মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণ এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় প্রকৌশলীদের একাধিক পরিদর্শনের পরও সমস্যার উৎস নির্ধারণ করা না যাওয়ায় টার্মিনাল পরিচালনাকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে এনেছে। তাদের কারিগরি মূল্যায়নের পরই জানা যাবে ত্রুটির প্রকৃতি, মেরামতে কত সময় লাগবে এবং জাতীয় গ্রিডে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হতে পারে।
জ্বালানি বিভাগ ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি বিশেষজ্ঞরা গতকাল সন্ধ্যায় টার্মিনালটির বিস্তারিত পরীক্ষা–নিরীক্ষা করেছেন। তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
আরপিজিসিএলের স্থাপনা সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় প্রকৌশলীরা প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করলেও ত্রুটির উৎস শনাক্ত করতে পারেননি। তাই অপারেটর প্রতিষ্ঠান বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিচ্ছে। তিনি জানান, দেশে চালু হওয়ার পর এ ধরনের জটিল ত্রুটি এই এফএসআরইউতে আগে দেখা যায়নি।
বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) গ্রহণ করে। এসব টার্মিনালে এলএনজিকে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। ফলে দুটি টার্মিনালের যেকোনো একটি বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, এফএসআরইউটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে শিল্পকারখানা, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, বাণিজ্যিক গ্রাহক এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানবাহনের সারি এবং শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র জানিয়েছে, ত্রুটির সময় একটি এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনালে ভেড়ার প্রক্রিয়ায় ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় জাহাজটি দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের এলএনজি আমদানি অবকাঠামো এখনও সীমিত হওয়ায় একটি টার্মিনাল অচল হয়ে পড়লেই পুরো গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর তার বড় প্রভাব পড়ে।
গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও সেই অনুপাতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কিংবা এলএনজি গ্রহণের বিকল্প অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে জ্বালানি খাত ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে এবং একটি অবকাঠামোগত ত্রুটিও জাতীয় পর্যায়ে বড় সংকট সৃষ্টি করছে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে সীমিত গ্যাস সরবরাহের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন এবং অন্যান্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সংকট পুরোপুরি কাটাতে ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ দ্রুত সচল হওয়ার বিকল্প নেই।
এদিকে টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সে প্রশ্নেও এখনই কোনো সিদ্ধান্তে যেতে রাজি নয় সরকার। আরপিজিসিএল জানিয়েছে, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন পাওয়ার পর অপারেটরের দায়–দায়িত্ব, সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ, জরিমানা কিংবা মেরামতের ব্যয় কে বহন করবে–এসব বিষয় বিদ্যমান চুক্তির আলোকে নির্ধারণ করা হবে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট আবারও প্রমাণ করেছে যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার পাশাপাশি এলএনজি গ্রহণ ও পুনর্গ্যাসীকরণের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন টার্মিনাল এবং বিকল্প অবকাঠামো দ্রুত গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় একটি মাত্র কারিগরি ত্রুটিও ভবিষ্যতে জাতীয় অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদনের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, মহেশখালীর একটি টার্মিনাল ট্রিপ করায় চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদার অর্ধেকের কিছু বেশি গ্যাস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। সার উৎপাদনের জন্য কাফকো চালু রাখা হলেও সিইউএফএল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়া অন্যান্য কেন্দ্রগুলোও বন্ধ। এছাড়া অন্যান্য শিল্পকারখানা এবং আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতেও গ্যাসের সংকট চলছে।












