দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ২১ আগস্ট, ২০১৯ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ
32

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বিচে বহু লোক জলকেলি করছে। করছে ছোটাছুটি। শেরাটনের তের তলার বারান্দা থেকে চোখের সামনে ঘোমটা মেলে ধরা ভূমধ্যসাগরের বেলাভূমি দেখছিলাম। দেখছিলাম বিচ জুড়ে মানুষের আনাগোনা। এই সাত সকালে এত মানুষ বিচে ভিড় করছে! সাগরপাড়ে ঘোরাঘুরির মজাটা আলাদা। সমুদ্র সৈকতে বিনোদনে আসা প্রতিটি মানুষই সকাল সন্ধ্যা বিচে কাটাতে পছন্দ করেন। আমিও করি। এত এত বিচ দেখি। এত এত সাগর দেখি। কিন্তু তবুও যেন আকর্ষণ কমে না। যত দেখি ততই দেখতে ইচ্ছে করে!
বিচ জুড়ে ছোটাছুটি করা মানুষগুলোর মধ্যে আমাদের দলের কেউ আছেন কিনা বুঝতে পারছিলাম না। আমার ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে ভিড়ে মিশে যেতে। স্বচ্ছ নীল জলরাশি সাগরের। অপূর্ব মায়া ছড়াচ্ছিল। তের তলার উপর থেকে কলকল করা সাগরকে বড়ই ভালো লাগছিল। ইচ্ছে করছিল গা ভাসাতে। আমার রুম মেট লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে কথাটি বলতে উনি কোন আগ্রহ দেখালেন না। বললেন, ‘আপনি যান। আমি থাকি। কিন্তু নাস্তা করে তো লবিতে থাকতে বলেছে। কোন এক পার্কে নিয়ে যাবে।’ কথাটি মনে পড়লো। এই ধরনের বড় গ্রুপে বিদেশে আসলে নিজের ইচ্ছেমতো কিছুই করা যায় না। গ্রুপের সাথে থাকতে হয়। গ্রুপের সাথেই পথ চলতে হয়। অন্যথায় গ্রুপের সবাইকে কষ্টে ফেলে দেয়া হয়। তাই আর সাগরে ভাসতে গেলাম না। জাহেদ ভাইকে নিয়ে নাস্তা করতে রেস্টুরেন্টে ছুটলাম।
হোটেল শেরাটনের ব্যুফে। মিশরের বন্দরনগরী আলেঙান্দ্রিয়ার হোটেল শেরাটন। আভিজাত্যের পাশাপাশি আয়োজনে নতুনত্বও আছে। আমরা ছোট একটি টেবিল দখল করে বসলাম। ব্যুফে নাস্তা। অসংখ্য আইটেম। মিশরীয় খাবার দাবারের পাশাপাশি পাশ্চত্য খাবারেরও জয় জয়কার। আমরা ডিম, পাউরুটি, বন, বাটারসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার খেলাম। জুস নিয়েছিলাম শুরুতে। শেষ করলাম কফি দিয়ে।
লবিতে জড়ো হচ্ছিলাম আমরা। একে একে সবাই। সাবেক গভর্ণর লায়ন মোস্তাক হোসাইন এবং ভাবী বসে আছেন সবার আগ থেকে। লায়ন প্রদীপ দা এসেছেন পুরো পরিবার নিয়ে। প্রদীপ দার ছেলেটা ইতোমধ্যে আমাদের সকলেরই মন জয় করেছেন। দাদার মেয়েও। বৌদি তো বরাবরের মতোই জয়প্রিয়তার তুঙ্গে। আমার বন্ধুর বড় ভাই হলেও এই সফরে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছি লায়ন কামরুজ্জামান লিটনের সঙ্গে। লায়ন মুসা বাবলুও বেশ তক্কে তক্কে সময় পার করছেন। শপিং এর জন্য মাতোয়ারা হলেও বেড়ানোতেও কম যান না। আমাদের দলের সকলের মাথা গুণে নিলেন অথেনটিক ট্যুরিজমের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন ভাই। মিশরীয় গাইড মোহাম্মদ আবদুল্লাহর তৎপরতা সবার থেকে বেশি। সবাইকে সামনে নিয়ে আবদুল্লাহ ছোটখাটো একটি বক্তব্য দিলেন। তিনি অতি সহজ ইংরেজিতে যা বুঝালেন তার অর্থ হলো তিনি এখন আমাদেরকে মুন্তাজা গার্ডেনে নিয়ে যাবেন। কেউ কেউ এটাকে মুন্তজা পার্ক নামেও ডাকেন। আলেঙান্দ্রিয়ার সবচেয়ে সুন্দর পার্ক। ভূমধ্যসাগরের একেবারে পাড়ে এই পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে বহু বছর আগে। আবদুল্লাহ বলেন যে, আলেঙান্দ্রিয়ায় এসেছেন অথচ এই পার্কে যাননি এমন একজন পর্যটকও পাওয়া যাবে না। আরো ভালোভাবে বললে এটুকু বলা যায় যে, অনেকে আলেঙান্দ্রিয়া ভ্রমণ শুরু করেন এই পার্ক দিয়ে। বর্তমানে পার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও একসময় এটিতে বাদশা বসবাস করতেন।
প্রাথমিক ধারণা নিয়ে আমরা বাসে চড়লাম। হোটেলের কাছেই মুন্তাজা পার্কের অবস্থান। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম। টিকেট কাটাকুটির ব্যাপার স্যাপার আগেই আবদুল্লাহ সামলে রেখেছেন। ওসব নিয়ে আমাদের কোন ভাবনা নেই। আমাদেরকে বাস থেকে নামিয়ে দেয়া হলো। প্রথম দর্শনে ভালো লাগার মতো একটি জায়গা। অগুণতি গাছ গাছালী। সারি সারি। সুউচ্চ বহু গাছ। ঝাউ গাছও অনেক। আছে বহু খেঁজুর গাছও। গাছগুলো এত সুন্দর এবং নান্দনিকভাবে লাগানো হয়েছে যে, পুরো এলাকাটি একটি ভিন্নমাত্রার সৌন্দর্য পেয়েছে। বাগানের ভিতরে আঁকা বাঁকা রাস্তা। রাস্তার পাশেই আবার ছোট ছোট ফুলগাছের মন ভরিয়ে দেয়ার মতো বাগান। বাগানের ভিতরে বাগান। বাগানের ভিতরেই খোলা চত্বর। মাঠ। পুরো মাঠে সবুজ ঘাষ। ঘাষে পানি ছিটানোর ব্যবস্থাও আধুনিক। সবুজে সবুজে একাকার পুরো এলাকা। বিশাল বিস্তৃত এলাকা জুড়ে কেবলই সবুজ। অপরূপ। মুন্তাজা গার্ডেন বা পার্ক যা বলা হোক না কেন তা যে প্রথম দেখায় মানুষকে মুগ্ধ করে তাতে কোন সন্দেহ থাকলো না। এত সুন্দর একটি ছায়া ঘেরা বাগান। তীব্র গরমের মাঝে যেন একরাশ স্নিগ্ধতা বিলুচ্ছিল মুন্তাজা। গাছে গাছে পাখীর কলকাকলী। অযুত নিযুত পাখী ডানা ঝাপ্টিয়ে করছিল উড়াউড়ি। সাথে কিচির মিচির।
মিশরে অনেকগুলো পার্ক আছে। তবে মুন্তাজা মিশরের বিখ্যাত পার্কগুলোর একটি। এটিকে বাদ দিয়ে মিশরের পার্কের তালিকা করা যাবে না। আলেঙান্দ্রিয়ায় এটি সবচেয়ে বড় ও সুন্দর পার্ক। ৩৭০ একর এলাকাজুড়ে বাগান আর বাগান। আমাদেরকে পার্কের ভিতরে এনে বাস থেকে নামানো হয়েছে। এরপর থেকে হাঁটছিলাম। গাছ গাছালীর নিচ দিয়ে রাস্তা। গাড়ি চলাচলের চমৎকার রাস্তা হলেও দলে দলে পর্যটক হাঁটছিলেন। হাঁটছিলাম আমরাও। অবশ্য কেউ কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বাগানের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাস্তার পাশে পাশে সিমেন্ট দিয়ে বিশেষ ধরনের টব বানানো হয়েছে। তাতে আবার বিশেষ কায়দায় লাগিয়ে দেয়া হয়েছে ফুল গাছ। ওই গাছেও ফুল ফুটে ঝুলছে। কত যত্নে যে এমন একটি বাগান গড়ে তোলা কিংবা ধরে রাখা যায় তা ভাবতেই মাথা চক্কর দিচ্ছিল।
বাগানের মাঝখানেই একটি তিন তলা ভবন। রাজপ্রাসাদ। চমৎকার নির্মাণ শৈলী। এটিতে নাকি বাদশাহ থাকতেন। তিন তলা উঁচু হলেও শতবর্ষী ভবনটির উচ্চতা যেন কিছুটা বেশি। পাশে একটি টাওয়ার। মসজিদের মিনারের মতো। আমরা হাঁটছিলাম। হঠাৎই আমার বুকের ভিতরে গিয়ে যেন ধাক্কা দিল। চোখের দৃষ্টি থমকে গেল। সাগর!!! ভূমধ্যসাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে মুন্তাজায়। পাথর দিয়ে ঢেউ ঠেকানো হয়েছে। অনেক পাথর। তবে এক একটি ঢেউ ভয়ানক আক্রোশে তেড়ে তেড়ে আসছিল। এই ভয়ানক আক্রোশেও যে কী এক নান্দনিকতা তৈরি হয়েছে তা চোখে না দেখলে লিখে বুঝানো কঠিন। মুন্তাজা পার্কে ভূমধ্যসাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আমি বাদশাহর সৌখিন জীবনযাত্রার কিছু কিছু অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম। তীব্র গরমের মাঝে সাগর পাড়ের মন ভোলানো হাওয়ায় বাদশাহ যে হেরেমবাসীনীদের নিয়ে অন্যরকমের সুখে থাকতেন তা বুঝতে পারছিলাম।
আলেঙান্দ্রিয়া শহরের পূর্বপ্রান্তে মুন্তাজা পার্ক অবস্থিত। এরপর দিগন্ত বিস্তৃত ভূমধ্যসাগর। ৩৭০ একরের বিস্তৃত বাগানের বিভিন্ন অংশে ভূমধ্যসাগরের বিচে নেমে সাঁতার কাটার ব্যবস্থা রয়েছে। পাঁচটি বিচ আছে বলে জানতে পারলাম। বিচগুলোর আবার আলাদা আলাদা নামও রয়েছে। আয়েদাহ, কিউপেট্রা, সিরামিস, ফিনিশিয়া ইত্যাদি। মুন্তাজা রাজপ্রাসাদের দিকে দুটি বিচ রয়েছে।
মিশরের পূর্ববর্তী রাজবংশ উলুবি পরিবারের মালিকানায় ছিলো এ বাগানটি। একশ’ বছরেরও বেশি আগে সুলতান খাদিভির (যাকে দ্বিতীয় আব্বাস হিলমি বলা হত) নির্দেশে বাগানটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় রাজপ্রাসাদসহ সবকিছু। পার্কটির ভেতরে অনেকগুলো পর্যটনস্থল রয়েছে। রয়েছে খাবার হোটেল, ভ্রমণকেন্দ্র, খেলার মাঠ আর কাঠের তৈরি কুটির। এখানে রয়েছে ক্বসরে মালিক ফারুক বা বাদশাহ ফারুকের রাজ প্রাসাদ। ইংরেজী ‘এফ’ অক্ষরের আদল দেয়া হয়েছে ভবনটিতে। যাতে ফারুকের নাম বুঝানো হয়েছে। হিরমুলুক ও সালামুলুক নামে রাজপ্রাসাদটির পাশে আরো দুটি প্রাসাদ রয়েছে। যেগুলোর নির্মাণশৈলী অতি বিরল প্রকৃতির। হিরমুলুকে থাকতেন প্রাসাদের নারী আর তাদের সেবিকারা। আর সালামুলুকে থাকতেন রাজ্যের বিশেষ বিশেষ পুরুষেরা। প্রাসাদের ভিতরে রোমান সাম্রাজ্যের সময় তৈরি ঘড়িসহ বেশ মূল্যবান নানা জিনিস এখনো রয়েছে। পার্কটির ভিতরে বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম সেরা পর্যটন হোটেল ‘হিলনান ফিলিস্তিন’ রয়েছে। পাঁচ তারকা মানের এই হোটেলটির সামনে ভূমধ্যসাগর আছড়ে আছড়ে পড়ে। রয়েছে চমৎকার বিচও। সাগর শাসন করে হোটেলের সামনে এমনতর একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যাতে শুধু মনই ভরে না, চোখও কপালে উঠে। ১৯৬৪ সালে হোটেলটি নির্মাণ করা হয়।
পার্কের একেবারে শেষ প্রান্তে সাগরের বুক ছিঁড়ে যেন কয়েকটি স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এরমধ্যে নাকি রয়েছে একটি পাতাল কারাগার। রাজ দরবারে দন্ডিতদের এনে কী এখানে বেঁধে রাখা হতো। পাতাল কারাগারই বা কেমন ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তবে স্থাপনাগুলোর উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল এমন কারাগারে এনে বেঁধে রাখলেও বুঝি সুখ। রাতে দিনে সাগরের কুলকুল ধ্বনি শুনে শুনে সময় যে কোনদিক দিয়ে পার হয়ে যাবে টের পাবো না। সাগরের কত রূপ যে এই কারাগার থেকে দেখা যাবে তাও মনে মনে ভাবছিলাম। অবশ্য কারাগারের বন্দিদের সাগর দেখার সুযোগ থাকতো কিনা তা জানা যায়নি। পার্কে রয়েছে জলপ্রপাত। বিভিন্ন খাবারে সুসজ্জিত ক্যাফেটেরিয়াও রয়েছে। অবশ্য এতে এক একটি খাবারের অনেক দাম। কফির দাম বাইরের ক্যাফের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। আমরা হাঁটছিলাম। শুধু পৃথিবীর সেরা একটি বাগানই নয়, আমি যেন রাজা বাদশাহদেরও খুব কাছ থেকে দেখছিলাম। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

x