আর্থিক সমৃদ্ধির জন্য সঞ্চয়, বিনিয়োগ শিক্ষা ও পুঁজিবাজার

মোহাম্মদ আইয়ুব | সোমবার , ২২ জুন, ২০২৬ at ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, আর্থিক সচেতনতা কার্যক্রম ও বিনিয়োগ শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি কথা অসংখ্যবার শুনেছি ‘ভাই, আমি এত আর্থিক পরিকল্পনা বুঝি না। বড়লোক হওয়ার স্বপ্নও দেখি না। ভালোভাবে খেয়েপরে চলতে পারলেই হলো।’

প্রথম শুনতে কথাটি সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, ‘ভালোভাবে চলা’র মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যয়, বার্ধক্যের সুরক্ষা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা। বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ বিলাসবহুল জীবন না চাইলেও একটি নিরাপদ, স্বচ্ছল ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ কামনা করেন। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সচেতনতা, সঞ্চয়ের অভ্যাস ও বিনিয়োগ শিক্ষা অনেকের মধ্যেই অনুপস্থিত। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে আর্থিক সফলতা শুধু আয়ের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে আয়কে কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয়, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার ওপর।

এই বাস্তবতাকে বোঝাতে দুইজন ব্যক্তির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার একজন চাকরিজীবী আরেফিন সাহেব (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তার মাসিক আয় ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। সংসারে স্ত্রী, দুই সন্তান ও বৃদ্ধ মা। মাস শেষে প্রায়ই তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, ‘এত কম আয়ে সঞ্চয় করব কীভাবে?’

অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহরের রিয়াজুদ্দিন বাজারের ছোট কাপড় ব্যবসায়ী বিপ্লব দাশ (ছদ্মনাম)-এর মাসিক আয় ছিল প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। তুলনামূলক বেশি আয় সত্ত্বেও মাস শেষে তার হাতেও উল্লেখযোগ্য অর্থ অবশিষ্ট থাকত না। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বেড়ে গিয়েছিল। দশ বছর পর দেখা গেল, আরেফিন সাহেবের কিছু ব্যাংক সঞ্চয় থাকলেও গড়ে ওঠেনি কার্যকর কোনো জরুরি তহবিল। সন্তানের উচ্চশিক্ষা কিংবা নিজের অবসর জীবনের জন্যও ছিল না সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। অন্যদিকে বিপ্লব দাশও নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেননি। ডিপিএস, সর্বজনীন পেনশন স্কিম, সঞ্চয়পত্র কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজারভিত্তিক বিনিয়োগ্তকোনোটির সঙ্গেই তিনি যুক্ত ছিলেন না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো বিনিয়োগ শিক্ষা বা আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচিতেও তারা কখনো অংশগ্রহণ করেননি।

এই দুই উদাহরণ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তাদের প্রধান সমস্যা ছিল না আয়ের স্বল্পতা; প্রকৃত সংকট ছিল আর্থিক পরিকল্পনার অভাব, সঞ্চয়ের শৃঙ্খলার অভাব এবং বিনিয়োগ সম্পর্কে অজ্ঞতা।

আজকের বাস্তবতায় ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া আর বিলাসিতা নয়; এটি একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। কারণ বর্তমান আয় ভবিষ্যতের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না, যদি সেই আয় সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়।

একটি সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে মানুষকে ধনী বা দরিদ্র বানায় শুধু তার আয় নয়; বরং আয়ের কতটুকু অংশ সে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ ও বিনিয়োগ করতে পারছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার আর্থিক অবস্থান নির্ধারণ করে।

সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো, অনেকেই মনে করেন মাস শেষে যা অবশিষ্ট থাকবে, সেটিই জমাবেন। বাস্তবে মাস শেষে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। সফল মানুষরা উল্টো কাজ করেন। তারা আয় হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি নির্দিষ্ট অংশ সঞ্চয়ের জন্য আলাদা করে রাখেন এবং অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে ব্যয় পরিচালনা করেন।

ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার একটি বহুল স্বীকৃত নীতি হলো ‘সবার আগে নিজেকে পরিশোধ করুন।’ অর্থাৎ নিজের ভবিষ্যতের জন্য আগে সঞ্চয় করুন, তারপর ব্যয় করুন।

বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকের ডিপিএস কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জন্য একটি কার্যকর সঞ্চয়মাধ্যম। যাদের হাতে এককালীন কিছু অর্থ রয়েছে, তারা স্থায়ী আমানত (এফডিআর) বিবেচনা করতে পারেন। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র ও ট্রেজারি বন্ডও দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংরক্ষণের কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। সরকারি গ্যারান্টির কারণে অনেকেই এগুলোকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন। এ প্রসঙ্গে একজন এমপিওভুক্ত স্কুলশিক্ষকের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি আমার একটি বিনিয়োগ শিক্ষা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি মাসে মাত্র ১ হাজার টাকা করে ডিপিএস এবং সুযোগমতো কিছু ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন স্কয়ার ফার্মা ও প্রাণ কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ শুরু করেন।

অঙ্কটি ছিল ছোট, কিন্তু তিনি ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন। সময়ের সঙ্গে চক্রবৃদ্ধি মুনাফা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের শক্তি তার আর্থিক অবস্থাকে বদলে দেয়। পরবর্তীতে সন্তানের উচ্চশিক্ষা, নিজের চিকিৎসা এবং অবসর জীবনের নিরাপত্তায় সেই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই উদাহরণ আমাদের একটি মৌলিক সত্য শেখায় বিনিয়োগে বড় অঙ্কের অর্থ নয়, বরং সময় ও ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে শুধু সঞ্চয় করলেই হবে না। মূল্যস্ফীতির কারণে সময়ের সঙ্গে অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সমৃদ্ধির জন্য সঞ্চয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগও অপরিহার্য। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল হতে পারে মোট সঞ্চয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ তুলনামূলক নিরাপদ খাতে এবং বাকি ১০ থেকে ২০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার বা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা।

পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এটি সাধারণ মানুষের জন্য সম্পদ সৃষ্টির একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। এখানে অল্প পুঁজির একজন মানুষও একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পান। পৃথিবীর খুব কম বিনিয়োগ মাধ্যমেই এমন সুযোগ রয়েছে।

অনেকেই মনে করেন পুঁজিবাজার মানেই বড় পুঁজি। বাস্তবে ধারণাটি সঠিক নয়। বর্তমানে অল্প অর্থ দিয়েও ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার কেনা সম্ভব। ফলে সীমিত আয়ের মানুষও ধীরে ধীরে সম্পদ গঠনের যাত্রা শুরু করতে পারেন। তবে পুঁজিবাজারে সফল হতে হলে ধৈর্য, জ্ঞান, শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার কিংবা দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভনে বিনিয়োগ করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিনিয়োগের আগে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা, আর্থিক প্রতিবেদন, লভ্যাংশের ইতিহাস, করপোরেট সুশাসন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি।

প্রকৃতপক্ষে সম্পদ গঠনের তিনটি মৌলিক স্তম্ভ হলো নিয়মিত সঞ্চয়, বিচক্ষণ বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ সময়। এই তিনটির সমন্বয়েই আর্থিক সমৃদ্ধির ভিত্তি নির্মিত হয়। তাই সঞ্চয় শুরু করার জন্য আগামী মাস, আগামী বছর কিংবা বেতন বৃদ্ধির অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আজ ৫০ টাকা, ১০০ টাকা কিংবা ৫০০ টাকা দিয়েও যাত্রা শুরু করা যায়। ছোট সঞ্চয়ই একদিন বড় স্বপ্নের ভিত্তি গড়ে তোলে। আর সেই ভিত্তির ওপরই নির্মিত হয় একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।

লেখক : প্রশিক্ষক, রিসোর্স পার্সন ও বিনিয়োগ শিক্ষা বক্তা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশিক্ষা উপকরণ : কার্যকর পঠন-পাঠনের অন্যতম উপাদান
পরবর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে