লাখ শিশু না খেতে পেরে মরে যাচ্ছে? এখনো কেন বিশ্বে কয়েক কোটি মানুষ দিনে একবারও খেতে পারে না সে কথা কে ভাববে? আর এই অসহায়, নির্দোষ মানুষগুলো খেতে না পারার পেছনে সৃষ্টিকর্তার কী ভূমিকা আছে তা নিয়ে ভাবতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি অনেক দক্ষ, আধুনিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। তিনি নব্বই দশক থেকে বলে এসেছিলেন, একবিংশ শতাব্দির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিতে হবে। রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তিনি তার দল ও সরকারের ভিশন স্থির করেছেন। ভিশন ২০২১, ২০৪১ ছাড়াও তিনি ১০০ বছরের ডেল্টা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। কাজেই আমি ধরে নিতে পারি তিনি এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এর জন্য তাঁর যে সময় এবং সহকর্মী ও সহযাত্রী প্রয়োজন সেখানে কিছুটা ঘাটতি আছে বলে আমার ধারণা। তিনি যতটা ডাইনামিক যতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, বিচক্ষণ, সাহসী এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে আন্তরিক ততটা তাঁর আশেপাশের লোকগুলো নয়। যদি হতো গত ১০ বছরে দেশ আরও অনেক দূর এগিয়ে যেত। এত দুর্নীতিবাজ, মতলববাজ অবিশ্বস্ত লোকদের নিয়ে তিনি একটি জাতিকে কীভাবে এতটা অগ্রসর করছেন তা ভেবে আমি বিস্মিত হই। একজন প্রধানমন্ত্রীকে যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডগোল নিয়েও মাথা ঘামাতে হয় তাহলে তিনি অন্য কাজে মনোনিবেশ করবেন কী করে?
আমাদের সময় এসেছে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার। এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার মতো প্রস্তুতি নেওয়ার। দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত হওয়ার আগে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে যদি ভুল করি তাহলে মুখ থুবড়ে পড়বে বাংলাদেশ। গ্রিসের উদাহরণটি মনে রাখা দরকার। নানা কারণে ইউরোপের একসময়ে সমৃদ্ধ দেশটি এখন ভীষণ অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দেশটির জন্য চাঁদা তুলেছে। কাজেই পরস্পরের কামড়া-কামড়ি বাদ দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে এবং তার জন্য বৃহত্তর প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে এবং তার জন্যে যে খুব বেশি সময় আছে তাও নয়।
লেখক-কবি, সাংবাদিক

x