কাজী নজরুল ইসলাম : প্রেম-দ্রোহের বহ্নিশিখা

| বুধবার , ২৫ মে, ২০২২ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ

কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় কবি। বাঙালির জীবনে তিনি জাগিয়েছেন নতুনের স্বপ্ন, তুলেছেন নতুন জীবনতরঙ্গ। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অনন্যসাধারণ। নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৫ মে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে অপরিসীম দারিদ্র্যে। মাত্র দশ বছর বয়সে গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন-প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর প্রথমে বর্ধমান জেলার একটি হাইস্কুলে, পরে ময়মনসিংহের দরিরামপুর হাই স্কুলে ভর্তি হন।

এখান থেকেই ‘লেটো’ দলে যোগ দেন এবং পদ্য, গীত ও পালা গান রচনা আর সুরারোপে তাঁর অপূর্ব দক্ষতার পরিচয় মেলে। ১৯১৭ সালে তিনি সৈনিক হিসেবে ৪৯ নম্বর পল্টনে যোগ দেন। এর আগে শিয়াড়শোল রাজস্কুল থেকে প্রবেশিকা নির্বাচনী পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এ পর্যন্তই ছিল তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। ১৯২০ সালে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হলে সাহিত্য জগতে এক শক্তিমান কবি হিসেবে আবির্ভুত হন নজরুল। তাঁর সাহিত্য জীবনের পরিধি মূলত তেইশ বছর। এর প্রথম দশ বছর প্রধানত কবিতা এবং শেষ তেরো বছর মুখ্যত সংগীত রচনা করেছেন তিনি। কিছু উপন্যাস, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করলেও কবিতা আর গানেই তাঁর বিচিত্রমুখী প্রতিভার উজ্জ্বল স্ফূরণ ঘটেছিল।

নজরুলের রচনায় রয়েছে বিশ্বসৃষ্টির প্রতি এক অপূর্ব সাম্য, দেশপ্রেম, উৎপীড়িত মানব মনের ব্যথা, মানবিক প্রেম, বিরহ, অসামপ্রদায়িক চেতনা। সর্বোপরী সকল অন্যায় আর গ্লানির বিরুদ্ধে তীব্রকণ্ঠ প্রতিবাদ। এর জন্য নজরুলকে কারাভোগও করতে হয়েছে। তাঁর দেশাত্মবোধক গানগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিকামী জনতার প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর অসংখ্য গান ও কবিতায় শিশু মনের চেতনা এবং কোমল, মৃদু ব্যক্তিত্বেরও প্রকাশ পাওয়া যায়। কিন্তু ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবেই তিনি খ্যাতিমান। নজরুলের বিপুল ও বৈচিত্র্যময় রচনার মধ্যে উপন্যাস: ‘বাঁধনহারা’, ‘কুহেলিকা’, ‘জয়যাত্রা’; ছোটগল্প ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘শিউলিমালা’; কাব্যগ্রন্থ: ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘প্রলয় শিখা’, ‘সাম্যবাদী’, ‘ভাঙার গান’, ‘নতুন চাঁদ’, ‘দোলনচাঁপা’, ‘ছায়ানট’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। নজরুল পরপর তিনটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। এগুলো হলো: দৈনিক নবযুগ, সাপ্তাহিক ধুমকেতু, এবং সাপ্তাহিক লাঙল।

১৯৪১ সালে পিক্‌স ডিজিজ নামে এক রোগে মস্তিষ্ক বিকল হয়ে যায় নজরুলের। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে কবিকে নিয়ে আসা হয়, দেওয়া হয় নাগরিকত্ব। তাঁর চিকিৎসারও ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু কবি আর সুস্থ হন নি। অবশেষে চির অশান্ত, বিদ্রোহী কবি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।