দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৫:২৮ পূর্বাহ্ণ
31

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ঘোর লাগা চোখে সাহারা মরুভূমিতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। বিস্ময়ে বিস্ময়ে বিভোর হয়ে উঠছিলাম। কত বিস্ময় ছড়িয়ে রয়েছে জগতজুড়ে! চোখের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পিরামিড তিনটির ব্যাপারে কোন কুলকিনারা করতে পারলাম না। কি করে এত বড় বড় পিরামিড আজ থেকে অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে নির্মিত হলো সেই রহস্য আমার মগজ থেকে বের করতে পারছিলাম না। খোলা চোখে যা দেখছিলাম তাতে এত বড় বড় পাথর খণ্ড এত উঁচুতে তুলে এত মসৃণভাবে স্থাপন করা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভব একটি কাজ। কি করে সেই অসম্ভব কাজটিকে সম্ভব করেছিলেন তারা! কত লোক নিয়োজিত হয়েছিল এক একটি পিরামিড নির্মাণে। চারশ’ বছর আগেকার তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা ভোঁ ভোঁ করে। তাহলে পাঁচ হাজার বছর আগেকার পিরামিডের সামনে যদি মাথা উড়ে যেতে চায় তাহলে কী দোষ দেয়া চলে!
আমাদের চোখের সামনে বিশ্বসুন্দরী তরুণী ছবি তুলেই যাচ্ছিলেন। কত ভঙ্গিমা যে তিনি করছিলেন! পিরামিড নিয়ে নানা ভঙ্গি! কোন দেশের তরুণী বোঝার উপায় নেই। তবে আক্ষরিক অর্থেই সুন্দরী। ধবধবে সাদা পোশাকে দারুণ মানিয়েছে। বুকের উপর দিয়ে ঝুলিয়ে দেয়া স্যাশেও বেশ মানিয়ে গেছে। আমরাও ঘুরে ঘুরে অনেক ছবি তুললাম। অনেকক্ষণ ধরে। মিশরের এই পিরামিড দর্শনে জীবদ্দশায় আর আসা হবে কিনা কে জানে! তবে শেষবার মনে করে মন ভরে সব দেখে নিচ্ছিলাম।
আমাদেরকে বাসে উঠার জন্য তাগাদা দেয়া হলো। মরুর বুকে তপ্ত রোদে বেশিক্ষণ থাকলে অসুখে পড়তে পারি বলেও সতর্ক করা হলো। আমাদের মিশরীয় গাইড আবদুল্লাহ এবং সাথে যাওয়া অথেনটিক ট্যুরিজমের কর্মকর্তা ইয়াসিন দুজনেই তাগাদা দিচ্ছিলেন। আমরা বাসে চড়ে বসলাম। কেউ কেউ উটের পিটে তখনো সাহারা মরুভূমিতে চক্কর মারছিলেন। তপ্ত রোদ থেকে গাড়ির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবহে ঢোকার সাথে সাথে কেমন যেন শান্তির আবহ খেলে গেল। যথারীতি আমি লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে বসলাম। পিরামিড বিষয়ক নানা ভাবনায় আমরা দুজনই আচ্ছন্ন।
একে একে সবাইকে ডেকে আনা হলো। বাসও যাত্রা করলো। পিরামিড দেখা সম্পন্ন হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে গাইড আবদুল্লাহ বললেন, ‘এখন আমরা চলে যাবো। যাওয়ার পথে স্ফিংক্স দেখে যাবো।’ আমি চমকিত হলাম। স্ফিংক্সের নাম আগেও শুনেছি। পৃথিবীর সেরা একটি স্থাপত্য। একসময় পিরামিডের মতো এই স্ফিংক্সেও সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য হিসেবে দেখতেন মানুষ। স্ফিংক্সকে কেউ কেউ স্ফিংসও বলে থাকেন। ইংরেজিতে বানানটি ঝঢ়যরহী। পিরামিডের কাছেই এই স্ফিংক্স। মিশরের গিজার পিরামিডের কাছের এই স্ফিংক্সকে গ্রেট স্ফিংক্স নামেও ডাকা হয়। এই স্ফিংক্স নিয়ে আমার কৌতূহলের অন্ত ছিল না। তবে এই স্ফিংক্স যে পিরামিডের এতো কাছে তা আমার জানা ছিল না। পিরামিড থেকে বের হওয়ার অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা স্ফিংক্সের কাছে পৌঁছলাম। মিনিট দুই তিনেকের মধ্যে। গাইড বললেন,‘ নামার দরকার নেই। গাড়ি থেকে দেখে নিন। বাইরে খুব গরম।’ আরে বলে কি! গাড়িতে বসে স্ফিংক্স দেখে যাবো! মাথা খারাপ নাকি! ব্যাটারা সব সময় দেখতে দেখতে দেখার গুরুত্বই হারিয়ে ফেলেছে। এই স্ফিংক্স কি পিরামিডের চেয়ে কম! আমি প্রতিবাদ করলাম। গাড়ি থামান। নামবো। সাথে সাথে বিভিন্ন ক্লাবের লায়ন সদস্যরাও প্রতিবাদ করলেন। আমাদের দলপতি পিডিজি লায়ন মোস্তাক হোসাইনও গাড়ি থামাতে বললেন। আমরা নেমে পড়লাম। ড্রাইভার বললেন, একটু সামনে গিয়ে তিনি দাঁড়াবেন। বেশিক্ষণ থামতে পারবেন না। এখানে পার্কিং নিষিদ্ধ। আমরা গাড়ি থেকে নেমে চালককে সামনে চলে যেতে বললাম।
স্ফিংক্সের সামনে দাঁড়িয়ে আমি হা হয়ে গেলাম। এটিই স্ফিংক্স? প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে নির্মিত একটি মূর্তি! কি নামে ডাকা যায় একে? মূর্তি? ভাস্কর্য? স্থাপনা? নানাজন নানাভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নানাভাবে নাম দিয়েছেন। কেউ কেউতো পিরামিডও বলেছেন।
আসলে স্ফিংক্স কি? ইন্টারনেট দুনিয়ায় স্ফিংক্সের যাবতীয় তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায়। আছে নানা বর্ণনাও। তবে একটি বিষয়ের কোন সুরাহা হয়নি যে, আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে এই মূর্তি কে বানিয়েছিলেন। কিভাবে বানিয়েছিলেন? কি করে সম্ভব হয়েছিল? সত্যি সত্যি কি কোন মানুষ এই স্ফিংক্স বানিয়েছিলেন?
অনেক আশ্চর্য হওয়ার কথা এতক্ষণ শোনালাম। কিন্তু কেন আশ্চর্য হচ্ছি এবার তার কিছু তথ্য উপাত্ত শুনে নিন। যে কোন মানুষের চোখ কপালে উঠার জন্য এই স্ফিংক্সের এসব তথ্য উপাত্তই যথেষ্ট।
পুরো পৃথিবী জুড়ে প্রাচীন যুগের বহু কীর্তি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ভুবনজোড়া পরিচিতি রয়েছে এমন কয়েকটির মধ্যে গ্রেট স্ফিংক্স একটি। নীল নদের পশ্চিম তীরে মরুর বুকে খাফ্রার পিরামিডের কাছে পূর্ব দিকে মুখ করে গ্রেট স্ফিংক্স তৈরি করা হয়েছে। আসলে গ্রেট স্ফিংক্স সিংহের শরীরে মানুষের মাথা সংবলিত বিশাল এক ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যে আস্ত একটা বড় পাথরকে সিংহের শরীরের অবয়ব দেয়া হয়েছে, আর তার ওপর খোদাই করা হয়েছে মানুষের মাথা। পুরো কাজটি করা হয়েছে একটি মাত্র চুনাপাথর কেটে কুটে। একখণ্ড চুনা পাথর! এত বড়!! এত মসৃণ করে কাটাকুটি! সিংহের আদল! মানুষের মুখের আদল! মানুষের মাথা! অবিশ্বাস্য এক আয়োজন।
অবিশ্বাস্য ভাবার আরো যেসব কারণ রয়েছে তার মধ্যে কিছু কিছু জানতে পেরেছি। তথ্য উপাত্ত যতই জেনেছি ততই সংশয় বেড়েছে। বেড়েছে বিস্ময়। এই গ্রেট স্ফিংক্স পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মনোলিথিক ভাস্কর্য। এর আগের আর কোন মনুমেন্টাল ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়নি। এটির দৈর্ঘ্য ৭৩.৫ মিটার বা ২৪১.১৪ ফুট, প্রস্থ ৬ মিটার বা প্রায় ২০ ফুট এবং উচ্চতায় ২০.২২ মিটার বা ৬৬.৩৪ ফুট। এই তথ্যগুলো লিখে দিলাম। আপনারাও পড়ে ফেললেন। কিন্তু ২৪১ ফুটেরও বেশি লম্বা, ২০ ফুট প্রস্থ এবং প্রায় ৬৭ ফুট পুরু একটি পাথরখণ্ডের ওজন চিন্তা করেছেন। কয়েক হাজার টন ওজন হবে পাথরটির! এই পাথরটি কে টেনে আনলেন? কোত্থেকে আনলেন? পাথরটি যদি এখানেই থাকতো তাহলে ধারে কাছে আরো অনেক পাথর থাকতো। কিন্তু মরুভূমিতে আর তো কোন পাথর নেই। শুধুমাত্র এই স্ফিংক্সের পাথরটিই রয়েছে। তাহলে পাথরটিকে অন্য কোথাও থেকে আনা হয়েছে। কিন্তু কিভাবে? কারা এনেছিলেন??
এবার দেখুন অন্য তথ্য। স্ফিংক্সের পায়ের থাবাগুলো প্রতিটি ১৫ মিটার বা প্রায় ৫০ ফুট লম্বা। মাথার দৈর্ঘ্য ১০ মিটার বা প্রায় ৩৩ ফুট আর ৪ মিটার বা ১৩ ফুট প্রস্থ। স্ফিংক্সের ১ মিটার বা সোয়া তিন পুট লম্বা নাকটি আজ আর নেই। কথিত আছে ১৭৯৮ সালে মিসর জয় করার পর ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের সৈন্যরা মিশর আক্রমণ করার সময় গ্রেট স্ফিংসকে নিশানা বানিয়ে কামানের গোলা ছুঁড়েছিল। তাতেই স্ফিংক্সের নাকটি গেছে। একই সাথে গেছে দাঁড়িও। আবার অনেকে মিসরীয় শাসক মামলুকদের দোষ দেন স্ফিংক্সের নাকের জন্য। তবে আল মাক্রিজি বা আল রশীদের মতো আরব্য ঐতিহাসিকরা মনে করেন, মোহাম্মদ সাইম আল দ্বাহর নামের এক গোড়া মুসলমান স্ফিংক্সের নাক ধ্বংস করেন। কারণ ওই অঞ্চলের লোকেরাভালো ফসলের আশায় স্ফিংক্সকে নানা বস্ত মানত হিসেবে উপঢৌকন দিত। মোহাম্মদ সাইম এসব বন্ধ করতেই মূর্তিটির নাক ভেঙ্গে দেন। অবশ্য মূর্তিটির বিকৃতি ঘটানোর অপরাধে ক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকেরা মোহাম্মদ সাইমকে পরবর্তীতে হত্যা করেছিল। এগুলোর কোনটিই সঠিক ইতিহাস নয়। সবগুলো নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
ফারাও এর প্রতিমূর্তিস্বরূপ গ্রেট স্ফিংক্সের দাড়ি ছিল; কিন্তু বহুদিন আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেসব। একটি লেজও আছে এই স্ফিংক্সের, গুটানো অবস্থায়। তবে এটি নির্মাণের কারণ, এর চেহারা কার প্রতিমূর্তি, কখন এবং কারা এটি নির্মাণ করেন এসব নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
কেউ কেউ বলেছেন, পৃথিবীতে একটি পাথর কেটে যত ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে তার মধ্যে স্ফিংস বৃহত্তম। এটির নির্মাণকাজ ১০ হাজার বছর আগে হয়েছিল বলেও কেউ কেউ মতামত ব্যক্ত করেছেন।
১৯২৫ সালের আগ পর্যন্ত স্ফিংক্সের গোটা দেহটি দেখতে কেমন তা কেউ জানত না। মুখমণ্ডল ছাড়া বিশাল শরীরের পুরোটাই সাহারার বালুতে ডুবে গিয়েছিল। ১৯২৫ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত এমিল বারেজ নামক এক ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ চালিয়ে স্ফিংক্সকে বালুর অভিশাপ থেকে মুক্ত করেন। অবশ্য বহু ঐতিহাসিকের মতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ফারাও থুতেমাস ও ফারাও রামসেস স্ফিংস সংস্কার করেছিলেন।
মিসরের প্রতিটিই ভাস্কর্যে নানা ধরনের কারুকাজ ও লিপি খোদাই করা অবস্থায় রয়েছে। শুধুমাত্র এই স্ফিংসে কোন ধরনের কারুকাজ বা লিপি খোদাই করা নেই। এতে করে এই বিশাল মূর্তিটি কে বা কারা বানিয়েছিলেন তা আজ পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত হতে পারেননি।
স্ফিংক্স বলতে বিশ্বব্যাপী মিসরের এই ভাস্কর্যকে বুঝলেও আসলে
স্ফিংক্স একটি পৌরাণিক গ্রিক দানবের নাম। কল্পকাহিনীর ওই দানবের মাথা ছিল মানুষের, দেহ সিংহের এবং ঈগলের মতো দুটি পাখা ছিল। মিসরীয় স্ফিংসের অবশ্য কোনো পাখা নেই। মিসরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট আরও অনেক স্ফিংস আছে। সব স্ফিংসেরই গ্রেট স্ফিংসের মতো সিংহের শরীরে পুরুষ মানুষের মাথা বসানো।
প্রাচীন কালে বিশ্বাস করা হতো যে, স্ফিংস হচ্ছে গিজের রক্ষাকর্তা। এটি গিজের পিরামিড, মন্দির ও অন্যান্য স্থাপনা রক্ষা করবে। স্ফিংস কতটুকু রক্ষা করেছে বা করবে সেটি বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে বিগত কয়েক হাজার বছর ধরে এটি মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো একটি স্থাপনা হিসেবে মরুর বুকে টিকে আছে।
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

x