পাকুন্দিয়া হলো শিক্ষা–সংস্কৃতি ও উন্নয়নে এগিয়ে থাকা কিশোরগঞ্জের একটি উর্বর উপজেলা। স্কুল–কলেজ তো আছেই। এখানে রয়েছে ৪টি নদী। সেগুলো হচ্ছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী, বানার লোয়ার নদী, ঘোড়াউত্রা নদী এবং নরসুন্দা নদী। এই উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে অধ্যয়নরত নবম শ্রেণির ৪০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে পরিচালিত হয় একটি অনন্য কর্মশালা। সৃজনশীল কর্মশালাটির নাম রাখা হয়েছে ‘আমরা করবো জয়’। এটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক ও শিশুসাহিত্যিক মাহফুজুর রহমান। ডেলটা ফার্মার সহযোগিতায় এই সৃজনশীল কর্মশালাটি পরিচালনা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলা সেই কর্মশালায় চট্টগ্রাম থেকে গতবছর যুক্ত হয়ে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম আমি। এবারও গত ১৩ জুন দিনব্যাপী এই কর্মশালায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে কথা বলে নিজে মুগ্ধ হয়েছি।
মাহফুজুর রহমান বিচক্ষণ মেধাবী ও কর্মপাগল এক ব্যক্তিত্বের নাম। জন্ম এই পাকুন্দিয়াতেই। চরফরাদী গ্রামে। সারাক্ষণ তাঁর মাথায় ঘোরে কীভাবে শিশু–কিশোরদের সৃজনশীল পথে সংযুক্ত করা যায়। যতদূর জানা যায়, গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়াশোনার হাতেখড়ি তাঁর। এরপর পড়াশোনা করেছেন পাকুন্দিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ভৈরব কেবি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ভৈরব হাজী আসমত কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ফিলিপিন্সে। ভ্রমণের নেশায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া বিশ্বের সকল মহাদেশে। প্রায় ৪৩টি দেশে। তিনি লিখছেন বিচিত্র ধরনের বিষয় নিয়ে। শিশুদের জন্য লিখেছেন গল্প, রূপকথা, ভ্রমণগল্প, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, আবিষ্কারের কাহিনি। পেশাগত বিষয় নিয়েও আছে তাঁর লেখা বই। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬৮। দুরবিনে দূরদেশ–এর জন্য তিনি ভ্রমণসাহিত্য ক্যাটাগরিতে পেয়েছেন ‘অগ্রণী ব্যাংক–শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার’। এ ছাড়াও রয়েছে অনেকগুলো পুরস্কার ও সম্মাননা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে অসামান্য ছড়া–সংকলন ‘ছড়ায় ছড়ায় শুদ্ধাচার’। এছাড়া প্রকাশ করেছেন ‘ আমাদের চিরসঙ্গী রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক অসাধারণ সংকলন।
এবারের কর্মশালায় চারজন বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক চারটি ভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। শুরুতেই ‘বাংলা সাহিত্য‘ বিষয়ে আলোচনায় ছিলাম আমি রাশেদ রউফ। এরপর ‘সৃজনশীল বাংলা লেখার কৌশল’ নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক হাসান রাউফুন। পরে বাচিকশিল্পী আয়েশা হক শিমু ‘উপস্থাপনা, কথাবলা ও বক্তব্য প্রদান’ বিষয়ে এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক খান ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ে আলোচনা করেন। কর্মশালার সহযোগিতায় ছিলেন কবি গোলাপ আমিন।
আমরা জানি, মেধা ও সৃজনশীলতা এক নয়। অনেক মেধাবী মানুষ আছে যারা শিক্ষা জীবনে ভীষণভাবে সফল, কিন্তু ব্যক্তি এবং কর্মজীবনে সেভাবে নয়। অনুরূপভাবে সৃজনশীল মানুষ তা ব্যক্তি ও কর্মজীবনে অনেক বেশি সফল। তাই সৃষ্টিশীল প্রতিটি মানুষ মেধাবী, তারা তাদের মেধার বহুমাত্রিক প্রয়োগের মাধ্যমে যেমনি আত্মতৃপ্ত হয় সেভাবেই মেধার বিকাশ ঘটায়। তাই বলা যায় মেধা বিকাশের স্বার্থে সৃজনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক হাওয়ার্ড গার্ডনার তার ‘ফ্রেমস অব মাইন্ড : দ্য থিওরি অব মাল্টিপল ইন্টিলিজেন্সেস’ –এ শিখনের আট ধরনের বুদ্ধিমত্তার কথা উল্লেখ করেছেন। তারমধ্যে শিশুর সৃজনশীল বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কোনো কোনো শিশু শোনা, বলা, নক্সা, ছবি, রেখাচিত্র, রূপকল্পনার সাহায্যে শেখে। কেউ আবার শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে হাতে কলমে কাজ করে শেখে। সংগীত, ছড়া, গল্প, সংগীতের তাল ও লয়ের মাধ্যমে সহজে শিখতে পারে। কোনো কোনো শিশু আবার প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে সহজেই শিখতে পারে। এ শিক্ষা সবই শিশুর সৃজনশীল বিকাশকে গতিশীল করে থাকে। শিশুদের বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী খেলারছলে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে আগ্রহী করে তুলতে হবে।
শিশুকিশোরকে সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে যে সুফলগুলো পাওয়া যায়; যোগাযোগে দক্ষতা বৃদ্ধি–নিজের সৃজনশীলতার বৃদ্ধি ও নতুন ধারণা লাভের আশায় সৃষ্টিশীল কাজের বিনিময়ে শিশু–কিশোরের যোগাযোগ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
মূলত শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ ও সৃজনশীলতা চর্চায় অনুপ্রাণিত করতেই ‘আমরা করবো জয়’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম আরও বৃহত্তর পরিসরে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও কর্মশালার প্রাণপুরুষ মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন। এরকম কর্মশালা দেশের সব এলাকায় পরিচালিত হলে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠতে পারে সৃজনপ্রক্রিয়ায়।
২.
এর আগের দিন সন্দীপন সাহিত্য আড্ডার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় রবীন্দ্র নজরুল সুকান্ত স্মরণানুষ্ঠান। এতে বিষয়ের ওপর আলোচনা উপহার দেন লেখক আলী আকবর, আমিনুল ইসলাম সেলিম, পথিক চাঁদ, এহসান শরীফ, জমাতুল ইসলাম পরাগ। সভাপতিত্ব করেন সন্দীপন সাহিত্য আড্ডার সভাপতি কবি সাদরুল উলা। প্রধান অতিথি ছিলেন কথাসাহিত্যিক ও মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাচিকশিল্পী আয়েশা হক শিমু, গবেষক হাসান রাউফুন, লেখক শ্যামলী খান। বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জের কৃতী পুরুষ মাহফুজুর রহমান। আলোচনা ও আবৃত্তিতে অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ উচ্চতায় মর্যাদাবান করেছে।
৩.
একটি প্রবাদ চালু আছে : ‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ’। তার অর্থ হলো, মানুষ যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন তার জীবনে ভালো কিছুর আশা থাকবে। আমি খুব ভালোভাবে বিশ্বাস করি, কাজের সঙ্গে থাকতে পারাটাই আনন্দ। যতদিন পারবো– কাজ করে যাবো ইনশাআল্লাহ। সাংবাদিকতা, লেখালেখি, প্রকাশনা, সাহিত্য অনুষ্ঠান, সংগঠন– প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাকে শ্রম দিয়ে যেতে হবে, সময় দিতে হবে। এজন্য হয়তো কারো ঈর্ষার পাত্র হবো, কারো সমালোচনার টার্গেট হবো। কিন্তু তাতে কিছুই যায় আসে না। কারণ আমার কাজই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ফেলো, বাংলা একাডেমি।












