অদ্বৈত মল্লবর্মণ: বিষাদসিন্ধুর এক মালোপুত্র

পুষ্পন চৌধুরী | সোমবার , ১২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অদ্বৈত মল্লবর্মণের (১৯১৪–১৯৫১) বিখ্যাত উপন্যাস। খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫–১৯৭৬) এই কালজয়ী উপন্যাস নিয়ে নির্মাণ করেন তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩)৷ উপন্যাসটি আমি বহুকাল আগে পড়লেও সিনেমাটি দেখলাম গতকাল সন্ধ্যায়।

সিনেমাটি দেখার সময় এই স্বল্পায়ু, ট্রাজিক কথাশিল্পীর বিষাদময় জীবন আমার মনের ভেতর গভীরভাবে রেখাপাত করছিলো এবং আমাকে ক্ষণে ক্ষণে বিষাদগ্রস্ত করে তুলছিলো। তাঁর যাপিত জীবনের ট্রাজেডি নিয়ে লিখবো ভেবেছিলাম অনেক আগেই। আজ তাঁর জীবনের সেই ট্রাজেডির কথা লিখতে গিয়ে নিজেকে আবারও বিষাদগ্রস্ত করে তুলছি। মনে হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীপাড়ের কৈবর্তদের জীবনের সামষ্টিক ট্রাজেডিকেও ছাড়িয়ে যায় একজন ব্যক্তি অদ্বৈত মল্লবর্মণের যাপিত জীবনের বিষাদ। মাত্র ৩৭ বছর বেঁচেছিলেন তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে তিন মাইল দূরে গোকর্ণঘাট গ্রামে ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। গোকর্ণঘাটের জেলেপল্লী; ভদ্রসমাজে (?) তাদের জায়গা নেই। চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বঞ্চনা আর হাহাকারই ছিলো এই প্রান্তিক মালো জনগোষ্ঠীর ভাগ্যলিপি। অদ্বৈত মল্লবর্মণের পিতা অধরচন্দ্র মল্লবর্মণও ছিলেন পেশায় জেলে। তিন ভাই ও এক বোনের সংসারে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর সে অর্থে কোনো উজ্জ্বল শৈশব ছিলো না। শৈশব উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই তাঁর পিতা–মাতার মৃত্যু হয় এবং কিছুকাল পর তাঁর দুই সহোদরও মারা যান! উপার্জনক্ষম পিতার মৃত্যুতে নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েন অদ্বৈত মল্লবর্মণ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাট গ্রামের তিতাস নদীপাড়ের হতদরিদ্র সন্তান অদ্বৈতের জীবনে ছিলো দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত, সামাজিক উপেক্ষা ও অবহেলা। এক কল্পনাহীন নির্মমতা ও দয়াশূন্য পরিপার্শ্বের ভেতর দারিদ্র্য আর অবজ্ঞাকে নিত্যসঙ্গী করে তিনি ভর্তি হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মাইনর স্কুলে। নিয়মিত আহার তাঁর জুটতো না; কখনো কখনো খালি পেটে তিন কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তিনি স্কুলে যেতেন। নিম্নবর্গের জেলেপুত্রের জন্য ক্লাসে আলাদা আসন বরাদ্দ থাকতো! এমন বৈষম্যের ভেতরেও অদ্বৈত মল্লবর্মণ একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে শ্রেণি–চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তী সময়ে গ্রামবাসীরা চাঁদা তুলে তাঁর শিক্ষাব্যয় নির্বাহ করেছিলো।

ক্লাসে বরাবর প্রথম হওয়া অদ্বৈত মল্লবর্মণ ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে অন্নদা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, স্কুলের সব শ্রেণির সব পরীক্ষায় তিনি বাংলা বিষয়ে সবসময় সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন।

তিতাস নদীপাড়ের মালোদের আর্থিক সাহায্যেই চলছিলো অদ্বৈত মল্লবর্মণের পড়াশোনা। মেট্রিকুলেশন পাস করে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আই.এ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু ট্রাজেডি তাঁর পিছু ছাড়েনি। আই.এ পড়াকালীন হঠাৎ তাঁর একমাত্র বিধবা বোন মারা যান। ফলে বোনের দুই ছেলেসন্তানকে নিয়ে তিনি ভীষণ বিপাকে পড়ে যান। উপায়ান্তর না দেখে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কোনো রকমে একটি চাকরির সন্ধানে দুই ভাগ্নেকে নিয়ে তিনি কলকাতা গমন করেন। মা–বাবা ও ভাইবোনদের হারিয়ে নিঃস্ব, রিক্ত, হতদরিদ্র একজন মানুষ কঠিন জীবনসংগ্রামে অবতীর্ণ হন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণের কর্মজীবনের সূচনা হয় মাসিক ‘ত্রিপুরা’ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে-’সন্তান’ প্রেসের মালিক জিতু দত্তের সহায়তায়। কিছুকাল পর তিনি যোগ দেন ‘নবশক্তি’ পত্রিকায়। প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন এই নবশক্তি পত্রিকার সম্পাদক। হঠাৎ করে ‘নবশক্তি’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের বদান্যতায় তিনি ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় সম্পাদকের সহকারী হিসেবে যোগ দেন। এর বছর তিনেক পর সাগরময় ঘোষের অনুরোধে অদ্বৈত মল্লবর্মণ ‘দেশ’ পত্রিকায় যোগ দেন। এছাড়া খণ্ডকালীন হিসেবে তিনি ‘নবযুগ’, ‘কৃষক’ ও ‘যুগান্তর’ রূপ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন বাম চিন্তাধারার মানুষ। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন ইংরেজবিরোধী গোপন রাজনৈতিক সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’র সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিলো। নিজের জীবন এবং তিতাস নদীপাড়ের মালোদের জীবনে দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত থেকে তিনি বুঝেছিলেন–অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া মানুষের জীবনের অন্য কোনো মুক্তি নেই। তাই তিনি একটি শ্রেণিভেদহীন সাম্যবাদী সমাজের আকাঙ্ক্ষা করতেন। তাঁর এই রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার কর্তৃপক্ষের সাথে তাঁর মতাদর্শিক বিরোধ হয়েছিলো। তবে সারাজীবন তিনি নিজের এই আদর্শের সাথে কোনো আপস করেননি। তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন; নিজের আর্থিক কষ্ট থাকা সত্ত্বেও দরিদ্রদের দু–চার পয়সা সাহায্য করার চেষ্টা করতেন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণ অকৃতদার ছিলেন। দারিদ্র্যের কারণে নিজের শরীরের বিশেষ যত্ন নিতে পারেননি। শরীরের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা আর অপুষ্টি থেকে তিনি দুরারোগ্য যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। ‘দেশ’ পত্রিকা এবং বন্ধুদের আর্থিক সহায়তায় কিছুকাল চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি আবারও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন। বন্ধুদের সহায়তায় তাঁর চিকিৎসা চলছিলো বটে, তবে একসময় হাসপাতাল তাঁর কাছে অসহ্য ঠেকলে তিনি পালিয়ে বাড়ি চলে আসেন। এরপর শত পীড়াপীড়িতেও তাঁকে আর হাসপাতালে নেওয়া যায়নি। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ এপ্রিল মাত্র সাইত্রিশ বছর বয়সে মারা যান অদ্বৈত মল্লবর্মণ।

তাঁর সাহিত্যকীর্তির মধ্যে রয়েছে তিনটি উপন্যাস-‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘রাঙামাটি’ এবং ‘শাদা হাওয়া’ (১৯৯৬)। অন্যান্য রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘এক পয়সায় একটি’ (গ্রন্থ), ‘সাগরতীর্থে’ এবং ‘ভারতের চিঠি–পার্ল বার্ককে’ (১৯৪৪)। এছাড়া তিনি চব্বিশটি প্রবন্ধ, চারটি ছোটগল্প, কিছু কবিতা এবং বেশ কিছু চিঠিপত্র লিখেছেন। ‘জীবন তৃষ্ণা’ নামে তিনি অনুবাদ করেছিলেন আর্ভিং স্টোনের (Irving Stone) বিখ্যাত উপন্যাস Lust for Life। অচিন্ত্য বিশ্বাস সম্পাদিত ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচনাসমগ্র’ (২০০০) গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (প্রথম প্রকাশকাল ১৯৫৬) অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রধান সাহিত্যকীর্তি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীপাড়ের মালোদের কঠিন জীবনসংগ্রাম, নির্মম দারিদ্র্য ও বঞ্চনার এক বিশিষ্ট জীবনভাষ্য ও উপাখ্যান এই উপন্যাস।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমাটি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবন নিয়েও নির্মিত হতে পারতো একটি ট্রাজিক চলচ্চিত্র। জীবন কারো কারো জন্য তার সবটুকু নির্মমতা নিয়েই হাজির হয়; অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন তেমনই একজন!

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ-এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধদুর্গোৎসবের রঙে চট্টগ্রামের পুরোনো পাড়া