দূরের দুরবিনে

অজয় দাশগুপ্ত

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
19

শপথ ও আন্দোলন এখন মুখোশ মাত্র

ডাকসু এখন দেশ ও দেশের বাইরের মূল আলোচিত ঘটনা। কে জিতলো কে হারলো বড় কথা না। বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ভোটাভুটির বিষয়টি। যারা বললো নির্বাচন সঠিক হয়নি তাদের ভিপি জিতেছে। এখন এই যুবক সরে দাঁড়াবে? মনে তো হয় না। ইতোমধ্যে পরাজিত ছাত্রলীগ প্রার্থী শোভনের সাথে তার কোলাকুলির ছবি ছাপা হয়ে গেছে। একসময় বুদবুদ শানত্ম হয়ে সব আবার আগের মত হয়ে যাবে। কারণ এটাই জাতীয় রাজনীতি। চলুন দেখি জাতীয় রাজনীতির নেতা ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি আমাদের কি শিখিয়েছেন? কি শিখিয়েছেন আমাদের তারুণ্যকে?
রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নাই। সুলতান মনসুর শপথ নিলেন শেষ পর্যনত্ম। নেবেন কি নেবেন না এই নাটক চললো বেশ কিছুদিন। এখন বোঝা গেলো নাটকের ওপর ও নাটক আছে। তিনি শপথ নিলেও মোকাব্বির নেন নি। ধানের শীষ শপথ নিয়েছে। উদীয়মান সূর্য নেয়নি। অথচ মিডিয়ায় দেখলাম তিনি ই সরব। যখন থেকে শপথ নেয়ার খবর দেখছি তখন থেকে মনসুর ছিলেন লাপাত্তা। তাঁকে নাকি পাওয়া যায় নি। মোবাইল বন্ধ ছিলো। অন্যদিকে মোকাব্বির ছিলেন প্রগলভ। তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম কয়েকবার উলেস্নখ করে মুখখানা এমন করেছিলেন মনে হচ্ছিল শপথ না নিলে তিনি জানে বাঁচবেন না। বললাম না শেষ কথা বলে কিছু নাই। সে তিনি ই শপথ নিলেন না। তাঁর প্রত্যেকটি কথায় মনে হচ্ছিল তিনি শপথ নেয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। অন্যদিকে মনসুর কে পাওয়া না গেলেও তিনি ঠিক ই শপথ নিলেন।
দেশের রাজনীতিতে বিরোধী দল নাই বললেই চলে। শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা আর ভালোবাসার কারণে মানুষ মুখ খোলেনা। শুধু তা নয় রাজনীতি এখন তার জৌলুসও হারিয়েছে। তার প্রতি মানুষের রাগ বিরাগ বা অনুরাগ শূন্য এক বাস্তাবতা বিরাজ করছে দেশে। এটা ভালো কি মন্দ কে জানে? সময় বলে দেবে এর ভবিষ্যত কি? তবে এটা নিশ্চিত উন্নয়ন আর অগ্রগতির চাপে রাজনীতিতে বিরোধী বলে আর কিছু নাই। যা আছে তার নাম হয় উগ্রতা। নয়তো স্তাবকতা। এই পরিবেশ সুখকর নয়। কিন্তু পরিত্রাণ কোথায়? কারা দেবে ভরসা? কোথায় সেই শক্তি?
সুলতান মনসুর আওয়ামী লীগের মানুষ বলে পরিচিত। শপথ নেবার পর তিনি জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলতে ভোলেন নি। মানলাম এটা তাঁর উদারতা। অথবা বিশ্বাস। কিন্তু এই মানুষ কি করে ধানের শীষ মার্কা নিয়ে ভোট যুদ্ধে নামলেন? ধরুন যদি এমন হতো নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট জিতে যেতো, সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতো সুলতান মনসুর কি এ ভাষায় কথা বলতেন? যদি আওয়ামী লীগ হেরে যেতো ঐক্যফ্রন্টের মাথা বিএনপি আসতো দেশ শাসনে তবে কি তিনি শপথ নিয়ে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলতেন? আর যদি বলতেন ও বা তাঁর কি ধড়ে মাথা থাকতো আদৌ? বিলেতে কাটা মুন্ডু পাঠিয়ে উলস্নাস করতো ধানের শীষের ক্যাডারেরা। মনসুর সাহেব তা জানেন।
তাই একটা বিষয় পরিষ্কার মূলত ঝোপ বুঝে কোপ মারার নাম ই এখন রাজনীতি। জাতীয় সংসদে সাংসদ হতে পারাটা সুযোগ না যোগ্যতা সে প্রশ্ন এখন অবানত্মর। সবাই জানেন কে কিভাবে জেতে। ভোট কতটা কাজ করে আর কতটা কিভাবে কি হয় সে তর্কে যাবোনা। তারচেয়ে বড় এবারের একতরফা ফলাফলের পর ও সুলতান মনসুর জিতেছেন। যেভাবেই হোক বিপরীত স্রোতে জয়ী হয়ে আসা সহজ ব্যাপার না। এখন তাঁর জয়ের বিষয়টাও নিন্দুকের কথাকেই সত্য বলে প্রমাণ করবে। মনে হবে তিনি কোন সন্ধিতে জিতে ফিরেছেন। যা আরো প্রগাঢ় হয়েছে তাঁর কথায়। তিনি স্পষ্ট বলেছেন তাঁর নেতাও শপথ গ্রহণের বিষয়টা জানেন। তার মানে ড: কামাল হোসেনের অনুমতিতে শপথ নিয়েছেন তিনি। ঐক্য ফ্রন্ট যে একটি লেজে গোবরে সংগঠন সেটা শুরু থেকেই বোঝা গেছিল। তাদের ঐক্য বা একত্রিত হবার পেছনে ছিলো শেখ হাসিনা বিরোধিতা। হয়তো দেশে বিদেশে কিছু মানুষ আর সংগঠন তাদের আশ্বাস দিয়েছিল এবার তারা দৃশ্যপট বদলে দিতে পারবেন। সেটা না হলে কি হতে পারে তা আমরা আগেই মালুম করেছিলাম। আসেত্ম আসেত্ম ডিগবাজী বা পাল্টি খাবেন অনেকে। বিএনপির শক্তি কতটা সেটা এখন সবাই বুঝে গেছে। তারা তাদের মূল নেতা কয়েকবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে পারা দূরের কথা তাঁর মুক্তি নিয়ে কোন আন্দোলনও করতে পারেনি। এমন কি ভালো করে মিছিল মিটিং ও করতে পারেনি। তাদের ওপর ভরসা রেখে সুলতান মনসুর কি করবেন?
এদিকে গণফোরাম লিখিতভাবে সুলতান মনসুরকে বহিস্কার করেছে। এতে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কতটা লোকসান হবে জানিনা। তবে হবে যে না তা নিশ্চিত। কারণ বিগত এক দশকে গণফোরামের কি কাজ কোথায় তার অবস্থান বোঝা দায় । আগেও লিখেছি এটা নতুন কিছু না। গণফোরাম ড: কামাল হোসেনের দল যার কথা ও কাজে মিল কম। তিনি এখন বয়স্ক মানুষ। তাঁর কথা প্রায় ই নড়চড় করে। তা ছাড়া এখন সাথে জুটেছে কাদের সিদ্দিকী মান্না ও আ স ম রবের মানুষজন। এতে তাঁর কোন লাভ হয়নি। এবার সুলতান মনসুরকে বের করে দেয়ার ভেতর আর একটা ভুল করলেন তারা। কারণ না থাকলো সংসদে কোন প্রতিনিধি না কোন কথা বলার মানুষ। ফলাফল না মানার যে রাজনীতি তা এখন গতায়ু। কেউ এসব নিয়ে কেয়ার করেনা। সুলতান মনসুর সংসদে না আসলেও দেশ চলতো। এসে যদি দু চারটা কথা বলেন বা বলতে পারেন সেটাই লাভ। বিএনপির সর্বনাশা রাজনীতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আরো একবার ভুল করলো গণফোরাম। যার ঢাল তলোয়ার নাই তার আস্ফালনে সরকারের কোন লোকসান হবে এটা ভাবা ভুল।
আমার মনে হচ্ছে শপথ নিয়ে সুলতান মনসুর ঠিক কাজ করেছেন। কারণ এখন যেভাবে চলছে তাতে বাকীরা শপথ না নিলে সে আসনগুলো শূন্য হবে। আর উপনির্বাচনের নামে জিতে আসবে নতুন কিছু মুখ। না হবে কোন আন্দোলন না কোন প্রতিবাদ। কারন রাজনীতি বলতে আসলে কিছু নাই । যা আছে তার নাম উন্নয়ন আর শেখ হাসিনার অগ্রযাত্রা। এর ভালো মন্দ বিবেচনার সময় এখন নাই দেশের মানুষের কাছে। তারা এগুতে চাইছে। দুনিয়ার সাথে তাল মিলাতে ব্যস্তা বাংলাদেশ। তাই একটা কথা বলতে পারি, সুলতান মনসুর তো সুলতান ই। ফিরে এসেছেন রাজদরবারে। আর মোকাব্বের খান ফিরে গেলেন খানদের শিবিরে। এই মূল্যায়ন মনে হয় সময়ের চাহিদা।
যা ঘটুক আর যে ভাবেই ঘটুক। যে দল বা জোটের ভাগ্য বিদেশে এক যুবকের হাতে তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল বলার কারণ দেখিনা। তার চেয়ে ভালো হতো ভেতরে থাকে সরকারের কর্মকান্ড আর সমালোচনার ভেতর দিয়ে কিছুটা হলেও দায়িত্ব পালন। বিশেষত সবাই যখন জানেন নির্বাচনের ফলাফল কি হতে যাচ্ছে। সেটা মাথায় রেখে ভোট করলেন আর ভোটের পর ভাবছেন সবকিছু একশ আশি ডিগ্রি এঙ্গেলে উল্টে যাবে এটা কেমন ভাবনা? শপথ এমন একটা বিষয় যা মূলত মানুষ করে তা ভাঙার জন্য। রাজনৈতিক শপথ ও তার বাইরে কিছু না।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

- Advertistment -