যমজ সন্তান

শামীম হাসান

শনিবার , ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
201

যমজ সন্তান হলে পরিবারে আনন্দের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। প্রথমদিকে দুটি বাচ্চার একসাথে দেখভাল করতে গিয়ে বাবা-মায়েরা হিমশিম খেয়ে যান। কিন্তু প্রথম কয়েকমাস বেশ কষ্ট করতে হলেও একই সঙ্গে দুটো বাচ্চা বেড়ে উঠার প্রাপ্তি ও আনন্দটুকু অস্বীকার করা যায় না। সিনেমার প্রভাবে অনেকেই ভাবেন যে যমজের একজনের সকল আচরণ একই সময় অন্যজনও করে থাকবে, একজন ব্যথা পেলে অন্যজনও কেঁদে উঠবে। আদতে তা কিন্তু সঠিক নয়।

কেন যমজ বাচ্চা হয়
যমজ শিশু জন্মের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। প্রকৃতির নিজ খেয়ালে এই যমজ শিশুর জন্ম হয়ে থাকে। সাধারণত প্রতিটি গর্ভধারনের সময় মায়ের একটিমাত্র জননকোষ তথা ডিম্বাণু নিঃসৃত হয়। যদিও শুক্রাণুর সংখ্যা থাকে অযুত-নিযুত, কিন্তু প্রতিটি গর্ভধারণে কেবল একটি মাত্র শুক্রাণু ঐ ডিম্বাণুর সাথে নিষিক্ত হয়ে ভ্রুণ বা ‘জাইগোট’ সৃষ্টি করে। কিন্তু কখনো কখনো একাধিক ডিম্বাণু যদি একই সময় নিঃসৃত হয় এবং প্রতিটি ডিম্বাণু আলাদা আলাদা শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয় তবে তখন একাধিক বাচ্চার জন্ম লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়। যেহেতু আলাদা আলাদা ডিম্বাণু থেকে এই একাধিক বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে তাই এইভাবে জন্মকে ‘পলি-ওভুলার’ অথবা ‘ডাই-জাইগোটিক’ বলা হয়। ‘পলি’ শব্দটির অর্থ হলো ‘বেশি বা একাধিক’, আর ‘ওভূলার’ কথার অর্থ হলো ‘ডিম্বাণু’, যা একসাথে প্রকাশ করলে অর্থ দাঁড়ায়-একাধিক ডিম্বাণু নিষিক্তের ফলে জন্ম নেয়া শিশু। একইভাবে ‘ডাই’ কথার অর্থ হলো ‘দুই’ আর ‘জাইগোটিক’ মানে ভ্রুণ সম্বন্ধীয়-অর্থ হলো দুটি আলাদা ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেয়া ভ্রুণ। এক্ষেত্রে যমজেরা আলাদা বৈশিষ্টের অধিকারী হয়ে থাকবে, তাদের চেহারায় হুবহু মিল থাকার সম্ভাবনা থাকে না, চেহারার পাশাপাশি এদের আচরণগত অমিল থাকে, এমনকি রক্তের গ্রুপও আলাদা হয়ে থাকে, তারা ভিন্ন লিঙ্গেরও হতে পারে। একটি ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনের ফলে তৈরি হওয়া ভ্রুণ পরবর্তী ধাপে দেহকোষে রূপান্তরিত হয়ে থাকে ও ধীরে ধীরে একজন মানুষের আকৃিত লাভ করে। কিন্তু কখনো ভ্রুণ তৈরির পর এমনও হয় যে স্বাভাবিক নিয়মে ভ্রুণ থেকে দেহকোষ তৈরি না হয়ে একটি ভ্রুণ থেকে প্রথম বিভাজনে হুবহু আর একটি ভ্রুণ তৈরি হয়ে যায়। পরে এই দুটি ভ্রুণ প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ভাবে দেহকোষ তৈরির মাধ্যমে দুটি আলাদা শিশু সৃষ্টি করে। একই ডিম্বাণু থেকে সৃষ্ট হওয়া এই ধরনের যমজকে তাই ‘মনো-ওভুলার’ অথবা ‘মনো-জাইগোটিক’ যমজ বলা হয়। এক্ষেত্রে যমজেরা একই বৈশিষ্টের অধিকারী হয়ে থাকবে, তাদের চেহারায় হুবহু মিল থাকবে, চেহারার পাশাপাশি এদের আচরণগত মিল থাকে, এমনকি এদের রক্তের গ্রুপও এক হয়ে থাকে, এরা একই লিঙ্গের অর্থাৎ উভয় শিশু ছেলে বা উভয় শিশু মেয়ে হতে পারে।
সাধারণত দীর্ঘদিন বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা গ্রহণকারী মায়েদের বেলায় অধিক সংখ্যক ডিম্বাণু একই সময় নিঃসরন ও নিষিক্তের সম্ভাবনা থাকে, তাই তাঁদের যমজ সন্তান হয়ে থাকে। তাছাড়া টেস্ট টিউব বা ‘ইনভিট্রো-ফার্টিলাইজেশন’ এর মাধ্যমে জন্ম নেয়া শিশুর ক্ষেত্রেও যমজ বা একাধিক সন্তান জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যদি দুটি বাচ্চা একসাথে জন্ম নেয় তবে তাদের ইংরেজীতে ‘টুইন’ আর তিনটি বাচ্চা জন্ম নিলে তাকে ‘ট্রিপলেট’ বলে থাকে। এভাবে আরো বেশি সংখ্যক জন্ম নেয়া শিশুর অনুরুপ আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। যমজ সন্তান জন্মের সময় একটি শিশুর শরীর অন্য শিশুর শরীরের সাথে জোড়া লেগে থাকলে তাকে ‘কনজয়েন্ট টুইন’ বলে থাকে।

যমজ বাচ্চার যত্ন
গর্ভকালীন সময়ে উভয় যমজ সন্তানের দৈহিক বৃদ্ধি সমানভাবে হয় না। একটি স্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলেও অন্য শিশুটি আকার আয়তনে ছোট থেকে যায়। কখনো কখনো দুটি শিশুর ওজনই কম হয়ে থাকে। যদি একাধিক সন্তান একই সময় ধারণ করা হয় তবে সকল ভ্রুণের বৃদ্ধি স্বভাবতই অনেক কম হবে। জন্মকালীন ন্যূনতম স্বাভাবিক ওজন হলো ২.৫ কেজি বা ২৫০০ গ্রাম। যদি যমজদের একটি স্বাভাবিক ওজনের ও অন্যটি কম ওজনের হয় বা উভয় শিশু কম ওজনের হয় তখনই সমস্যাগুলো দেখা দেয়। একক বা ‘সিঙ্গেল’ প্র্যাগন্যান্সিতে জন্ম নেয়া একটি কম ওজনের শিশুর চাইতেও এই কম ওজনের যমজ শিশুটির সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় শিশুটির জন্ম কিছুটা বিলম্বিত হওয়ার কারণে দ্বিতীয় শিশুটি কাঁদতে দেরী করতে পারে। সে ক্ষেত্রে জন্মকালীন প্রথম একমিনিটে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। এতে বাচ্চার মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। কম ওজনের শিশু নানা সমস্যায় ভুগতে পারে, তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অনেক কম থাকে, তাই তারা ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে যেতে পারে।
একটি বাচ্চার যত্ন নেয়া অনেক কঠিন একটি কাজ। সেক্ষেত্রে যমজ সন্তানের যত্ন নেয়া স্বভাবতই আরো বেশি কঠিন। তাই যমজ সন্তানের বেলায় মাকে আরো বেশি মাত্রায় সক্রিয় ও সচেতন থাকতে হবে। একজন মা তাঁর সন্তানকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়াবেন। সেক্ষত্রে দুধ খাওয়াতে মা নিজে উদ্বুদ্ধ না হলে একজন শিশুকেই তিনি দুধ দানে ব্যর্থ হতে পারেন। তাই অনেক বেশি সংবেদনশীল ও অনুপ্রাণিত হলেই একজন মা অনায়াসে দুটি সন্তানকে দুধ খাওয়াতে পারবেন। মায়ের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, পেটের পীড়া ও বুকের সংক্রমন থেকে শিশুকে রক্ষা করে। পশুর দুধ খাওয়া শিশুর চাইতে বুকের দুধ খাওয়া শিশুর ‘আইকিউ’ নয় শতাংশ বেশি থাকে। শুধুমাত্র মা যদি মনে করেন যে দুটি বাচ্চার জন্য তাঁর পক্ষে বুকের দুধ খাওয়ানো সম্ভব নয়, কেবল তখনই বুকের দুধ কমে যেতে পারে। এটি একটি মনোজাগতিক সমস্যা। মানসিকভাবে দৃঢ় মায়ের পক্ষে দুটো সন্তানকেই বুকের দুধ খাওয়ানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে একবারে একটি সন্তানকে একপাশের স্তন থেকে খাইয়ে পরে অন্য পাশের স্তন থেকে অন্য শিশুকে খাওয়াতে হবে। এছাড়া সঠিক নিয়মে ‘ধরা ও বুকে লাগানো’ সহ আরো নানা পদ্ধতিতে যমজ সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো যায়। এজন্য মা’কে প্রতিবার দুধ খাওয়ানোর সময় প্রায় এক ঘন্টা সময় ব্যয় করতে হবে। এভাবে তিনি দিনের অনেকটুকু সময় ব্যয় করবেন বলে তাঁর সাংসারিক অন্যান্য কাজের জন্য সহায়তাকারী প্রয়োজন। তাঁর জন্য পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংক্রমন প্রতিরোধে শিশুকে কোলে নেয়ার আগে হাত ধুয়ে নিতে হবে। অন্যান্য নবজাতকের মতো তার ঘরের তাপমাত্রাও ২৬-২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড রাখতে হবে। তার থাকার জায়গা, পোশাক পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। যে কোন শিশু তার জন্মের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাবে। এ ক্ষেত্রে ছয় মাসের পর যেহেতু অন্যান্য পারিবারিক খাবার শিশুকে দেয়া যাবে, তাই তখন মায়ের কষ্ট আরো বাড়বে। উভয় শিশুকে সামলাতে তিনি হিমশিম খেয়ে যাবেন। ছয় মাস বয়সে যমজদের মধ্যে বড় ছোটর সমস্যা আর থাকে না। অর্থাৎ দু জনের ওজন প্রায় এক হয়ে যায়।

যমজ সন্তানের অসুবিধা
জরায়ুতে অল্প পরিসরে থাকে বলে কিছু ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিতে পারে। এরা ওজনে ছোট হয় বলে ইনফেকশনের আশঙ্কা বেশি থাকে। ‘সিঙ্গেল-বর্ণ’ শিশুর চেয়ে এদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি থাকে।

যমজ সন্তানের সুবিধা
যমজ সন্তান কেউ চাইলেই ইচ্ছে মাফিক জন্ম নেবে না। যদি কারো যমজ সন্তান জন্ম নেয় তবে তাদের বেলায় এক ঝামেলায় দুটো বাচ্চা বড় হয়ে যাবার মোক্ষম সুযোগ তৈরি হয়। একসাথে বড় করতে গিয়ে মায়ের হয়তো দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়, একই সাথে কান্নাকাটি করলে, একই সাথে খাবারের প্রয়োজন হলে, একই সাথে প্রস্রাব-পায়খানা করলে সামলে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যে কোন শিশু তার পারিপার্শিক পরিবেশে অন্য একটি শিশুকে পেলে তার মানসিক স্বাস্থ্য আরো বিকশিত হয়। তাই যমজদের বেলায় জন্ম থেকেই সঙ্গী পাওয়ার কারণে আচরণগত বিকাশ সুন্দর হয়, তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি হয়। এরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল হয়। যদি কখনো অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটি শিশুর ত্বক পুড়ে যায় তবে অন্য শিশু থেকে ‘স্কিন গ্রাফটিং’ করা যাবে, কিডনী প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হলেও তা অনায়াসে করা যাবে।

লেখক : চিকিৎসক; প্রফেসর, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

x