কাঁটাতারের বেড়া বসবে মিয়ানমার সীমান্তে, ভারত সীমান্ত বিবেচনায় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কিশোর গ্যাংয়ের ফেসবুক-টিকটক আইডি নজরদারিতে

| বৃহস্পতিবার , ১৮ জুন, ২০২৬ at ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ

অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই ধরনের বেড়া ভারত সীমান্তে নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের ‘বিবেচনায়’ থাকার কথাও বলেছেন তিনি। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে পাবনা৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। প্রশ্নটি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের অপরাধ ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ‘সমন্বিত’ পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ফেনসিডিলসহ সব ধরনের মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রবেশ বন্ধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। খবর বিডিনিউজের।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুর্গম ও স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকায় নতুন বিওপি ও টিওবি নির্মাণ করা হয়েছে, আরও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিজিবির বিওপিগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং টহলের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, দেশের দক্ষিণপশ্চিম ও উত্তরপশ্চিম সীমান্তের অতি সংবেদনশীল এলাকায় ইতোমধ্যে ‘স্মার্ট বর্ডার সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম’ স্থাপন করা হয়েছে। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ দ্রুত এগোচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এর ফলে বিজিবির টহল দল দ্রুততার সঙ্গে সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সক্ষম হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ, মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, আন্তঃসীমান্ত বিভিন্ন অপরাধ দমনের লক্ষ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনুরূপভাবে ভারত সীমান্তে স্পর্শকাতর স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণের কার্যক্রম বিবেচনাধীন রয়েছে। তবে প্রশ্নোত্তরে মিয়ানমার সীমান্তে কত কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণ হবে, প্রকল্প ব্যয় কত, কাজ কবে শুরু বা শেষ হবে, কিংবা ভারত সীমান্তের কোন কোন অংশকে ‘স্পর্শকাতর’ ধরা হচ্ছে, এসব বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

সীমান্ত হত্যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন :

সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ এবং মানবাধিকারের ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’। তিনি জানান, বিজিবিবিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে বিষয়টি জোরালোভাবে তোলা হয়েছে। তবে বিএসএফের গুলিতে নিহতদের পরিবারকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা বা চুক্তি হয়নি বলে জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সীমান্তে আত্মরক্ষার অজুহাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিরোধিতা করেছে। তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণ ও জবাবদিহির বিষয়ে পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপের মুখে বিএসএফ অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

পুশইন করা ১৮৩ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে :

সিলেট৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের পুশইন করা ২ হাজার ৩৬৯ জনের মধ্যে ২ হাজার ১৭৫ জনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১১ জনকে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর এবং ১৮৩ জনকে পুশব্যাক করা হয়েছে। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৮৬০ জনকে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর বিএসএফের ৩৬টি পুশইন চেষ্টা বিজিবি প্রতিরোধ করেছে।

চোরাচালান ঠেকাতে ড্রোন, থার্মাল ইমেজার ও ‘হাইরিস্ক জোন’ নজরদারি :

সিলেট৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্ত হত্যা, পুশইন, মাদক ও চোরাচালান ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকাকে ‘হাইরিস্ক জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিজিবির প্রতিটি বিওপির অধীনে থাকা ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি রাখা হচ্ছে। সীমান্তের কৌশলগত স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ পোস্ট বসিয়ে রাতের টহল বাড়ানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের নদী ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। রাত ও ঘন কুয়াশার সুযোগে অনুপ্রবেশ, পুশইন এবং মাদক চোরাচালান ঠেকাতে থার্মাল ইমেজার, নাইট ভিশন ডিভাইস ও সিসিটিভির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এছাড়া শূন্যরেখা ও কাঁটাতারসংলগ্ন স্পর্শকাতর এলাকায় ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অপরাধের চেষ্টা নস্যাৎ করার কথা বলেন মন্ত্রী।

তিনি জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ‘বর্ডার কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ’ গঠন করা হয়েছে। মাইকিং ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সীমান্তবাসীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের ফেসবুকটিকটক আইডি নজরদারিতে :

জামালপুর২ আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মাহমুদ বাবুর প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মহানগরে কিশোর গ্যাং নিষ্ক্রিয় করতে ডিএমপি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তিনি জানান, কিশোর গ্যাং সদস্যরা নিজেদের গ্যাংয়ের নামে যেসব ফেইসবুক পেইজ, গোপন গ্রুপ ও টিকটক আইডি চালায়, সেগুলো ডিএমপির সাইবার ইউনিট সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে। মিরপুর বিভাগ ও মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, র‌্যাব২ মোহাম্মদপুর এলাকায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ১১৯টি ছিনতাইবিরোধী অভিযান চালিয়ে ২৫২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

কারাগারে ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ বন্দি :

কুমিল্লা৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের ৭৫টি কারাগারে অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৩৬ জন। ৭ জুনের তথ্য অনুযায়ী, এসব কারাগারে বন্দি আছেন ৭৭ হাজার ৪০ জন, যা ধারণক্ষমতার ১ দশমিক ৭ গুণ। তিনি বলেন, বন্দি আবাসন সমস্যা সমাধানে কেরানীগঞ্জ বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার, ফেনী জেলা কারাগার২ এবং খুলনা জেলা কারাগার২ চালু করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর ও পিরোজপুর জেলা কারাগার২ শিগগির চালু করা হবে। কারাগারে অনিয়ম, বন্দি নির্যাতন ও দুর্নীতি রোধে সরকার কঠোর জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর কারা অধিদপ্তরের ১৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৬৩ জনকে বরখাস্ত, ১৩৫ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ৫১০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৬ কর্মচারী ও ৭ বন্দির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। তিনি জানান, ৭৭২ জন কারা কর্মকর্তাকর্মচারীর ডোপ টেস্টে ১৪ জনের রিপোর্ট পজিটিভ আসায় তাদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বন্দিদের খাবারের মান ও পরিমাণ নিশ্চিত করতে খাদ্যগুদাম, প্রধান ফটক ও রান্নাঘরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বন্দিদের মাথাপিছু খাবার স্কেলে মাছ, গরুর মাংস, খাসি বা ছাগলের মাংস এবং মুরগির মাংসের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারাবন্দীদের উৎপাদিত বিভিন্ন সামগ্রীর বিক্রয়লব্ধ লাভের ৫০ শতাংশ বন্দিদের দেওয়া হয়।

অনলাইন জুয়া ঠেকাতে নতুন আইন হচ্ছে :

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আরিফা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনলাইন জুয়া ও বেটিং সাইট বন্ধে পুলিশ, বিটিআরসি, গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, বঙ্গীয় প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭ রহিত করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন২০২৬’ নামে নতুন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৩০ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সরকার : ভূমি প্রতিমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধব্যাটিং ব্যর্থতায় হারল বাংলাদেশ