মনের অস্থিরতা এই শব্দটার ভেতরে কত না অজানা ঝড় লুকিয়ে থাকে! বাইরে থেকে মানুষকে যতটা শান্ত, স্থির, স্বাভাবিক মনে হয়, ভেতরে সে ততটাই অস্থির, অগোছালো, ভাঙা অনুভূতির ভারে নুয়ে পড়ে থাকে। বিশেষ করে যখন ভালোবাসার মানুষটাকে পাওয়া হয় না, তখন সেই অস্থিরতা আরও গভীর, আরও নির্মম হয়ে ওঠে। মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন শুধু একজন মানুষকে নয় একটা স্বপ্নকে ভালোবাসে, একটা ভবিষ্যৎকে কল্পনা করে, একটা ‘আমরা’ গড়ে তোলে নিজের ভেতরে। সেই ‘আমরা’–টা এতটাই বাস্তব মনে হয় যে, মনে হয় এটাই হবে জীবনের শেষ ঠিকানা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন, অনেক নির্দয়।
যাকে ভালোবাসি, তাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে এটা খুব স্বাভাবিক। তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে, পাশে থাকতে ইচ্ছে করে, তার হাসিতে নিজের সুখ খুঁজে নিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু যখন সেই মানুষটা দূরে সরে যায়, বা কখনোই নিজের হয়ে ওঠে না, তখন মনের ভেতরে শুরু হয় এক অদৃশ্য যুদ্ধ। এই যুদ্ধের কোনো শব্দ নেই, কিন্তু কষ্টটা অসহ্য।
মনের ভেতরে তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে ‘কেন হলো না?’ ‘আমি কি কম ভালোবেসেছিলাম?’ ‘সে কি একবারও বুঝলো না?’ এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর থাকে না, তবুও মন থেমে থাকে না। বারবার একই জায়গায় ফিরে যায়, একই স্মৃতি আঁকড়ে ধরে, একই কষ্ট নতুন করে অনুভব করে।
অস্থিরতা তখন এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে কোনো কিছুতেই মন বসে না। চারপাশে মানুষ থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একা লাগে। হাসতে ইচ্ছে করে না, আবার কান্নাটাও ঠিকমতো আসে না। মনে হয়, যেনো সব কিছু ঠিক আছে তবুও কিছু একটা নেই, খুব জরুরি কিছু একটা নেই। রাতগুলো তখন সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। চারপাশ নিস্তব্ধ, কিন্তু মনের ভেতরে তখন সবচেয়ে বেশি শব্দ। স্মৃতিগুলো একে একে সামনে আসে কথা, হাসি, ছোট ছোট মুহূর্ত সবকিছু যেনো সিনেমার মতো চলতে থাকে। আর তখনই বুঝা যায়, মানুষ কাউকে যতটা না পেয়ে কষ্ট পায়, তার চেয়েও বেশি কষ্ট পায় ভুলতে না পারার জন্য।
এই অস্থিরতা ধীরে ধীরে মানুষকে বদলে দেয়। আগের মতো আর কিছুতেই আগ্রহ থাকে না। যেগুলো একসময় ভালো লাগতো, সেগুলোও এখন অর্থহীন মনে হয়। কারণ মনের একটা বড় অংশ তখনও সেই মানুষটার কাছেই আটকে থাকে।
তবে একটা সময় আসে, যখন মানুষ বুঝতে শুরু করে সব ভালোবাসা পাওয়ার জন্য না। কিছু ভালোবাসা শুধু অনুভব করার জন্য, কিছু মানুষ শুধু জীবনে এসে শেখানোর জন্য। তারা আসে, কিছু মুহূর্ত দিয়ে যায়, তারপর চলে যায় কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া অনুভূতিগুলো অনেক দিন, অনেক বছর পর্যন্ত থেকে যায়।
অস্থিরতা একসময় ধীরে ধীরে কমে, কিন্তু পুরোপুরি কখনোই হারিয়ে যায় না। মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই ফিরে আসে কোনো গান শুনে, কোনো জায়গা দেখে, কিংবা হঠাৎ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেলে। তবুও মানুষ বেঁচে থাকে। কারণ জীবন থেমে থাকে না। যত কষ্টই হোক, সময় এগিয়ে চলে, মানুষকেও এগোতে হয়। মনের ভেতরের অস্থিরতা নিয়েই মানুষ নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলে, নতুন করে বাঁচতে শেখে।













