সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জড়িত থাকার সূত্র পাওয়ার কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম। অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে কল ডিটেইল রেকর্ড–সিডিআর পর্যালোচনায় ওই সূত্র পাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তবে ওই ব্যক্তির নাম–পরিচয় প্রকাশ করেননি আমিনুল ইসলাম। গতকাল নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ব্যাপারে আমাদের যে ক্লুটা আমরা পেয়েছি, সেটি আপনাদেরকে আমরা নাম–পরিচয় প্রকাশ করতে পারছি না। তবে এইটুকুন বলতে পারছি যে, একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, তার সঙ্গে সাগর–রুনির এই ঘটনার একটা কানেকশন সিডিআর পর্যালোচনায় পাওয়া যায়। খবর বিডিনিউজের।
সাগর–রুনি হত্যা মামলার তদন্ত বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন–পিবিআই করছে তুলে ধরে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এ মামলা সরাসরি তদন্ত করছে না। অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ওই সূত্র পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে তুলে ধরে তিনি বলেন, তার তথ্য আমাদের নজরদারিতে আছে এবং আরও তদন্ত হওয়ার পরে আমরা আরও নির্ভরযোগ্য কোনো কিছু পাওয়া গেলে যে পিবিআই, সংশ্লিষ্ট ইনভেস্টিগেটিং অফিসার যারা আছেন, তাদেরকে আমরা হয়তো এই তথ্যটা দিয়ে সহায়তা করব।
ট্রাইব্যুনালে সাগর–রুনির ছেলে মেঘ : সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক ব্যক্তি জড়িত থাকার তথ্য পাওয়ার কথা শুনে তদন্ত সম্পর্কে জানতে গতকাল বিকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসেছেন এ দম্পতির সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ। সঙ্গে ছিলেন তার মামা নওশের আলম রোমান।
ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেবে পরিবার : ১৪ বছর ধরে অমীমাংসিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার বিচারের আশায় এবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা দেবে বলে তথ্য দিয়েছে তাদের পরিবার। ট্রাইব্যুনালে আজ সোমবার অভিযোগটি দেওয়া হবে বলে সাংবাদিকদের বলেছেন সাগর–রুনির ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ ও রুনির ভাই নওশের আলম রোমান।
গতকাল বিকালে এ বিষয়ে কথা বলতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলামের কার্যালয়ে যান রোমান ও মেঘ। পরে দীর্ঘদিন পর তদন্তে নতুন তথ্য আসায় এই মামলার বিচারের জন্য সাংবাদিকদের আশাবাদী হওয়ার কথা বলেন মেঘ।
তিনি বলেন, আমি চাই যথাযথ বিচারটা হোক। আমি চাই না কোনো ফলস, ভুল মানুষ কোনোভাবে এতে অন্তর্ভুক্ত হোক।
রুনির ভাই রোমান বলেন, আমরা চাচ্ছি আসলে এটা ফাইনালি একটা রেজাল্টে যাক। আমরা যেন জানতে পারি কারা করেছে এবং কোনোরকম গল্প বা কোনো কিছু না, প্রকৃতপক্ষে যারা জড়িত, তারা যেন সামনে আসে। বর্তমান তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে নতুন টাস্কফোর্স গঠনের পরও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। টাস্কফোর্স পুরোপুরি আসলে জিরোতে। এজ ইউজুয়াল যেটা ছিল গত ১৪ বছর, ওখানেই আছে।
র্যাবের হাতে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময়েও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাদের মুক্তির দাবি তোলেন রোমান। পাশাপাশি তদন্তে যাদের নাম নতুন করে আসছে, তারা দেশ ছাড়তে না পারেন সে বিষয়েও পদক্ষেপ চান তিনি।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের তৎকালীন বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। চার দিন পর তদন্তভার দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। দুই মাসের বেশি সময় তদন্ত করেও ডিবি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় হাই কোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ সময় র্যাবের তদন্তেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাই কোর্ট মামলাটির তদন্ত থেকে র্যাবকে সরিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
হাই কোর্টের নির্দেশের পর ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। পিবিআই প্রধানকে ওই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক করা হয়। বর্তমানে এই টাস্কফোর্সের অধীনেই মামলার তদন্ত চলছে। তবে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হওয়ায় টাস্কফোর্সকে বেশ কয়েক দফায় সময় দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল হাই কোর্ট আরও ছয় মাস সময় দেয়।
এদিকে সাগর–রুনি হত্যা মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় পড়বে কি না, একজন সাংবাদিকের এ প্রশ্নের জবাবে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, আমাদের এখানে যেহেতু এটা ওয়াইডস্প্রেড বা সিস্টেমেটিক অফেন্স না, এটা একটা স্বতন্ত্র হত্যা মামলা। সেই কারণে এটা সংশ্লিষ্ট দায়রা আদালতেই বিচার হবে। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে পাওয়া নতুন তথ্য–উপাত্ত ও আলামত সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাকে দেওয়া হবে।












