
বাংলা সাহিত্যে কবিতার জন্ম প্রায় দেড় হাজার বছর আগে হলেও গদ্যের ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়। ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা হলে ১৮০১ সালে তাতে বাংলা বিভাগ খোলা হয়। এরপরই কিছু সংস্কৃত পণ্ডিত এবং ইংরেজদের হাতে বাংলা গদ্যের সূচনা। কিন্তু একটি যথার্থ বাংলা উপন্যাস পেতে বাঙালিকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর আগে যদিও প্যারীচাঁদ মিত্র ১৮৫৮ সালে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এর মাধ্যমে উপন্যাস রচনার চেষ্টা করেছিলেন। তবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘দুর্গেশনন্দিনী’ রচনার মধ্য দিয়ে যথার্থ বাংলা উপন্যাসের জন্ম দেন। এরপর রবীন্দ্রনাথ,শরৎচন্দ্র এবং তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে বাংলা উপন্যাস অনেকদূর এগিয়েছে। বাংলা সাহিত্যের প্রথমদিকে হিন্দু কথাসাহিত্যিকদের আবির্ভাব হওয়ায় তাঁদের জীবনব্যবস্থাই এ সময়ের কথাসাহিত্যে প্রতিফলিত। তবে পরবর্তীতে বেশ কয়জন মুসলমান কথাসাহিত্যিকের আবির্ভাব হলে বাংলা কথাসাহিত্যে মুসলমান সমাজের জীবনযাত্রা প্রতিফলিত হতে থাকে। তাঁদেরই একজন হলেন কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল। তাঁর জন্ম ১ জুলাই ১৯০৩, মৃত্যু ৪ মে ১৯৮৩। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেউচিয়া গ্রামে এ প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মৌলবী ফজলুর রহমান, মা গুলশান আরা। তাঁর পিতা চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদের পেশ ইমাম ছিলেন।
আবুল ফজলের শিক্ষাজীবন গ্রামের মক্তব মাদ্রাসায় শুরু হলেও পরবর্তীতে তিনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন। ১৯২৩ সালে তিনি নিউ স্কিম মাদ্রাসা থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৫ সালে তিনি ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তিনি থেকে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল শিক্ষকতা। তাই তিনি ১৯৩১ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে Bachelor of Teaching ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।
চাকরিজীবনের প্রথম দিকে স্কুলের শিক্ষকতা করলেও পরবর্তীতে তিনি ১৯৪১ সালে কৃষ্ণনগর কলেজ এবং ১৯৪৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অবসরে যান। কিন্তু শিক্ষকতা তাঁকে অবসর দিতে চায়নি। তাই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন ছিলেন। উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মুক্তচিন্তা এবং অসামপ্রদায়িক পরিবেশ বজায় থাকে। ১৯৭৫ সালের শেষদিকে তিনি বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।
সমাজ মনস্ক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লেখার জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্টতা অর্জন করেন। মুক্ত–বুদ্ধি চর্চার প্রসঙ্গ এলেই আবুল ফজলের নাম অগ্রগণ্য। তিনি বিভিন্ন ধারার সাহিত্য রচনা করেছেন। যেমন উপন্যাস– চৌচির, প্রদীপ ও পতঙ্গ, জীবন পথের যাত্রী, রাঙ্গা প্রভাত। গল্পগ্রন্থ –মাটির পৃথিবী মৃতের আত্মহত্যা, আয়েশা। প্রবন্ধগ্রন্থ –বিচিত্র কথা, সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন। স্মৃতিকথা–রেখাচিত্র, ডায়েরি –দুর্দিনের দিনলিপি। মুক্তবুদ্ধি চর্চার আন্দোলনকে বেগবান করতে ১৯২৬ সালে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠনে আবুল ফজল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৩০ সালে তিনি এই সংগঠনের সম্পাদক হন। বাঙালি মুসলমানকে প্রগতির পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই সংগঠন একটি পত্রিকা বের করত। যার নাম ছিল ‘শিখা’। এ পত্রিকার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাঁদের বলা হত ‘শিখাগোষ্ঠী’। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মানুষের মন থেকে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করা। তাঁরা বিশ্বাস করতেন “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।” আবুল ফজল ছিলেন যুগের চেয়ে অনেক ধাপ এগিয়ে। ধর্মের নামে চলা অন্ধ আনুগত্যকে তিনি অস্বীকার করতেন। তাঁর চিন্তাধারাকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি এই বিষয়ক অনেক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তিনি মনে করতেন, একমাত্র বিজ্ঞানমনস্ক পথে চললেই মানবমুক্তি সম্ভব। তাঁর ‘মানবকল্যাণ’ প্রবন্ধে তিনি দান খয়রাতের নামে ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, একজন মানুষকে আত্মমর্যাদায় গড়ে তোলাই একমাত্র মানব কল্যাণ। কারণ একজন মানুষ আত্মমর্যাদাশীল হলে জাতি আত্মমর্যাদাশীল হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি মহানবীর প্রসঙ্গ এনেছেন। বলেছেন, মহানবী ভিক্ষুককে ভিক্ষা না দিয়ে কুঠার দিয়েছিলেন স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য। তাই আখিরাতে পুন্যের আশায় দান খয়রাত না করে একজন মানুষকে আত্মমর্যাদাশীল স্বাবলম্বী করে দেওয়াই আসল পুণ্য।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করলে তিনি এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছেন। আজীবন তিনি মানবতাবাদী অসামপ্রদায়িক চেতনা ধারন করেছেন। তাঁর সাহিত্য সাধনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষ। তিনি মনে করতেন মানবতার চেয়ে বড় ধর্ম আর কিছুই হতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করতেন মুক্ত চিন্তার যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক মানুষই পারে একটি মানবতাবাদী কল্যানকামী রাষ্ট্র গড়তে। তাঁর প্রতিটি সাহিত্যকর্মে যে জীবন দর্শন প্রকাশিত হয়েছে তা হল মানুষকে ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বোধসম্পন্ন হতে হবে। তিনি ছিলেন সংগ্রামী পুরুষ। চলার পথের কোন সংকটে তিনি বিচলিত হননি, বরং সংগ্রাম করেছেন। নিজে যে আদর্শ ধারণ করতেন তা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ক্ষমতা ছাড়তেও দ্বিধা করেননি। তাই তাঁকে ‘বাংলার বিবেক’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর গল্প উপন্যাসে সমাজ সচেতনতা, নারীমুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানব মনের জটিল মনস্তত্ত্ব উঠে এসেছে। তাঁর উপন্যাসের পাত্র–পাত্রীরা বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত। তাঁর ‘রাঙা প্রভাত’ উপন্যাসে গ্রামীণ জীবন মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই উপন্যাসে স্বদেশ প্রেমের মধ্য দিয়ে মানব প্রেম প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ‘চৌচির’ উপন্যাসে রক্ষণশীল সমাজ ও সংস্কারের বিরুদ্ধে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানবতাবাদ আত্মপ্রকাশ করেছে। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ প্রশংসা পেয়েছিল। তাঁর উপন্যাস ‘প্রদীপ ও পতঙ্গ’ একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, মানুষের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এই উপন্যাসে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গল্পসমূহে মানবতাবাদ, বাস্তববাদ এবং ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের জোরালো প্রতিফলন ঘটেছে। মুক্তবুদ্ধি আন্দোলনের পুরোধা হওয়ায় তার লড়াইটা ছিল ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে। তাঁর পাত্র–পাত্রীরা কোন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নয়। তারা উদার মানবতায় বিশ্বাসী যথার্থ মানুষ। জাতি–ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদাকে তিনি সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। তাঁর ছোট গল্পে নারী পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা অসাধারণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর গল্পে যৌনতা এসেছে সাহসীভাবে। ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন তিনি তাঁর ছোটগল্পে। মাটির পৃথিবী, আয়েশা এ ধারার গল্প।
তাঁর গল্পের সমাজব্যবস্থা আমাদের চারপাশের সমাজ ব্যবস্থা। এখানে কোন কল্পনার আশ্রয় নেই। নিম্নবিত্ত মানুষ, বস্তিবাসী তার গল্পে বিশেষ স্থান দখল করেছে। সমাজকে পরিবর্তন করাই ছিল যেন তাঁর সাহিত্যের লক্ষ্য। তবে এজন্য তিনি কোন রাজনৈতিক আদর্শের অনুগত হননি। তাঁর একটা নিজস্ব মতবাদ ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষকে মানুষ হতে হলে মনের সংকীর্ণতা পরিহার করতে হবে। মানুষকে ভালবাসতে হবে। আর দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে উদার বিজ্ঞানমনস্ক। আজীবন এই আদর্শই তিনি লালন করেছেন। ‘কল্লোল’ যুগের সাহিত্যিক হওয়ায় তিনি এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাই নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনচিত্র আঁকতে তিনি কল্পনার আশ্রয় নেননি। জীবন যেখানে যেমন তেমনই উঠে এসেছে তাঁর সাহিত্যে। মানুষকে ভালোবাসার অদম্য স্পৃহা নিয়ে তিনি তার সাহিত্য ও কর্মজীবনকে আলোকিত করেছেন। উদার মানবতাবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারার জন্য বাংলা সাহিত্যে তিনি বরাবরই বিশিষ্ট স্থান দখল করে থাকবেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক; সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজ, চট্টগ্রাম।













