কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি দেশের অর্থনীতি

| বুধবার , ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:২০ পূর্বাহ্ণ

দেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা–এই তিন চ্যালেঞ্জের চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতির সীমাবদ্ধতায় অর্থনীতির ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা–বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগের সুফল পেতে আস্থার সংকট কাটানো এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতির সংকট কাটাতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রতিবেদনে অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন, তিন থেকে চারটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পুঁজিবাজারে বিশেষ তহবিল গঠন এবং ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, মাতারবাড়ীর পাশাপাশি খুলনার কাছাকাছি গভীর পানির একটি নতুন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ২০ মিটার গভীরতায় বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল ও এলএনজি খালাসের সুবিধাসম্পন্ন আধুনিক টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি জ্বালানি কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত পুরোপুরি স্থিতিশীল হবে। এরপর অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে এবং পর্যায়ক্রমে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে অথচ বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি থামতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে বাড়তে থাকা বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সামপ্রতিক পূর্বাভাস এই চ্যালেঞ্জের গভীরতা তুলে ধরেছে। সংস্থাটির অক্টোবরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিপরীতে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে। এই পূর্বাভাসকে আতঙ্কের কারণ না বানিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ত্বরান্বিত করার সতর্কসংকেত হিসেবে নেওয়াই হবে বিচক্ষণতা। প্রথম চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারকে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি মন্থর হলে নতুন কর্মসংস্থান, ব্যবসা সমপ্রসারণ ও বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে শুধু সুদ হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণচেষ্টা যথেষ্ট নয়। মুদ্রানীতির পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা; সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর; অস্বাভাবিক মুনাফা ও মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের আমদানি নির্বিঘ্ন রাখা জরুরি। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে, যাতে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার ব্যয় তাদের ওপর অসহনীয়ভাবে না পড়ে।

অন্যদিকে, অর্থনীতির বর্তমান দুরবস্থার পেছনে অর্থের অভাবের চেয়ে আস্থার সংকটকে বেশি দায়ী করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি উচ্চ দারিদ্র্য, নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির একটি চক্রে আটকে রয়েছে। এর ফলে দারিদ্র্যের চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি বাড়ছে। এসবের ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য এ কাঠামোগত সংকট থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা সরকারকে স্বীকার করে তা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব সমস্যার পেছনে অর্থের সংকটের চেয়ে আস্থার সংকটই প্রধানত দায়ী। অর্থের অপচয়কেও অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানোই হবে সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে