এসো হে বৈশাখ এসো

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ
427

নতুনের আহ্‌বান
সুপ্রতিম বড়ুয়া

সার্বজনিন উৎসব পহেলা বৈশাখ মানুষের সংকীর্ণতা দূর করে হৃদয় বড় করে।পহেলা বৈশাখের অসাম্প্রদায়িক মিলন মেলার মধ্যদিয়ে বাঙালি একদিনে জন্য নয়,তিনশ পঁয়ষট্টি দিন ধরেই আদর্শ বাঙালি হয়ে উঠতে পারে। এদেশের মানুষের প্রতিটি দিনই পহেলা বৈশাখের আনন্দ উদার মন দিয়ে উদযাপন করুক। সর্বজনীন -সার্বজনিন পহেলা বৈশাখে মানুষের মাঝে সব ভেদাভেদ দূর হয়ে যাক।উৎসবপ্রিয় বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। সেই জমিদার আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে অনেক আশা ও প্রত্যাশার নিয়ে পালন হয়ে আসছে এ উৎসব। এ উৎসব যেন পুরাতন ভুল- ভুল-ভ্রান্তি ভুলে সামনের দিকে এগুনোর এক অজানা শক্তি,এক অজানা সাহস। এই উৎসব যেন পুরাতন গ্লানি ও ব্যর্থতা ভুলে নতুন শুরুর আহ্‌বান। কবিগুরুর গানে ” মুছে যাক গ্লানি,ঘুচে যাক জরা,অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা”। তাই নতুনের প্রত্যাশায় বাঙালির সার্বজনীন বাংলা নতুন বছর – পহেলা বৈশাখ।

আয় বৈশাখ আয়
সীমা কুণ্ডু
শংকা উড়ায়ে ডংকা বাজায়ে আয় বৈশাখ আয়
আয় বৈশাখ ছড়ায়ে ছিটায়ে শিরিষের তলায়

আয় বৈশাখ গুছিয়ে রেখেছি চিড়া মুড়ি খৈ দৈ
সবজি পাঁচন, ভাজাভুজি নিয়ে রান্নার হৈ চৈ

আয় বৈশাখ আয় দেখে যা দুয়ারে দুয়ারে ফুল
নতুন কাপড়, নতুন জামার গন্ধে হুলুস্থুল

আয় বৈশাখ মোয়া মুড়ি হয়ে বাঁশের তৈরি ডালায়
আয় বৈশাখ সুঘ্রাণ দেবো আকন্দের মালায়

আয় বৈশাখ আয় আয় আয় আমার মায়ের পায়
আয় বৈশাখ বাবার সাথে মেলায় চলে যাই

মন্ডামিঠাই বাতাসা বাদাম বরফমালাই হয়ে
হাতি ঘোড়া গরু মাটির পুতুল কিনে দেবো রয়ে সয়ে

ঘুড়ি দেবো কিনে, মুখোশ দেবো দেখাবো বায়োস্কোপ
আয় বৈশাখ কচিকচি আম বেতস বনের ঝোঁপ

আয় বৈশাখ সাথে নিয়ে আয় কালবোশেখির ঝড়
ধুলি উড়ে যাক, পাতা উড়ে যাক ধুয়ে যাক অন্তর।

জাগ্রত হোক শুভ বুদ্ধি
শর্মিলা চৌধুরী

ঋতু পরিক্রমায় পুরানো বছর শেষ হয়ে যায়। আসে নববর্ষের শুভক্ষন। কিন্তু ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতার উর্ধ্বে কি উঠতে পারি আমরা? অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শপথ আমরা নিতে পারি না। শপথ নিতে পারি না স্বাধীনতার চেতনা ও মুল্যবোধকে বিনষ্ট করার অশুভ চক্রান্তের বিরূদ্ধে। তাই তো মানবতার অনুপস্থিতিতে আমাদের সমাজ হয়ে উঠেছে বর্বর ও হীন। প্রাধান্য বিস্তার লাভ করেছে পশুত্ব। মানুষের অন্তরের সুন্দর ও পবিত্র দিক গুলো হয়ে পড়েছে আচ্ছন্ন ও আবৃত। তার মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করেছে লোভ, লালসা ও হিংস্রতা। বিষাক্ত নিশ্বাসে ছেয়ে গেছে গোটা সমাজ।
মানুষ নাকি পৃথিবীর সব প্রানির চেয়ে শ্রেষ্ট। কিন্তু সেই সত্য আজ আমাদের সমাজে ভুল প্রমাণিত। মানুষ রূপী জানোয়ারগুলো সমাজে রচনা করেছে কলংকময় অধ্যায়। তাই তো আজ ঘটতে চলেছে শিক্ষাঙ্গনের মত পবিত্র জায়গায় নানা ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। সেই সংগে অপসংস্কৃতির প্রভাবে নারীর প্রতি নির্মম নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটেই চলেছে। ধর্ষণ করে নারীকে বস্তা বন্দী লাশ হিসেবে ফেলে রাখা, গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া কিংবা বিয়ের প্রস্তাবে রাজী না হলে এসিড নিক্ষেপ এ ধরনের পাশবিক ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কারণ, অপরাধীর দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি হচ্ছে না। জানিনা হয়তো ভবিষ্যতে নুসরাতের মায়ের মত আরো কত মায়ের বুক যে খালি হবে সেই অজানা আশংকার মধ্য দিয়ে আমাদের প্রহর গুনে যেতে হবে।
তাই নববর্ষের নূতন সূর্য হোক সকল অপসংস্কৃতি, পশুত্ব ও অপচেষ্টার বিরূদ্ধে আমাদের চেতনার অগ্নিমশাল। মানুষের মধ্যে জাগ্রত হোক শুভ বুদ্ধি। জয় হোক মানবতার। এই শুভ কামনার মধ্য দিয়ে আমরা যেন নববর্ষের নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে পারি তাই হোক আমাদের নতুন সাধনার প্রতিশ্রুতি।

শিশুদের পহেলা বৈশাখ ও সংস্কৃতি
সরওয়ার আরমান

শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। শিশুরা শিক্ষক, মা-বাবা, বড় ভাই-বোনসহ অগ্রজ প্রতিম যারা আছেন তাদের থেকে যে কোন বিষয় শিখে। আর শিক্ষণীয় বিষয় যদি পহেলা বৈশাখ হয় তাহলে তো আর কোন কথাই নেই। একটা সময় শিশুদের কোন কিছুতে তাদের অংশগ্রহণের কথা ভাবা হতো না। শিশুদের অকল্পনীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের সূত্রপাত আমরা শীঘ্রই দেখতে পাবো। বিংশ শতাব্দির পর হতে বর্তমানে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিশুরা, সুশিক্ষা,কবিতা,ছড়া,গান,আবৃত্তি,ছবিআঁকা,স্কাউটস, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ঐতিহ্য রক্ষায় তারা মেধার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ববোধ কি তা ভালো করে প্রকাশ করেছে।
শিশুরা বাংলা সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবরের নামও জানে। শিশুদের ভূমিকা এখন সর্বক্ষেত্রে। শিশুদের সামনে স্বর্ণালী ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে সেজন্য বড়দেরও মন মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া দরকার। গ্রাম ও শহরে শিশুরা বড়দের হাত ধরে মার্কেট হতে বৈশাখীর পান্‌জাবি পাজামা, শাড়ি, চুড়ি পছন্দ মোতাবেক বুঝে নিচ্ছে। বিগত ৪/৫ বছর ধরে শিশুদের পহেলা বৈশাখের জন্য জামা তৈরি হচ্ছে শৈল্পিক কায়দায়, পছন্দ অনুযায়ী কারুকাজ ও দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনে তৈরি হচ্ছে হরেক রকম পোশাক।
শিশুদের পাহাড়সম বইয়ের ভার চাপিয়ে না দিয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের দেশীয় খাবার, দেশীয় পণ্য ক্রয় এবং পহেলা বৈশাখসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে অবহিত করলে শিশুরা আগামীতে খাঁটি বাঙালি হিসাবে তৈরি হবে ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ জন্ম নেবে। পহেলা বৈশাখ হোক শিশু ও বড়দের মিলনমেলা।

প্রকৃত বাঙালি
আজহার মাহমুদ

নবর্বষ, এর মানে আমরা বুঝি নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া। এটা প্রাচীনকাল থেকে হয়ে আসছে। ঠিক তেমনি বাঙালি জাতিরও পহেলা বৈশাখ নববর্স। এটাই আমাদের নতুন বছর। কিন্তু আমাদের কাছে আজ এটা কেমন কেমন হয়ে গেছে। কারণ আমাদের কাছে পহেলা জানুয়ারি মানেই নতুন বছর! আমরা যে তাদের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতিতে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এটাই আমাদের চরম ভুল। আমাদের বছর বাংলা, আমাদের সাল বাংলা কিন্তু আমরা চলি ইংরেজি সালে। অনেককেই যদি জিজ্ঞেস করা হয়, আজ বাংলা সনের কত তারিখ। সে দেখবেন আপনার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। তারখিতো দূরের কথা কত সন সেটাই বলতে পারবে না। কিন্তু সবাই আবার বর্ষবরণ করে। দেখতে একটু অন্যরকম লাগে। আমরা বাংলা সন অনুযায়ী চলি না, বলি না, করি না। অথচ আমরা এসো হে বৈশাখ এসো হে….. করে গাইতে থাকি। তাহলে কি এটা আমাদের লোক দেখানো? কাউতে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, বাংলা নববর্ষ কখন? সে পহেলা বৈশাখ না বললেও ১৪ এপ্রিল ঠিকি বলবে। কারণ বাংলা মাস, বাংলা তারিখ এসব আমাদের কাছ থেকে এখন অনেকদূরে চলে গেছে। আমরা শুধু এখন লোক দেখানো একদিনের উৎসব করি। প্রকৃত বাঙালি হয়ে উঠতে পারছি না। কিন্তু আমরা জানিনা যে এই দিনটাই বাঙালির প্রাণ। আমরা যেভাবে এগুচ্ছি তাতে একদিন এই দিনটিও অর্থহীন হয়ে পড়বে। বাংলা র্চচা করি না ঠিকি কিন্তু ইংরেজি শেখার জন্য অনেক অনেক টাকা খরচ করে ফেলি। আমরা ইংরেজি শিখতে শিখতে এমন হয়ে পড়েছি বাংলায় আবার ইংরেজিও মেশাতে শুরু করেছি। আর যারা বাংলার সাথে ইংরেজি মিশ্রণ করে কথা বলে, সমাজে তারাই আধুনিক। কিন্তু আমিতো আধুনিক হতে চাই নি। আমি একজন প্রকৃত বাঙালি হতে চেয়েছি। এ সমাজ বোধহয় সেটা আমাদের হতে দিবে না।

পান্তা ভাতে ইলিশ
সাইফুল্লাহ্‌ কায়সার

পয়লা বৈশাখে যারা পান্তা বিলাস করেন তারা কি জানেন, তারা যে পান্তা খান সেটা আসল পান্তা নয়। আসল পান্তা হল, গ্রামের গরিব মানুষের রাতে খাবার পর যে ভাত বেচে যায় সেই ভাতে পানি ঢেলে রাখা হয় যাতে সকালের নাস্তা হিসাবে খাওয়া যায়। গরিব মানুষতো আর বার বার রাঁধতে পারে না। তাদের সেই সামর্থ্য ও নেই। এই পান্তা ভাত তারা সকালে মরিচ, পেঁয়াজ আর বেচে যাওয়া বাসি তরকারি যদি থাকে তাই দিয়ে খায়। এটাই হল আসল পান্তা। সকাল বেলায় রাঁধা কাটারী ভোগ চালের গরম ভাতে পানি ঢেলে ইলিশ ভাঁজা দিয়ে যে পান্তা ভাত অতি মূল্যে বিক্রি করা হয় সেটা আসল পান্তা নয়। আসল পান্তা খেতে হলে গ্রামের গরিব কোন বাড়িতে যান। সকালে তাদের সাথে শরীক হোন। “এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পান্তাভাত গরিব মানুষের খাবার। রাতে খাওয়ার পর অবশিষ্ট ভাত রাখার কোনো উপায় ছিল না, তাই পানি দিয়ে রাখা হতো এবং সকালে আলুভর্তা, পোড়া শুকনা মরিচ ইত্যাদি দিয়ে খাওয়া হতো। আমি ছোটবেলায় খেয়েছি। কিন্তু এখন পান্তা-ইলিশ ধনীলোকের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে এবং এটা দুর্মূল্যও বটে, যা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান দেখানোর পরিবর্তে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। পান্তাভাত একদিন নয়, সারা বছরই খাওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন ছিল না।” পান্তা খাবার এই ভন্ডামী ছাড়তে হবে। কেবল পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত আর ইলিশ ভাজা খেলেই কি বাঙালি হওয়া যায়?

বাঙালি এবং বাংলা বর্ষ
সাইকা আলম

সৃষ্টির রহস্য ঘেরা পৃথিবীতে মানুষ যা কিছু প্রয়োজন মনে করেছে তা নিজেরাই তৈরি কথা নিয়েছে। ১লা বৈশাখ তেমনই একটি বাঙালি প্রাণের উৎসব যা তাদের কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতিকে মধুময় সৌভ্রাত্বের বন্ধন রূপে প্রকাশিত হচ্ছে। বিভিন্ন সম্প্রদায় বিভিন্ন গোষ্ঠী একে বিভিন্ন ভাবে পালন করে থাকে। যেমনঃবিভিন্ন গ্রামে সন্ধ্যা বেলায় জাঁক পোড়া হয়।মানে একটি পরিবারে যা কিছু অমংগল ও অপ্রয়োজনীয় তাকে তাড়ানোই হলো জাঁক।বিভিন্ন লতা পাতা কাঁটা গাছ স্তুপ করে সাজিয়ে তাকে আগুনে পোড়ানো হয়। কাঁটা গাছকে অশুভ বস্তু বলে মনে করা হয়। বছরের সমস্ত গ্লানি দূর করতে এইসব প্রতীকী ভাবনা কাজ করে। এছাড়াও বিভিন্ন মুখ রোচক খাবার রান্না করা হয়। সবজির পাঁচন একটি ঔষধি খাবার হিসাবে রান্না করা হয়।প্রতিবেশীদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়।
সবশেষে এটাই বলতে হয় যে বাঙালি কৃষ্টি, সভ্যতা আর সংস্কৃতিকে ধরে রাখার এটা একটা অভিনব প্রচেষ্টা সেই সঙ্গে সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের একটি একত্রিত মিলবন্ধন।আস্তে আস্তে এর পরিধি ও ব্যাপ্তি বৃদ্ধি ঘটছে। আধুনিক এই বাংলা ক্যালেন্ডার বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহৃত হলেও ভারতের পশ্চিম বঙ্গ ও অন্যান্য প্রদেশে তা গ্রহণ করা হয়নি। সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত প্রায় চার হাজারের অধিক ভাষার মধ্যে দেড় শতাধিক ভাষার নিজস্ব বর্ণ মালা রয়েছে এর মধ্যে বাংলা হলো অন্যতম প্রধান প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষা। ইংরেজি ভাষার ও নিজস্ব কোন বর্ণ মালা নেই। রোমান হরফ ধার করে এ আন্তর্জাতিক ভাষাটি গড়ে উঠেছে। এমনকি ইংরেজির নিজস্ব কোন সালও নেই। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে নির্ভর করে চলছে তাদের জীবন যাপন। শুধু নিজেরাই চলছেনা গোটা বিশ্বকে ও তাদের তারিখ মানতে বাধ্য করছে।

x