অধ্যাপক খালেদ ছিলেন আলোকবর্তিকা

শিশুমেলায় প্রাণের জোয়ার

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ২ জুলাই, ২০২২ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ ছিলেন আলোকবর্তিকা, যার জন্মই হয়েছে এ সমাজকে, সমাজের মানুষগুলোকে আলোকিত করার জন্য। তিনি ছিলেন বহু গুণে গুণান্বিত এক ব্যক্তিত্ব। তিনি অধ্যাপনা করেছেন, রাজনীতি করেছেন, সাংবাদিকতা করেছেন। গভীর অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। তাঁকে বলা হয় বিবেকের বাতিঘর। তাঁর বিবেক আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। তিনি তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও আদর্শের কারণে সফল হয়েছেন। তবে সবচেয়ে বড়ো কথা তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। নিজেকে একটি অনুকরণীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন।

গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, দৈনিক আজাদীর সাবেক সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম একাডেমি আয়োজিত অধ্যাপক খালেদ শিশুমেলার উদ্বোধনী অধিবেশনে অতিথিবৃন্দ এ অভিমত ব্যক্ত করেন। শিশুমেলা উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক।

অতিথিবৃন্দ বলেন, একজন মানুষের জীবনে দুটি কাজ সবচেয়ে কঠিন। এক. খ্যাতি অর্জন করা এবং দুই. সেই খ্যাতিটা ধরে রাখা। অধ্যাপক খালেদ নিজের অজান্তেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং আমৃত্যু সেই খ্যাতি ধরে রেখেছিলেন। বর্তমান সমাজে সত্যিকার মানুষের সংকট চলছে। অধ্যাপক খালেদ ছিলেন উঁচু মাপের মানুষ। অধ্যাপক খালেদ কথা বলতেন দৃঢ়ভাবে, যার সাথে কাজের সমন্বয় থাকতো। অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন বলেই অধ্যাপক খালেদ কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না। তিনি আজীবন সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কিছু অংশও যদি আমরা নিজেদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারি, তবেই এ ধরনের আয়োজন সার্থক হয়ে উঠবে।

অধ্যাপক খালেদ শিশুমেলায় প্রাণের জোয়ার বয়ে গেছে। শিশুমেলা উপলক্ষ্যে অসংখ্য শিশু কিশোরের দীপ্ত পদচারণায় গতকাল শুক্রবার মুখর হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। এছাড়াও শিশুমেলায় কবি, শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগঠক, সংস্কৃতিকর্মী ও নানা শ্রেণীপেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল সপ্রাণ। বর্ণিল শিশুমেলা উপলক্ষে আয়েজিত চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় শিশুরা তাদের কোমল হাতে রঙের তুলিতে ফুটিয়ে তোলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ছবি, তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলার ছবি। আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগীদের কণ্ঠেও ছিল দেশের জন্য আকুতি।

উদ্বোধকের বক্তব্যে ওয়াহিদ মালেক বলেন, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদকে নিয়ে আমরা গর্বিত। আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করি, কেননা তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি ছিলেন নিখাদ দেশপ্রেমিক, মানবিক ও উচ্চমাপের মানুষ। অসাধারণ এই মানুষটি খুব সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া ছিল অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমরা তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আমাদের লক্ষ্য অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের মতো মানুষের আদর্শ অনুসরণ করা। কারণ তাঁর বা তাঁদের মতো মানুষের জীবনী থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের সন্তানদের নিয়মানুবর্তিতা ও সময়ানুবর্তিতার চর্চা করতে হবে। আমি আজকে এই অনুষ্ঠানে এসে দেখলাম নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। এটা অনেক ভালো একটি দিক। কেননা আমরা যা-ই করবো আমাদের সন্তানরাও তা-ই করবে, তা-ই শিখবে। আমাদের কাছ থেকেই তারা এই শিক্ষাটুকু নেবে। অভিভাবক হিসেবে যদি আমি ভালো না হয়ে থাকি, আমি যদি অসৎভাবে চলি, আমাদের সন্তানরা কখনোই সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে না। এজন্য আমাদের অভিভাবকদের অনেক সচেতনভাবে চলতে হবে।

ওয়াহিদ মালেক বলেন, আমার দাদা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক দৈনিক আজাদী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের কথা বলার জন্য। চট্টগ্রামের মানুষের সুখ দু:খের কথা বলার জন্য। আমরা এখনো সেই পথেই আছি। দৈনিক আজাদীর বর্তমান সম্পাদক আমার বাবা এম এ মালেকের নেতৃত্বে আমরা সেই চট্টগ্রামের কথা বলার জন্যই আজাদীকে মুখপত্র হিসেবে ধরে রেখেছি। সে কারণেই হয়তো আমরা চট্টগ্রামের মানুষের মন জয় করে আছি। কয়েকদিন আগেও আমরা প্যারেড মাঠ নিয়ে একটা নিউজ করেছি- বাচ্চাদের মাঠে ঢুকতে কেন এত বাধা? মাঠ কর্তৃপক্ষের যুক্তি কিশোর গ্যাংরা আড্ডা মারে সেই অজুহাতে মাঠ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। কিশোর গ্যাংদের আটকাবে প্রশাসন, এটা পুলিশের কাজ। এ কারণে কি খেলার মাঠ বন্ধ রাখতে হবে? লোহার শিক টপকে বাচ্চারা মাঠে ঢুকছে, অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে তারা। একবার এক বাচ্চার পায়ে লোহার শিক ঢুকে গিয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এসে তাকে উদ্ধার করেন। তাই আমাদের এই উদ্যোগে যদি মাঠটা খুলে দেয়া যায় তাহলে এটাও হবে আজাদীর ধারাবাহিক সাফল্যের একটি।

আবৃত্তিশিল্পী আয়েশা হক শিমুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যক্ষ রীতা দত্ত, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের সন্তান সাপ্তাহিক স্লোগান সম্পাদক মোহাম্মদ জহির, মোহাম্মদ মুনীর ও মোহাম্মদ জোবায়ের, অধ্যাপক মৃণালিনী চক্রবর্তী, গল্পকার বিপুল বড়ুয়া, লেখক এস এস আবদুল আজিজ, অধ্যাপক কাঞ্চনা চক্রবর্তী, কবি শারুদ নিজাম, গল্পকার মিলন বনিক, অধ্যাপক গোফরান উদ্দীন টিটু, এস এম মোখলেসুর রহমান, অধ্যাপক বাসুদেব খাস্তগীর, প্রাবন্ধিক রেজাউল করিম স্বপন, সাংবাদিক গল্পকার ইফতেখার মারুফ, প্রাবন্ধিক ফেরদৌস আরা রীনু, অধ্যাপক সুপ্রতিম বড়ুয়া, কবি মাহবুবা চৌধুরী, গল্পকার রুনা তাসমিনা, কবি লিপি বড়ুয়া, শিশুসাহিত্যিক লিটন কুমার চৌধুরী, কবি সুমি দাশ, কবি বিবেকানন্দ বিশ্বাস, শিপ্রা দাশ, সাংবাদিক ইসমাইল জসীম, এম কামাল উদ্দিন, ফারহানা ইসলাম রুহী, আবিদা সুলতানা, খালেছা খানম, অপু চৌধুরী, সাংবাদিক আরিফ রায়হান, চট্টগ্রাম একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা কবি রাশেদ রউফ প্রমুখ।

আগামী ৬ জুলাই বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ জন্মশতবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের পুরস্কার ও সনদ দেওয়া হবে। অন্য সবাইকে অংশগ্রহণ সনদ ও পুরস্কার হিসেবে বই প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানে থাকবেন একুশে পদকপ্রাপ্ত ৫ ব্যক্তিত্ব : ড. অনুপম সেন, এম এ মালেক, ড. মাহবুবুল হক, অধ্যাপক আবুল মোমেন ও ড. বিকিরণ প্রসাদ বড়ুয়া।