কতটুকু আছে গৃহের প্রশান্তি?

মিতা দাশ | শনিবার , ১৯ নভেম্বর, ২০২২ at ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ

অফিস ছুটির পরও আসমত আপা বের হচ্ছে না কেন বুঝতে না পেরে, কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম আপা,বাসায় যাবেন না?
প্রশ্নটা শুনে বললো, হুম, যাব। তবে একটু দেরি করে, আসলে আমার আরো একটু কাজ বাকি। তিনদিন ধরে তিনি দেরিতে বের হচ্ছেন, কোন কাজের জন্য নয়, সেটা বোঝা যাচ্ছে তবু বললাম আচ্ছা আপা। হাতের উপর আলতো করে হাত রেখে বললাম, কখনো কোনো দরকার হলে নির্ভয়ে সব বলতে পারবেন আপা। এছাড়াও কোনো সমস্যা থাকলেও নিশ্চিন্তে বলতে পারবেন। আমি আপনার ছোট বোনের মতো।
আমার চোখের দিকে তাকাতেই দেখি ছলছল করছে চোখ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো সবার ঘরে যাওয়ার তাড়া থাকে না, কারো কারো ঘর হলো দোজখখানা।
তুমি যাও, আমি একটু পর বের হবো।

আপার কথায় মনে হলো অনেকখানি বুঝতে পেরেছি আমি। কোথায় আপার সমস্যা। তাই কোনো কথা না বলে বের হয়ে গেলাম।পথে হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করছি—

ঘর, বাসা বা গৃহ এই শব্দটি বললেই কেমন যেন ‘শান্তির নীড়’ বলে মনে হয়। সারাদিন কর্মক্লান্তির পর আরামদায়ক স্থান হয় গৃহ বা বাসা। সকল প্রাণীরই গৃহ আছে। গৃহে ফেরার তাড়াও থাকে। গৃহ আমাদের শুধু প্রশান্তিই দেয় না বরং গৃহ আমাদের রোদ, বৃষ্টি, কুয়াশা ইত্যাদি থেকেও রক্ষা করে থাকে।
পিপাসা না থাকলে যেমন পানি খেতে ইচ্ছে করে না, তেমনি শরীরের বা মনের অবসাদ না থাকলে গৃহের প্রয়োজনীয়তাও বুঝতে পারি না আমরা।

গৃহ ছেড়ে বোধহয় আমরা বেশিদিন বাইরে কোথাও থাকতে পারি না। নিজের বাসার মতো এত ভালো লাগা, এত আরাম, এত সুখ আর কোথাও খুঁজে পাই না। কিছুদিন বাইরে থাকলেই আমরা আমাদের ঘরে ফিরে আসার জন্য ছটফট করতে থাকি।

কিন্তু সকলের কাছে কি গৃহ বা বাসার অর্থ একই রকম?
আসুন জেনে নিই, গৃহ কতটুকু প্রশান্তির বা আরামদায়ক।

কারো কারো বাসা বা গৃহ হয় বেশ আরামদায়ক ও শান্তির নীড়। এখানে থাকে ভালোবাসার বন্ধন, থাকে পরিবারের মিলনমেলা, থাকে সকলের মধ্যে সৌহার্দ্য প্রীতি। তাই এই সকল পরিবারে কর্মক্ষেত্র থেকে দ্রুত ছুটে আসে একটু সকলের মাঝে থেকে শান্তি, আনন্দ পাওয়ার জন্য।

আবার কোন কোন পরিবারে থাকে অশান্তি, ঝগড়া, বিবাদ, মারামারি। মেয়েদের মনে করা হয় যন্ত্র চালিত ঘোড়া। এরা চাকরি শেষ করেই ঘরে ফিরবে। তাদের বাইরে কোন কাজ থাকতে পারে না। বাইরে কোনো প্রয়োজনীয় কাজ থাকতে পারে না। তাই এসব পরিবারে গৃহে ফেরার ক্ষেত্রে কোনো আনন্দই কাজ করে না অনেকের।

আবার কোনো কোনো গৃহের কিছু লোক থাকে সন্দেহপ্রবণ। তাদের কাছে শিক্ষার,সম্মানের কোনো মূল্যই থাকে না। এসব পরিবারের সদস্যদের প্রচুর মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়। এই গৃহের নারীরা কারো সাথে কথা বলতে পারে না, অফিসের পর কোথাও কোনো অফিসিয়াল কাজেও যেতে পারে না। তাদের সার্বক্ষণিক মানসিক চাপে থাকতে হয়।

আরো কিছু পরিবার দেখা যায়, বেশ উচ্ছৃঙ্খল বেশ এলোমেলো। সেই সব পরিবারেও সুখী হওয়া সম্ভবপর হয় না।

আবার কোনো কোনো পরিবারে দেখা যায় সকলের মাঝে সকলকে সম্মান দেখানোর প্রবণতা থাকে। এইরকম পরিবারেই হয় শান্তির নীড়। এখানে কাউকে ছাড়া কারো ভালো লাগে না।
বিভিন্ন নারীদের দেখি, যারা স্বামীর নির্যাতন সহ্য করেও বাইরে স্বামীকে বেশ প্রশংসায় ভরিয়ে তুলেন। এসব নারীরা শিক্ষিত হয়েও সাহস অর্জন করতে পারেনি সত্যিটা প্রকাশ করে ঐ সকল পুরুষদের শাস্তি প্রদানে।
আবার কিছু নারী যদি প্রতিবাদ করে তখন সমাজের সকলে তাকে খারাপ প্রতিপন্ন করার জন্য উঠেপড়ে লেগে থাকেন।
একটা উদাহরণ দিই, একবার রিক্সা করে স্বামী-স্ত্রী একসাথে যাওয়ার সময় কথা কাটাকাটি হতেই স্বামী একটা চড় বসিয়ে দিয়ে রিকশা থেকে ফেলে দিলো স্ত্রী কে।
স্ত্রী চারিদিকে দেখে লজ্জা না পেয়ে রিকশা থেকে স্বামীকেও টান দিয়ে ফেলে দিলো। স্বামী দুইটা মারলে স্ত্রীও একটা মারেন। ধস্তাধস্তি শুরু হলো দুজনের মধ্যে।
রাস্তার মাঝে লোকজন জমে গেলো। কেউ থামানোর চেষ্টা না করে স্বামী, স্ত্রীর মারামারি দেখতে লাগলো।
মাঝখান থেকে একটা পুরুষ লোক বলে উঠলো, দেখো কি বেয়াদব মেয়ে, স্বামীর সাথে রাস্তায় মারামারি করছে, লজ্জা শরম কিছুই নাই। বেহায়া মেয়েছেলে।
অদ্ভুত সমাজ!
স্বামীছেলেটা মেরে স্ত্রী কে রিকশা থেকে ফেলে দিলো আগে, তা কেউ দেখলো না,অথচ মেয়ে টা কেন মার হজম না করে প্রতিবাদে মারছে তার জন্য নিন্দার ঝড় উঠছে।

আর কতদিন মেয়েরা চুপ করে সব সহ্য করবে?
যে সকল মেয়েরা সংসারের শান্তি রক্ষার জন্য সব অন্যায় সহ্য করে চুপ করে থাকেন তাদের গৃহে আর শান্তি আসার সম্ভাবনা নেই। এমনকি তাদের আগামী প্রজন্ম মেয়ে হলে তাদেরও ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার। তারাও হয়তো মাকে নিরবে মার খাওয়া সহ্য করে থাকতে দেখার কারণে সেও প্রতিবাদী হতে পারবে না। আর তখন পুরুষেরা তাদের হুকুম চালিয়ে নির্যাতন করে যাবে আজীবন। সমাজ,সংসার, প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন ইত্যাদি লোকেরা কী বলবে, কী ভাববে এসব না ভেবে নারীদের নিজের মানসিক ও শারীরিক সুস্থ থাকাটাই আসল কথা।