প্রতিদিন কোথাও না কোথাও সড়কে ঘটছে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় মৃত্যু এখন প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম। টেলিভিশনের খবরে কিংবা পত্রিকার পাতায় সড়ক দুর্ঘটনার খবর দেখে বিষণ্ন হওয়া ছাড়া উপায় নেই। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, দেশে ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন সড়কে প্রাণ গেল ৩ জনের বেশি শিশু। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৯৫৮ শিশু নিহত হয়েছে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে। এ ছাড়া পথচারী হিসেবে ২ হাজার ৮১২ এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে ২ হাজার ১৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ ছিল পথচারী। পথচারী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২৭১ জন নিহত হয়েছে থ্রি–হুইলারের ধাক্কায়। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় প্রাণ গেছে ১ হাজার ১২৬ শিশুর। এ ছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশু নিহত হয়েছে। সড়কের ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৭১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে গ্রামীণ সড়কে, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ৮২, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশু নিহত হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেলে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সকালে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৬৮, দুপুরে ১ হাজার ৮১৩, রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশু। বয়সভিত্তিক হিসাবে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩ হাজার ৫৪৭ শিশু নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া–আসার পথে ২ হাজার ৫১৩ শিশু নিহত হয়েছে। আর বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় প্রাণ গেছে ৯৬২ শিশুর।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারে সচেতনতার অভাব, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেয়া, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো এবং দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের চিকিৎসাসংকট মৃত্যুর হার বাড়ার অন্যতম কারণ। সংস্থাটি শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা নিরাপদ করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানো, চিকিৎসার জন্য বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসাও সড়ক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জরুরি ফোনসেবা, অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নিকটবর্তী হাসপাতালে উপযুক্ত চিকিৎসা এসবের সমন্বয় আহত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে পারে। মহাসড়ক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ, হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তাঁরা বলেন, সড়ক নিরাপত্তার জন্য নিরাপদ রাস্তা ও সড়কপাশ, নিরাপদ গতি, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর উন্নত সেবা সব ক্ষেত্রেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ফুটপাত, নিরাপদ পারাপার, সাইকেল চলাচলের জায়গা, বাসস্টপ, সড়কবাতি ও স্পষ্ট নির্দেশক থাকতে হবে। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও আবাসিক এলাকায় গতি কমানোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। মহাসড়কে পথচারী ও ধীরগতির যানবাহনের নিরাপত্তার জন্য আলাদা অবকাঠামো দরকার। পুরোনো সড়কের নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা করে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলো সংশোধন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, সড়ক নিরাপত্তা রাষ্ট্রের একার দায়িত্ব নয়, আবার নাগরিকের ওপরই সব দায় চাপিয়েও রাষ্ট্র দায়িত্ব এড়াতে পারে না। পরিবহনমালিক, শ্রমিক সংগঠন, চালক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, চিকিৎসক, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। চালককে নিয়ম মানতে হবে, পরিবহন প্রতিষ্ঠানকে চালকের প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে, যাত্রীকে নিরাপত্তাবিধি মানতে হবে এবং পথচারীর জন্য নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপার নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সড়ক দুর্ঘটনা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।








