প্রবাহ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুধবার , ১২ জুন, ২০১৯ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
21

একালে সৌদির হজ্ব নিয়ন্ত্রণ

সাম্প্রতিককালে সৌদি সরকার হজ্ব ব্যবস্থাপনাকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে নেয়। যা ৫/৭ বছর আগেও ছিল না। হজ্বের মাসখানেক আগে পবিত্র মক্কা মোকাররমার চারদিকে রাস্তাসমূহে চেক পোস্ট বসাবে। যাতে যে কেউ মক্কা শরীফে প্রবেশ করতে না পারে। এমনকি মক্কা শরীফে কর্মরত বিদেশিরা এ সময়ের মধ্যে জেদ্দা বা অন্যত্র গেলে ফিরে আসতে কড়া চেকের মধ্যে পড়তে হবে।
বর্তমানকালে সৌদি কড়াকড়ির মধ্যে আরও রয়েছে প্রবাসী হউক বা সৌদি নাগরিক হউক সৌদি নির্ধারিত মোয়াল্লেমের মাধ্যমে হজ্ব করতে হবে। সে লক্ষে নিয়ম নীতি মেনে যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে। মক্কা মোকাররমা থেকে ৫ কি.মি দূরত্বে মিনা,মাত্র ১৬ কি.মি দূরত্বে আরাফাত। পবিত্র মক্কার প্রবাসীরাত নয়ই সৌদি নাগরিকেরাও স্বইচ্ছায় এহরাম পরিধান করে মিনা আরাফাত যেতে পারবে না ।
হজ্বের কদিন আগে থেকে মোবাইলে এসএমএস এর মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে নিয়ম নীতি না মেনে কেউ যেন হজ্ব করতে না যায়।
মৌলিকভাবে হজ্ব ৬ দিনব্যাপী ৮-১৩ যিলহজ্ব। এতে হজ্বযাত্রীগণের কল্যাণে সৌদি সরকারকে বাস, তাঁবুসহ নানান সেবা মূলক দায়িত্ব পালন করতে হয়।
২০০০ খ্রিস্টাব্দের পর পর সৌদি সরকারের আগ্রহে ও,আই,সি এর মাধ্যমে দেশওয়ারী হজ্বযাত্রী সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। এতে বিশ্বের যে কোন দেশ থেকে হজ্ব করতে পারবেন মুসলিম জনসংখ্যা অনুসারে হাজারে একজন। সে মতে ১ নাম্বার রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, তাদের সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজারের উর্ধ্বে, ২ নং এ রয়েছে পাকিস্তান ১ লাখ ৭৯ হাজারের উর্ধ্বে, ৩ নং ভারত ১ লাখ ৭৫ হাজারের উর্ধ্বে, ৪ নং বাংলাদেশ ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন।
এতে বিশ্বে সংখ্যা বিবেচনায় গত বছর হজ্বযাত্রীর সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ৭১ হাজার ৬ শত ৭৫ জন। তৎমধ্যে স্থানীয় ৬ লাখ ১২ হাজার। বিদেশ থেকে আগত ১৭ লাখ ৫৮ হাজার। তৎমধ্যে ইয়ামেন, ওমান, মিশর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, বাহরাইন ইত্যাদি সৌদি আরবের নিকটস্থ দেশসমূহ হতে সড়কপথে হজ্ব করতে আসেন ৮৫ হাজার ৬ শত ২৩ জন। মিশর, সুদান, ইথিওপিয়া, সুমালিয়া দেশসমূহ হতে সাগর পথে হজ্ব করতে আসেন ১৬ হাজার ১ শত ৬৩ জন। বাকী ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯ শত ৩৬ জন আকাশপথে হজ্ব করতে আসেন। সর্বমোট সংখ্যার মধ্যে পুরুষ ১৩ লাখের অধিক মহিলা ১০ লাখের অধিক।
একদিকে ও,আই,সি এর মাধ্যমে হাজারে ১ জন কোটা নির্ধারণ,সৌদি স্থানীয়দের কঠোর নিয়ন্ত্রণে এই ২৩ লাখ ৭১ হাজারে নেমে আসে। নিয়ন্ত্রণের আগে অঘোষিতভাবে হজ্বযাত্রীর সংখ্যা ৪০ লাখ বা তার কম বেশি হত। অর্থাৎ সমগ্র সৌদি আরব থেকে প্রবাসী ও সৌদি লক্ষ লক্ষ নর-নারী নিজ উদ্যোগে হজ্ব করতে চলে আসতেন।
সৌদি আরবের অভ্যন্তরে এবং বিশ্বে আকাশ যোগাযোগ ধারণাতীতভাবে উন্নতি লাভ করায় হজ্বযাত্রীর সংখা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ। না হয় প্রায় ১৩৫০ বছর যাবৎ ইসলামের ইতিহাসে হজ্বযাত্রীর সংখ্যা অনেকটা বিদায় হজ্বের সংখ্যার সমান বা কাছাকাছি ছিল। নবী পাক (স.) নব্যুওয়াতের সময়ে একবার হজ্ব করেছিলেন। ১০ম হিজরিতে এ হজ্বকে বিদায় হজ্ব বলা হয়। আন্দাজ মতে সোয়া লক্ষ মহান সাহাবা নর-নারীগণ নবী পাকের নেতৃত্বে হজ্ব করার সৌভাগ্য লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৃদ্ধি পায়নি। বরং নানা যুদ্ধ বিগ্রহ প্রতিকূলতায় হজ্বযাত্রী কম হত। সাগর পথে পাল তোলা জাহাজে যাতায়াত নিরাপদ ছিল না। অপরদিকে স্থল পথে হজ্ব করতে আসার অন্যতম এরিয়া হল মুলকে শাম। যা আজকের জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন, মিশর ও ইরাকের অংশ বিশেষ। মদিনা মুনাওয়ারা থেকে মূলকে শামের নিকটতম জংশন হল দামেস্ক। এ দামেস্ক থেকে মদিনা মুনাওয়ারা আসতে ৪০ দিন মত সময় নিত। ফলে স্থলে এবং সাগরপথে যোগাযোগ প্রতিকূলতায় হজ্বযাত্রী তেমন বৃদ্ধি পায় নি।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আমলে মুম্বাই হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পাল তোলা জাহাজে সার্ভিস ছিল আদন,ইয়ালামলাম এবং জেদ্দার সাথে। পাল তোলা ছোট ছোট জাহাজে করে অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হজ্ব করতে যেত। পরবর্তীতে ব্রিটিশদের সাথে দেন দরবারে করাচি ও কলকাতা থেকে হজ্বযাত্রী পরিবহনের কথা জানা যায়।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পর আমাদের এ অঞ্চল থেকে সাগরপথে হজ্ব করতে যেত ৬ থেকে ৭ হাজার জন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারতের মুহাম্মদী জাহাজে নিয়ে এক বছরই মাত্র হজ্বযাত্রী পরিবহন হয়। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলাদেশর মাত্র ৩ হাজার জন হজ্বযাত্রী লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। পরববর্তীতে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে হিজবুল বাহারে (পরবর্তীতে নাম শহীদ সালাহ উদ্দিন) কয়েক বছর হজ্বযাত্রী হজ্বে যেতে পেরেছিলেন। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ঢাকায় সৌদি দূতাবাস চালু হওয়ায় ট্রাভেল এজেন্সীগুলোর সহযোগিতা নিয়ে সৌদি দূতাবাস থেকে সহজে ভিসা প্রাপ্ত হওয়ায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাশাপাশি স্ব উদ্যোগে হজ্ব করার প্রবণতা শুরু হয়। এতে হজ্বযাত্রীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে পোর্ট হজ্ব অফিসের নাম পরিবর্তন করে ‘হজ্ব অফিস’ নামকরণ করা হয়। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে হজ্ব অফিস চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ঢাকায় স্থায়ী হাজী ক্যাম্প না থাকায় ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকায় মিরপুর এবং নবাব কাটরায় ভাড়া করা বাড়িতে হজ্ব অফিস অবস্থিত ছিল। ঢাকা ও ঢাকার বাহিরে অস্থায়ী হাজী ক্যাম্প করে তখন হজ্বযাত্রীদের পাঠানো হত। এরপর ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার আশকোনায় ৫ একর জমিতে স্থায়ী হজ্ব ক্যাম্প তৈরি করা হয়। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে সেই হজ্ব ক্যাম্প থেকে হজ্ব কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
২০ বছরে বাংলাদেশের হজ্বযাত্রী
সাল মোট হজ্বযাত্রী
২০০১ ৪৩,৩৫৮
২০০২ ৩৮,৮৭২
২০০৩ ৪১,০২০
২০০৪ ৩৯,৬৪২
২০০৫ ৪৪,১২৫
২০০৬(১৪২৬ হিজরি) ৫২,৪৯৭
২০০৬(১৪২৭ হিজরি) ৪৭,৯৮৩
২০০৭ ৪৫,৮০১
২০০৮ ৪৮,৭৬৩
২০০৯ ৫৮,৬৭৮
২০১০ ৯১,৩৮৪
২০১১ ১,০৭,৩৭২
২০১২ ১,১২,৬৮০
২০১৩ ৮৯,১৯০
২০১৪ ১,০১,৭৫৮
২০১৫ ১,০৬,২৩৮
২০১৬ ১,০১,৭৫৮
২০১৭ ১,২৭,১৯৮
২০১৮ ১,২৭,১৯৮
২০১৯ ১,২৭,১৯৮

আগেই উল্লেখ করেছি, অঘোষিতভাবে ৪০ লাখ বা তার অধিক মানুষ হজ্ব করতে থাকায় সৌদি সরকারের টনক নড়ে। যেহেতু তারা যথাযথ সেবা দিতে পারতেছে না। শৃঙ্খলা রক্ষা করা তাদের জন্য কষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে ও, আই, সি এর সহযোগিতায় বিশ্বে যে কোন দেশ থেকে মুসলিম সংখ্যা অনুপাতে হাজারে একজন হজ্বে আসতে পারবে। যদিওবা ক বছর আগে মসজিদুল হারম পুনঃ নির্মাণ করতে গিয়ে এ সংখ্যার ২০% কেটে রাখা হয়েছিল। মাত্র ১০/১২ বছরের ব্যবধানে সৌদি সরকার স্থানীয়দেরকেও হজ্ব করতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। আরবীয় ধনীগণকে হজ্ব করতে মোয়াল্লেমের মাধ্যমে আসতে হচ্ছে। তাদেরকে আরামদায়ক অবস্থান দিতে মিনায় বড় বড় এরিয়া ছেড়ে দিতে হওয়ায় ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশসহ বিশ্বের গরীব দেশের হাজীগণকে মিনার স্থলে মুজদ্দালেফায় ও মিনার পাহাড়ের পূ্‌র্ব দিকে অবস্থান নিতে হচ্ছে। এদের সংখ্যা কয়েক লাখ বা আরও বেশি। যা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়, বরং অমানবিক। অপরদিকে, দেশওয়ারী যেহেতু কোটা নির্ধারিত আছে,কোটার সংখ্যা ঠিক থাকলে হজ্ব করতে গেলে কে কয় বার হজ্ব করল,তা সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পর পর হজ্ব করলে সৌদি সরকার জন প্রতি ২ হাজার রিয়াল নিচ্ছে, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ টাকা ফেরত দেয়া উচিত হবে।
সৌদি সরকার শত ভাগ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরেও ২৪ লাখ হজ্বযাত্রী এখনও হজ্ব করতেছেন । ফলে আজও হজ্ব করা কষ্টসাধ্য। তার উপর আবহাওয়া গরম। সৌদি সরকার শত চেষ্টা করলেও প্রায় ২৪ লাখ হজ্বযাত্রীকে সুন্দর সুষ্ঠভাবে সেবা দেয়া সহজ নয়। ফলে হজ্বযাত্রীগণকে হজ্বে গেলে সাহস, ধৈর্য্য, পরিকল্পনা মাথায় রেখে এগুতে হবে। লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলাম লেখক

x