ঋণখেলাপি কোম্পানি বন্ধ নয়, দুর্নীতিতে জড়িত মালিকের বিচার হবে

খেলাপি ঋণ ও এস আলম গ্রুপের ঋণ প্রসঙ্গে সংসদে অর্থমন্ত্রী । ইমোশনের উপরে অর্থনীতি চলে না,আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে । রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১.৪৮ লাখ কোটি টাকা । মাথাপিছু সরকারি ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা । ২০১০-২৪ সময়ে বিদেশি ঋণ ৮১.৮৩ বিলিয়ন ডলার । আগের সরকারের প্রায় ১৩০০ প্রকল্প মূল্যায়ন করছে সরকার । কাস্টমসে বাজেয়াপ্ত ৯৬১ গাড়ি, ৬২২টির মামলা চলছে

| সোমবার , ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ঋণখেলাপি কোনো কোম্পানির মালিক দুর্নীতিতে জড়িত হলে তার বিচার হবে, তবে সেই কারণে কোম্পানিটি বন্ধ করে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মালিকের ব্যক্তিগত পরিচয় থেকে কোম্পানির আইনি সত্তা আলাদা। একটি কোম্পানি বন্ধ করলে সেখানে কর্মরত মানুষ, ঋণ পরিশোধ এবং অর্থনীতিতে প্রতিষ্ঠানটির অবদানের ওপর প্রভাব পড়বে। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে নোয়াখালী৬ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। এ সময় সংসদের অধিবেশন পরিচালনা করছিলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। খবর বিডিনিউজের।

হান্নান মাসউদ তার প্রশ্নে খেলাপি ঋণ ও এস আলম গ্রুপের ঋণের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের মার্চের শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। পরের তিন মাসে তা আরও ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বেড়েছে। সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদের ভাষ্য, ফ্যাসিস্ট আমলে ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অনাদায়ী ঋণ আদায় না করে এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার ওয়ান লিমিটেডকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলারের ঋণপত্র বা এলসি খোলার বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কোম্পানি আইডেন্টিটি সেপারেট ফ্রম দ্য আইডেন্টিটি অব ইন্ডিভিজুয়াল। ইটস লিগ্যাল এন্টিটি, করপোরেট এন্টিটি।’ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার চলতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে সেই ব্যক্তির মালিকানাধীন কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না বলেও মত দেন অর্থমন্ত্রী।

তার কথায়, ‘আপনি বাংলাদেশের যেকোনো কোম্পানিকে কোনো ব্যক্তির কারণে বন্ধ করে দিয়েসেই কোম্পানিতে লোকজন চাকরি করে, সেই কোম্পানির ঋণের দায় আছে, সেই কোম্পানির ঋণ পরিশোধ করতে হবে, সেই কোম্পানির অর্থনীতিতে কন্ট্রিবিউশন আছে এবং ওই কোম্পানির এমপ্লয়মেন্টের ক্ষতি করে বন্ধ করে দিয়ে কোনো দেশের কোনো অর্থনীতি চলতে পারে না।’ দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না দাবি করে তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং বিচার হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন ভেঙে কাউকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না বলেও দাবি করেন অর্থমন্ত্রী। আইনে সুযোগ থাকলে কোনো কোম্পানি ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবে জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ইমোশনের উপরে অর্থনীতি চলে না। আইনের উপর অর্থনীতি চলতে হবে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১.৪৮ লাখ কোটি টাকা : বাগেরহাট৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল আলীমের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী জানান, গত ৩০ জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর অর্ধেকের বেশি জনতা ব্যাংকের, যার পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বেশি।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ১৩১ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৮৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

মাথাপিছু সরকারি ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা : কুষ্টিয়া১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সরকারি ঋণের হিসাবে দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা। ঋণের চাপ কমাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। নিজস্ব আয় বাড়িয়ে সরকারের ঋণের প্রয়োজন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থায়নের চাহিদা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

২০১০২৪ সময়ে বিদেশি ঋণ ৮১.৮৩ বিলিয়ন ডলার : কঙবাজার৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশ থেকে মোট ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে বিদেশি ঋণের আসল হিসেবে ১৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ হিসেবে ৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। এ সংসদ সদস্যের আরেক প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

আগের সরকারের প্রায় ১৩০০ প্রকল্প মূল্যায়ন করছে সরকার : আগের সরকারের নেওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, মূল্যায়নের পর কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়া হচ্ছে। আবার শেষ পর্যায়ে চলে আসা কিছু প্রকল্প শেষ করা ছাড়া সরকারের সামনে উপায় নেই। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।

রানু তার প্রশ্নে ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৫ বছরে দেশিবিদেশি ঋণের অর্থে নেওয়া প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত হয়েছে কি না জানতে চান। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোর মূল্যায়ন প্রায় শেষের দিকে। কিছু মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। আবার কিছু প্রকল্পের মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।

কাস্টমসে বাজেয়াপ্ত ৯৬১ গাড়ি, ৬২২টির মামলা চলছে : রাজশাহী১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, কাস্টমসের আওতায় বাজেয়াপ্ত ৯৬১টি গাড়ির মধ্যে ১০৫টি নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। ব্যবহারের অনুপযোগী ৭৪টি গাড়ি স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। আরও ৩০টি গাড়ি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরে হস্তান্তর করা হয়েছে। ১৩০টি গাড়ি নিলামের অপেক্ষায় রয়েছে। বাকি ৬২২টি গাড়ি নিয়ে আদালতে রিট মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া চলায় সেগুলো নিলাম করা যাচ্ছে না।

এ ধরনের গাড়ি ও অন্যান্য পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সম্পদের অপচয় ঠেকাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত ১৭ আগস্ট সংশ্লিষ্ট স্থায়ী আদেশ সংশোধন করেছে। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ধরনের আটক ও বাজেয়াপ্ত গাড়ি সংরক্ষিত মূল্যের অন্তত ৬০ শতাংশ দামে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কাছে বিক্রি করা যাবে। নিলামের পরও বিক্রি না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে গাড়িসহ অন্যান্য পণ্য নিলাম ছাড়াই হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।

পেমেন্ট গেটওয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত : কুমিল্লা৬ আসনের মনিরুল হক চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির সুবিধা পেতে সাধারণ মানুষের সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তফসিলি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব সুবিধা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্র সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। পেপ্যালের পাশাপাশি স্ট্রাইপসহ অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ের ব্যবহার হচ্ছে বলেও সংসদকে জানান তিনি।

তরুণরা যেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায় সহজে অংশ নিতে পারেন, সেজন্য নিয়ম সহজ করার পাশাপাশি অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস
পরবর্তী নিবন্ধডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর