সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম ও দৈনন্দিন টুকিটাকি

সাখাওয়াত হোসেন মজনু

সোমবার , ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
53

: চট্টগ্রামের নারী শিক্ষা পত্তনের সময়ের কথা।
: চট্টগ্রাম পৌরসভার চেয়ারম্যান তখন আলকরণের নূর আহমদ। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘতম সময়ের অর্থাৎ ১৯২১ থেকে ১৯৫৪ (৩৩ বছর) এক নাগাড়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিলো বিএ (অনার্স) এম এ, বিএল। জীবনে তিনি কখনো দ্বিতীয় হননি। এন্ট্রান্স থেকে শুরু করে সব পরীক্ষায় প্রথম এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। তিনি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে এই শহর চট্টগ্রামে বালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেছিলেন। আবার ১৯২৭ থেকে বাধ্যতামূলক করেন বালিকাদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা। আজকের লেখার বিষয় কিন্তু বাধ্যতামূলক বালিকা শিক্ষা প্রসঙ্গে।
শহর চট্টগ্রামের অসচেতন মানুষরা কিন্তু উত্তাল হলেন। সবাই মিছিল করলেন, চেয়ারম্যান নূর আহমদকে দিলেন অভিশাপ, গালমন্দ দিতে থাকলেন তাঁকে। কারণ হলো তিনি মুসলমান মেয়েদের পর্দার বাইরে আনতে আদেশ দিলেন। শিক্ষার নামে মেয়েদের ঘর থেকে বেরিয়ে স্কুলে যেতে হবে। এই আদেশের বিরুদ্ধে রক্ষণশীল মুসলমান সমাজ প্রতি পাড়ায় মহল্লায় প্রতিরোধ শুরু করলেন। অল্প জ্ঞানের আলেমদের কেউ কেউ রক্ষণশীল অবুঝ মানুষগুলোকে সমর্থন দিলেন। তারাই নূর আহমদ চেয়ারম্যানকে ইসলামের শত্রু বা কাফের ঘোষণা দিলেন। সংকট দ্রুত বাড়তে লাগলো। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অটল রইলেন নূর আহমদ চেয়ারম্যান। নারী শিক্ষা বিস্তারের এই দুঃসময়ে চট্টগ্রামের কিছু মানুষ পৌরসভার সিদ্ধান্তের পক্ষে নূর আহমদ চেয়ারম্যানের পক্ষে অবস্থান নিলেন।
: তারা কারা? কেমন করে নারী শিক্ষার পক্ষে অবস্থান নিলেন?
: তখন চট্টগ্রাম কলেজের প্রথম মুসলমান অধ্যক্ষ ছিলেন শামসুল ওলামা কামাল উদ্দিন। তিনি শক্তকণ্ঠে নূর আহমদকে সমর্থন দিলেন। এই সময় ওই অবুঝ রক্ষণশীল মুসলমানগুলো প্রিন্সিপাল স্যারকেও কাফের ঘোষণা দিলেন। ফলে দু’জনকে দীর্ঘদিন জুমার নামাজ পড়তেও বাধা দিয়েছিলেন। এদের সমর্থনে পথে নেমে এলেন শামসুল ওলামা কামাল উদ্দিন সাহেবের স্ত্রী সৈয়দা আম্বিয়া খাতুন, মিউনিসিপ্যাল মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের হেড মাওলানা আবদুল হাই (বেপারিপাড়া), আসমা খাতুন (পোস্তারপাড়), ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক (দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা), ডা. এম এ হাসেম (এ বাংলার প্রথম মসলমান এমবি ডাক্তার) প্রতিজনই নিজের অবস্থান থেকে নারী শিক্ষার পক্ষে কাজ করেন। অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলমানদের চোখে জ্ঞানের আলো প্রদানের জন্য ওলামা কামাল উদ্দিন এবং মাওলানা আবদুল হাই বিভিন্ন এলাকায় মিলাদ মাহফিলে নানা ধরনের ওয়াজ করতেন। নারী শিক্ষা যে ইসলাম বিরোধী নয় একথাগুলো বলতেন। এদের ওয়াজ ছিলো আকর্ষণীয় এবং মানুষকে আকৃষ্ট করতো। এতে ফল হলো। ক্রমান্বয়ে মুসলমান সমাজ বুঝে নিলো ইসলাম নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে নয়। ঠিক এই সময় অর্থাৎ ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১১ জানুয়ারি কাট্টলী ইউনিয়ন ক্লাবের অনুষ্ঠানে আসেন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম। তখন কিন্তু ভারতের মুসলমান সমাজের রক্ষণশীল অংশ কাজী নজরুলকেও কাফের আখ্যায়িত করেছিলো। কাট্টলী ইউনিয়ন ক্লাবের সভাপতি মাওলানা তমিজুর রহমান কবির উদ্দেশ্যে একটি মানপত্র পাঠ করেন এবং সেই মানপত্রে একটি শব্দ ছিলো ‘তোহফা দিলাম চরণতলে’-এই শব্দ শুনে নজরুল লাফ দিয়ে চলে আসেন মাইকের সামনে এবং বাংলায় মিলাদপড়া শুরু করেন। তখন কাট্টলীবাসীর পক্ষে মাওলানা তমিজুর রহমান বলেন, কে বলে নজরুল তুমি কাফের? তুমি প্রকৃত মুসলমান। চট্টগ্রামবাসী তোমাকে প্রকত মুসলমানের স্বীকৃতি দিচ্ছে। সেই অনুষ্ঠানে উল্ল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সেদিন থেকেই প্রফেসর শামসুল ওলামা কামালউদ্দিন ও নূর আহমদ চেয়ারম্যানকে আর কেউ কাফের বলতেন না। উল্ল্লেখ করা প্রয়োজন যে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। সেখান থেকেই তিনি কাট্টলী ইউনিয়ন ক্লাবের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন। এখানে আরো বলা প্রয়োজন যে কে ছিলেন সৈয়দা আম্বিয়া খাতুন?
: সৈয়দা আম্বিয়া খাতুন ছিলেন প্রফেসর শামসুল ওলামা কামাল উদ্দিন স্যারের স্ত্রী। তিনি চট্টগ্রামের নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য ওই সময় চন্দনপুরায় একটি বালিকা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বেশ ক’বছর স্কুলটি পরিচালনা করেছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো কষ্ট ও মর্যাদাহানীর। অনেক অত্যাচার, নির্যাতন ও কটূকথার শিকার হয়েছিলেন তিনি। ছাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও চলছিলো তীব্র অর্থ সংকট। তিনি স্কুল চালিয়ে যেতে পারছিলেন না। পরে গুল-এ-জার বেগম নারী শিক্ষার এই ধারাকে বজায় রাখার জন্য স্কুলের পুরো দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে স্কুলটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন গ্রহণ করেছে। স্কুলটির নাম গুল-এ-জার বেগম সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। শুধু তাই নয় স্কুলটিকে গুল-এ-জার বেগম পরিবার রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও এনে দিয়েছিলেন।
চট্টগ্রামের নারী শিক্ষার জন্য আসমা খাতুনও ছিলেন সংগ্রামী শিক্ষা জননী। তিনি সাহস করে তাঁর এলাকা পোস্তার পাড়ে প্রতিষ্ঠা করেন বালিকা বিদ্যালয়। শুধু তাই নয়, তিনি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের পড়ালেখার জন্য উৎসাহী করতেন। ইসলামে নারীর মর্যাদা দিয়েছেন এবং শিক্ষিতা নারীর কদরের কথা বোঝাতেন। এমনও কিছু কাজ করতেন যা ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি তাঁর বাড়িতে মসজিদের ঈমাম, মুয়াজ্জিনদের নিয়ে বৈঠক করতেন। তাদের বুঝাতেন তারা যেন প্রতি শুক্রবার মসজিদে খুতবার সময় নারী শিক্ষার কথাগুলো গুরুত্বের সাথে বলেন। মক্তবে তখন ছাত্রীরা আসতো না। শুধুমাত্র ছেলেরাই মক্তবে হুজুরদের নিকট আরবি পড়তেন। শিশুদের মনের মধ্যে নারী শিক্ষার গুরুত্ব ঢুকিয়ে দেয়ার জন্য তিনি নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় শিশুদের পড়াতেন। নিজের বাড়ির মেয়েদের তিনি আরবি বাংলা, ইংরেজি পড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। চট্টগ্রামে নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য এই মহিয়সী নিজ এলাকায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন। পরে প্রতিষ্ঠা করেন পোস্তারপাড় আসমা খাতুন বালিকা বিদ্যালয়। বর্তমানে স্কুলটি পরিচালিত হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায়। স্কুলটির বর্তমানে নাম পোস্তারপাড় আসমাখাতুন সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। শেষ করবো এইভাবে, চট্টগ্রাম যখন কাজী নজরুল ইসলামকে প্রকৃত মুসলমান হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন, রক্ষণশীল মুসলমান সমাজ যখন বুঝলেন পৌর চেয়ারম্যান নূর আহমদ নারীদের শিক্ষার মাধ্যমে ইসলামে নারীর মর্যাদা প্রদান করতে চাচ্ছেন তখনই নারী শিক্ষায় গতি এসেছে। এজন্য উল্ল্লেখিত মানুষদের অবদান ছিলো স্মরণ করার মতো।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

x