একটি মিথ্যা ঘোষণা যেভাবে বৈধ রপ্তানি চালান হয়ে যায়

শক্তিশালী চক্র, বড় আর্থিক অপরাধ জালিয়াতি ঠেকাতে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ

হাসান আকবর | সোমবার , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানির নামে বিদেশে যাচ্ছে কন্টেনার, কিন্তু কন্টেনারের ভেতর ঘোষিত পণ্য নেই। কোথাও পণ্য একেবারেই নেই, কোথাও ঘোষিত পরিমাণের সঙ্গে বাস্তব পণ্যের মিল নেই। আবার কোথাও কাগজে–কলমে কোটি টাকার তৈরি পোশাক বা অন্য পণ্য রপ্তানি দেখিয়ে বাস্তবে পাঠানো হচ্ছে খালি কন্টেনার।

অভিযোগ রয়েছে, রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, আইসিডি এবং সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা–কর্মচারীদের একটি অংশের যোগসাজশে এমন কারসাজি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একদিকে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত আমদানি করা কাপড় ও কাঁচামাল দেশীয় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে রপ্তানি প্রণোদনা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং আমদানি–রপ্তানি হিসাবের আড়ালে বড় অংকের অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। সংঘবদ্ধ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এভাবে কোটি কোটি টাকার জালিয়াতি করলেও সম্প্রতি একটি ঘটনা ধরা পড়ার পর বিষয়টি সবার নজরে আসে। ভ্যালমন্ট ফ্যাশন নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি ১২১ টন পণ্য রপ্তানির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করলেও শেষ মুহূর্তের তদন্তে পাওয়া গেল খালি কন্টেনার। ইছাক ব্রাদার্স নামের ডিপোতে কী করে পুরো প্রক্রিয়াটির কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পর্যন্ত হয়ে গেল সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। রপ্তানির ওই চালানগুলোতে পণ্যমূল্য দেখানো হয় প্রায় ৪ লাখ ৩৮ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ সময়মতো চালানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে না গেলে খালি কন্টেনারগুলো জাহাজেও উঠে যেত।

সূত্রে জানা যায়, তৈরি পোশাক খাতের কাপড়সহ বিভিন্ন কাঁচামাল ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে আমদানি করে বন্ড সুবিধার আওতায় রাখা হয়। শর্ত থাকে, এসব কাঁচামাল দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে তা আবার বিদেশে রপ্তানি করা হবে। এসব কাঁচামালের বিপরীতে কোনো শুল্ক পরিশোধ করা হয় না। কিন্তু দেশে গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ একটি চক্র এই বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে আমদানিকৃত বিনাশুল্কের পণ্যগুলো কিংবা তৈরি পোশাক দেশের খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয়। পরে এই ট্যাক্স ফাঁকি এবং আত্মসাৎ আড়াল করতে ভুয়া রপ্তানির ব্যবস্থা করা হয়।

তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে কারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্য প্রথমেই যায় বেসরকারি আইসিডিগুলোতে। ওখান থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং ফ্রেইট ফরোয়ার্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিদর্শনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার পর তৈরি হয় ডকুমেন্টস। ওই ডকুমেন্টস দিয়ে কন্টেনারগুলো পাঠানো হয় বন্দরে। বন্দর থেকে জাহাজে বোঝাই করে কন্টেনার পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট দেশে। এতগুলো প্রক্রিয়া ঠিকভাবে শেষ করে খালি কন্টেনার বন্দরে পাঠাতে হলে কতটুকু নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হয় তাই বিস্মিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

তারা বলেন, এই ধরনের জালিয়াতিতে পণ্য উপস্থিত থাকে না, বরং কাগজপত্র, সফটওয়্যার এন্ট্রি, কন্টেনার নম্বর, বিল অব এঙপোর্ট, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেডিং এবং ম্যানিফেস্ট–পুরোটাই ভুয়ার উপর তৈরি করা হয়। একটি চালানকে কাগজে বৈধ দেখাতে পারলে পরবর্তী ধাপগুলোতে একই তথ্য এক সিস্টেম থেকে অন্য সিস্টেমে চলে যেতে পারে। এনবিআরের অ্যাসাইকোডা ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থায় বিল অফ এঙপোর্ট থেকে ইজিএমের বিভিন্ন তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

এই ধরনের জালিয়াতিতে আইসিডি থেকে প্রথম তথ্যটি ঠিকভাবে তৈরি করা গেলে পরবর্তীতে আর কোথাও আটকা পড়ে না। ঘোষণায় যদি বলা হয় একটি কন্টেনারে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক, কাপড় বা অন্য পণ্য রয়েছে, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে কন্টেনারটি সেই ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সিস্টেমে দেখা যায়। সংঘবদ্ধ চক্রটি এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকার জালিয়াতি করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তারা প্রথমে একটি রপ্তানি চালানের কাগজ তৈরি করে। পরে ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, পণ্য বিবরণ, পরিমাণ, ওজন, মূল্য, ক্রেতার তথ্য এবং কন্টেনার নম্বর দেওয়া হয়। এরপর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার বুকিং ও শিপিং–সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করেন। আইসিডি বা অফডক পর্যায়ে কন্টেনার হ্যান্ডলিং, স্টাফিং, সিল এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড তৈরি হয়। সবশেষে কন্টেনার বন্দর দিয়ে জাহাজে ওঠে যায়।

এই পুরো চেইনের প্রতিটি ধাপে সংঘবদ্ধ চক্রটির লোক থাকে। তারা প্রত্যেকে একই কাগজের তথ্যকে সত্য বলে সত্যায়িত করে। তখন একটি মিথ্যা ঘোষণাও বৈধ রপ্তানি চালান হয়ে যায়। এতে একদিকে বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল বাইরে বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পাশাপাশি পণ্য রপ্তানি না করেই চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার রপ্তানি প্রণোদনা। চক্রটির সাথে বিদেশি ক্রেতাদেরও ঘনিষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। খালি কন্টেনার পাঠালেও তারা রপ্তানিমূল্য ব্যাংকে পাঠায়। মূলত রপ্তানিকারকের অর্থই ঘুরে দেশে আসে। এর মাধ্যমে চক্রটি বড় ধরনের আর্থিক অপরাধ সংঘটন করে চলেছে। একইভাবে তারা ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মুদ্রা পাচারের মতো ঘটনা ঘটায়।

বিষয়টি নিয়ে একাধিক গার্মেন্টস মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের অপকর্মে জড়িত। এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। পুরো চক্রটিকে খুঁজে বের করে এই জালিয়াতি ঠেকাতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তারা বলেন, এর সাথে শুধু গার্মেন্টস মালিক নন, সংশ্লিষ্ট অনেকে জড়িত। সুকৌশলে এবং সংঘবদ্ধভাবে তারা খালি কন্টেনার বিদেশে রপ্তানি করছে। এই আর্থিক অপরাধ উদঘাটনে পৃথক একটি টিম গঠন করে বড় পরিসরে কাজ করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধগ্যাসের পর এবার বাধা যন্ত্র
পরবর্তী নিবন্ধবিয়ের আনন্দ কেড়ে নিল কাভার্ডভ্যান