দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ৩১ অক্টোবর, ২০১৮ at ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ
63

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
চারদিকে বরফ আর বরফ। রাস্তায় বরফ। মাঠে বরফ। গাছে বরফ। বাড়ির ছাদে বরফ। আকাশ ফুটো হয়ে যেন বরফ ঝরছে। স্নো ফল। বরফে বরফে ঢেকে আছে সবকিছু। চারদিকে এত এত্ত বরফের মাঝে নিজেরা অনেকটা শিশু হয়ে উঠছিলাম। কোপেনহেগেন থেকে ফিরে নরওয়ের রাজধানী অসলোর জাহাজ ঘাটে বরফ রাজ্যের বাসিন্দা হয়ে গেলাম। আমাদের লোকাল গার্ডিয়ান আনোয়ার ভাই গিয়েছেন গাড়ি আনতে। আমার এডিটর স্যারকে (দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম, এ মালেক) প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে বসিয়ে আমরা তিন বন্ধু বাইরের বরফ রাজ্যে ক্যাঙ্গারুর মতো হুড়োহুড়ি করছিলাম। শুরুতে আমি এবং মনজু ভাই নামলেও পরবর্তীতে এসে সামিল হয় টিপু ভাই। আমেরিকার ফ্লোরিডায় বসবাসকারী টিপু ভাই জীবনে বহু বরফ দেখলেও তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে জীবনে প্রথম বরফ দেখলো। টিপু ভাই মুঠোয় মুঠোয় বরফকুচি কুড়িয়ে আমাদের দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে। তিন বুড়োর বরফকেলি দেখার মতো একটি ব্যাপার হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমাদের এসব দেখার মতো কাউকে কোথাও দেখা গেল না। জাহাজ ঘাটের প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের ভিতরে বহু মানুষ থাকলেও বাইরে কেউ নেই। পুরো জনপদই খাঁ খাঁ করছে। জাহাজ ঘাটার মতো একটি জায়গায় কোন মানুষ থাকবে না এটি যেন অবিশ্বাস্য। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। অথচ তিন সত্যি হচ্ছে যত দূর চোখ যাচ্ছিল সবই বরফ আর বরফ। কোথাও কোন মানুষ বা গাড়ি দেখা যাচ্ছিল না। ঘোড়া দেখারতো প্রশ্নই উঠে না। বরফে ঢেকে থাকা রাস্তা-ঘাট থেকে শুরু করে বাড়ির ছাদ পর্যন্ত সর্বত্র সাদা হয়ে আছে। তৈরি হয়েছে অন্যরকমের এক মোহনীয় দৃশ্য। হঠাৎ মনে হলো কলজের ভিতরে হিম বইছে। ভীষণ ঠাণ্ডা লাগলো। খুব বেশি। মাইনাস পাঁচ ছয় ডিগ্রি তাপমাত্রা যে কত ঠাণ্ডা হতে পারে তা আমাদের মতো গরমের দেশের মানুষদের পক্ষে অনুধাবন করাও কঠিন। এই ঠাণ্ডার মাঝে বরফ নিয়ে হুড়োহুড়ি করায় ভিতরটা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
বরফের উপর দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছিল একটি জীপ। কিছুটা কাছে আসতে বুঝতে পারলাম যে, আমাদের ত্রাণকর্তা আনোয়ার ভাই হাজির হয়েছেন। জাহাজ থেকে নেমে তিনি কোন বিশেষ ব্যবস্থায় বাড়ি গিয়েছেন। গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে ফিরতি টান দিয়েছেন। আনোয়ার ভাইর চোখে মুখে রাজ্য জয়ের তৃপ্তি। বললেন, একটু দেরি হয়ে গেল। কষ্ট করলেন। আর এরূপ কষ্ট করেই আমাদেরকে বহু রাত এবং অসংখ্য দিন কাটাতে হয়। আমাদের কষ্টের মৌসুম শুরু হলো বলেও মন্তব্য করলেন আনোয়ার ভাই। সাথে একটি লম্বা নিঃশ্বাস!
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, তেমন কোন দেরি হয়নি, আর পুরো সময়টাই আমরা বরফ এনজয় করেছি। তিনি বললেন, চাকা পাল্টাতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। চারটি চাকাই পাল্টালাম। ঠাণ্ডার মধ্যে খুব ঝামেলা হচ্ছিল। চারটি চাকা কেন? একই সাথে কি চার চাকা পাংচার হয়েছিল? হা হা হা। অট্টহাসিতে চারপাশ কাঁপিয়ে দিলেন আনোয়ার ভাই। বললেন, ভাইরে এখানে চাকা পাংচার হয়না। বরফের চাকা লাগাতে হয়। বরফের উপর দিয়ে চালানোর টায়ার আলাদা। নরম্যাল চাকা দিয়ে বরফের উপর দিয়েতো গাড়ি চালাতে পারবেন না। এই ঠাণ্ডার মধ্যে গাড়ির চারটি চাকা পাল্টানো যে কত কঠিন একটি কাজ তা চাকা খোলার অভিজ্ঞতা যার নেই তিনি বুঝবেন না। আমি ঝিম মেরে গেলাম। আহ্‌ বেচারা। আমাদের নিয়ে কী উটকো ঝামেলায় না পড়ে গেল।
সাঁই সাঁই করে ছুটছিল আমাদের জিপ। সাদা বরফের ওপর দিয়ে ছুটছিল গাড়ি। কিছু দূর আসার পর রাস্তার উপর থেকে বরফ সরানোর কাজ দেখা গেল। সিটি কর্পোরেশন থেকে রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ ধরনের একটি গাড়ি রাস্তা থেকে বরফ সরিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রাখছে। রাস্তার পাশে কী সুন্দর বরফের স্তূপ! রাস্তার উপর বরফ গলাতে নাকি লবণও ছিটিয়ে দেয়া হয়। তবে এখন লবণ না দিয়ে এমনিতেই গাড়ি দিয়ে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। গাড়ি চালাতে যাতে অসুবিধা না হয় সেজন্য সিটি কর্পোরেশন দুর্যোগের মাঝেই রাস্তায় নেমে গেছে। আমার মনে হলো দুর্যোগ আসলে সব জায়গাতেই আছে। শুধু রকমফের আলাদা। আমরা পানিতে ডুবি। আর ইউরোপ বরফে!
অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা বাসায় চলে আসলাম। ভাবী এবং বাচ্চাদের চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল। প্রায় সাথে সাথে খাওয়া দাওয়ার মহোৎসব শুরু হলো। লিজা ভাবী চা নাস্তা খাওয়ানোর নামে আমাদের ভুরিভোজের জম্পেশ এক আয়োজন সাঙ্গ করলেন।
তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে আমরা আর কোথাও বের না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যদিও অসলোতে আমাদের বসবাসের দিন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কোনদিক দিয়ে যে এতগুলো দিন ফুরিয়ে গেল টের পেলাম না। সাগর নদী প্রচুর দাবড়ালাম। বহু পাহাড়ও পাড়ি দিলাম। অসলোতে ডেরা সাজিয়ে সুইডেন এবং ডেনমার্কও ঘুরে আসলাম। অথচ এরপরও মনে হচ্ছে এতো মাত্র আসলাম! আমাদের বিদায়ের সুর আনোয়ার ভাই এবং লিজা ভাবীর মনেও সংক্রমিত হয়েছে। কত রকমে যে আমাদের আপ্যায়িত করা যায় তার রকমারি চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি নিশ্চিত অসলোর দিনকালে আমার ওজন আরো কিছুটা বেড়েছে!
দিন রাত ঘরেই কাটালাম। কোথাও যাইনি। ইচ্ছে থাকলেও যেতে পারিনি। পরদিন সকালেও ঘুম ভাঙলো বেশ বেলা করে। জেগে দেখি অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। চারদিকে বরফে ঢেকে আছে। আনোয়ার ভাই’র গাড়িটিকে মনে হচ্ছে একটি আস্ত বরফ খণ্ড। বাড়ির বারান্দাগুলোতেও বরফের স্তূপ। ঝুল বারান্দায় কয়েকটি চেয়ার এবং একটি টেবিল ছিল। কোন অলস বিকেলে হয়তো ভাই-ভাবী বসে চা খান। কিন্তু এখন দরোজা খুলে দেখলাম যে ধবধবে সাদা বরফে চেয়ার টেবিল সব ঢেকে আছে। রঙ পাল্টে গেছে। দরজা খুলতে হু হু করে ঠাণ্ডা এসে ঘরে ঢুকে যাচ্ছিল। আমি তড়িঘড়ি দরজা বন্ধ করে দিলাম। তবে নিজে ভিতরে না ঢুকে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আহ্‌, কী অপরূপ!
আনোয়ার ভাই’র বাড়ি কিছুটা পাহাড়ি এলাকায়। নিচে অসলো শহর। চারদিকের পাহাড়গুলো চকচক করছে। সব পাহাড়ই ঢেকে আছে বরফে। এত এত বরফের ছড়াছড়ি চারদিকে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখতে লাগলাম। নিচের অসলো শহরও। সূর্যের আলোতে পাহাড়ের বরফ এবং শহরটি কী অনন্য এক রূপ যে মেলে ধরলো তা লিখে বুঝানোর শক্তি আমার নেই। আমি অনেকটা ছুটে ঘরে ঢুকলাম। আমার এডিটর স্যারকে ডেকে নিয়ে গেলাম বারান্দায়। আমি জানি, স্যারও খুশি হলেন। মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির এক অতি প্রাকৃতিক রূপ দেখলেন।
অসলোতে আমাদের বিদায়ের ঘন্টা কড়া নাড়লো। একেবারে শেষদিনে এসে পৌঁছে গেলাম। আজ একযোগে বাড়ির সব অতিথি চলে যাবো। টিপু ভাই বিকেলে চলে যাবে আমেরিকা। মনজু ভাই ইস্তান্বুল হয়ে ঢাকা। এডিটর স্যার এবং আমি অসলো থেকে লন্ডন। লাগেজ গুছিয়ে নেয়ার ব্যাপার স্যাপার রয়েছে। আমাদের গোছানো প্রায় শেষ। নাস্তা সারার পরই যেন চমকে উঠলেন এডিটর স্যার। বললেন, আরে একদম ভুলে গেছি। এই অসলোতেই তো ইবসেনের বাড়ি। দেখে না গেলে কী হয়! ইবসেন কে? আমি কিছুটা আকাশ থেকে পড়লাম। স্যার ছোটখাটো একটি বক্তৃতা দিলেন। পৃথিবী খ্যাত একজন সাহিত্যিক ইবসেন। আমাদের রবীন্দ্রনাথের মতো। নরোজিয়ানেরা ইবসেনকে জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে ফেলেছে। টিপু ভাই এবং মনজু ভাইর ইবসেন নিয়ে কোন মাথা ব্যথা দেখা গেল না। স্যার বললেন, চলো। আমার এডিটর স্যার এমনিই। পারলে ফ্লাইটকে এক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে উনি পাশে যদি বিখ্যাত কিছু থাকে তা দেখে নেবেন। এই অভিজ্ঞতা আমার অনেক। মনে পড়লো তাইওয়ানের কথা। ওখানেও স্যার এরূপ এক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। দলের সবাই যখন টোকিওর ফ্লাইট ধরতে এয়ারপোর্টের দিকে যাত্রা করলেন তক্সন স্যার আমাকে বললেন, ‘চলো’। হোটেলের একটি বিজনেস কার্ড পকেটে নিলেন। হোটেলের রিসিপশনের মেয়েটির কাছ থেকে কার্ডের অপর পৃষ্ঠায় চাইনিজ ভাষায় কী সব লিখিয়ে নিলেন। হোটেল থেকে বেরিয়ে কিছুদূর হেঁটে একটি টেঙি পেলেন। টেক্সিওয়ালাকে ইংরেজি বলার ঝুঁকি না নিয়ে হোটেলের রিসিপশনের তাইওয়ানি মেয়েটির কাছ থেকে লিখে আনা লিখাটি দেখালেন। টেঙিওয়ালা সহজে বুঝে গেলেন এবং আমাদেরকে টেঙিতে তুলে নিলেন। পরে গিয়ে দেখলাম তাইওয়ানের জনক ড. সান ইয়েট সেন মেমোরিয়াল দেখতে এসেছি আমরা। কাছেই এই মেমোরিয়ালের অবস্থান শুনে স্যার এয়ারপোর্টের পরিবর্তে ওদিকে ছুটেছিলেন। ভাগ্যবান এই আমাকেও সাথে রেখেছিলেন।
এবারও এমন বিখ্যাত একজন লেখকের মেমোরিয়াল না দেখে যে স্যার যাবেন না তা বেশ বুঝতে পারছিলাম। আনোয়ার ভাই ঘরে ছিলেন না। কোন এক কাজে বাইরে গেছেন। অর্থাৎ আমাদের গাড়ি নেই। গেলেই একা একা যেতে হবে। এডিটর স্যার লিজা ভাবীকে ডাকলেন। বললেন, একটি টেঙি ঠিক করে দাও। লিজা ভাবী মোবাইল এ্যাপসে টেঙি আনালেন। সেই টেঙিতে চড়ে আমরা ইবসেনের বাড়ির দিকে ছুটলাম। টেঙিওয়ালা একঘন্টা পর আমাদেরকে আবার এই বাড়িতে এনে পৌঁছে দেবেন মর্মেও পথিমধ্যে চুক্তি হয়ে গেলো। ভাড়া যাওয়ার সময় যা, আসার সময়ও তা দিতে হবে।
ইবসেনের বাড়িটি রাজার বাড়ির কাছেই। রাস্তার বিপরীত পাশে। গতবার এই বাড়ির সামনে দিয়ে একাধিকবার ঘুরেছি। এবারও এই বাড়ির সামনে দিয়ে গিয়েছি। কিন্তু এখানে যে এমন একজন মনীষীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি রয়েছে তা জানা ছিল না বলে দেখিনি। স্যার ইবসেন সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। উনার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কেও। আমাকে অনেক তথ্য দিলেন। আমি নেটে ঘাঁটাঘাঁটি করেও বেশ তথ্য উপাত্ত যোগাড় করে নিলাম।
বিশ্বের নাট্য সাহিত্যে শেক্সপিয়রের পরপরই ইবসেনের নাম চলে আসে। নরওয়ের সেরা লেখক ও আধুনিক নাট্যেতিহাসের অন্যতম নক্ষত্র হিসেবেও বিবেচনা করা হয় ইবসেনকে। ইবসেনের অমর সৃষ্টি ‘এ ডলস হাউস’, ‘হেড্ডা গেবলার’, ‘পিলারস অব সোসাইটি’ ইত্যাদি। অত্যন্ত বাস্তববাদী একজন লেখক হিসেবে ইবসেনের খ্যাতি আছে। তবে ইবসেনকে নোবেল না দেয়ার পেছনে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে, ইবসেন বাস্তববাদী, আদর্শবাদী নন। তবে ইবসেনকে নোবেল না দিয়ে নোবেল পুরস্কারকেই ছোট করা হয়েছে বলেও মনে করা হয়। ইবসেনের মতো লেখককে দিলে নোবেল পুরস্কারের মর্যাদা আরো বাড়তো। তাকে আধুনিক নাটকের জনক বলা হয়। ইবসেনের পুরো নাম হেনরিক যোহান ইবসেন। তিনি ১৮২৮ সালের ২০ মার্চ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মৃত্যুবরণ করেন ১৯০৬ সালের ২৩ মে।
এডিটর স্যার আমাকে নিয়ে বাড়িটিতে প্রবেশ করলেন। দোতলার একটি শহুরে বাড়ি। দীর্ঘদিনের পুরানো। কিন্তু পুরানো বাড়িটি যে ইতিহাস এবং ঐতিহ্যে কী পরিমান সমৃদ্ধ তা না দেখলে অজানা থেকে যেতো। আমরা ইবসেনের নানা কর্মকাণ্ড দেখলাম। উনার ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্রও। উনার লেখার টেবিল চেয়ার কলম সোনার ঘড়ি সবই সাজানো গোছানো রয়েছে। সবই আছে শুধু ইবসেন নেই। সবকিছু এমন সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে যে, এই বুঝি ইবসেন এসে বসবেন। লেখবেন। খেতে বসবেন। বিছানায় গা এলিয়ে দেবেন। কিন্তু সকলেই জানেন যে, তা আর হবে না। ইবসেন আর ফিরে আসবেন না। মনীষীরা একবারই আসেন, কিন্তু তাদের পদচিহ্ন পুরো সময়ের জন্যই এঁকে দিয়ে যান। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

x