জুম্‌’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা বদিউল আলম রিজভি

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ
44

নামাযের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যিনি নামায সংরক্ষণকারীদের ব্যাপারে উত্তম প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চিরস্থায়ী সুখময় শান্তির নীড় জান্নাতুল ফেরদৌস দ্বারা মহান প্রভু যাদের পুরস্কৃত করবেন।
নামাযকে স্রষ্টা ও বান্দার মাঝে সেতুনবন্ধনরূপে উপহার দিয়েছেন। যিনি নামাযের সময়সূচি ফরজ ও বিধি বিধান সুনির্দিষ্টরূপে ব্যক্ত করেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। তিনি একক, অদ্বিতীয়, তাঁর কোন অংশীদার নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের সরদার আমাদের মহান নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নামাযী সর্বশ্রেষ্ঠ মুত্তাকী খোদাভীরুদের মহান ইমাম। তাঁর উপর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক। তাঁর সম্মানিত বংশধরগণ, সম্মানিত সাহাবাগণ, তাঁদের অনুসারী তাবেঈন ও কিয়ামত অবধি আগমনকারী মুমীনদের প্রতি করুণাধারা বর্ষিত হোক।
হে মানব মন্ডলী! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নামায কায়েম করো। মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন নিশ্চয়ই নামায মুমীনগণের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ করা হয়েছে।(সূরা নিসা: আয়াত নং: ১০৩)
নবীজির উপর নামাযের বিধান ফরজ করার মাধ্যমে নামাযের শ্রেষ্ঠত্ব ও গুরুত্ব প্রমাণিত হয়েছে। নামায দ্বীনের স্তম্ভ। স্তম্ভ ব্যতিরেকে দ্বীন টিকে থাকবে? নবীজি নামাযকে নদীর পানির সাথে তুলনা করেছেন। নদীতে কোন মানুষ যদি দৈনিক পাঁচবার গোসল করে তার দেহে কোন প্রকার অপবিত্রতা অবশিষ্ট থাকবে কি? সে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকবে।
জেনে রাখুন! যে পঞ্জেগানা নামায সংরক্ষণ করেছে সেটা তার অন্তরে জ্যোতিস্বরূপ হবে। কিয়ামতের কঠিন ক্রান্তিকালে আল্লাহর শাস্তি হতে পরিত্রাণ লাভের একটি অবলম্বন হবে।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায যথাযথ সংরক্ষণ করেছে তথা আদায় করেছে। নামাযের অজু, রুকু-সিজদা, যথানিয়মে করেছে, নামাযের সময় সূচি অনুসরণ করেছে এবং সেটি আল্লাহর পক্ষ হতে সত্যরূপে বিশ্বাস করেছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করেছে। অথবা তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়েছে। (আবু দাউদ শরীফ হাদীস নং ৪৩৯, মসনদে আহমদ হাদীস নং ১৮৩৪৫)
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি নামায সঠিকভাবে আদায় করবে, তার সালাত তার জন্য কিয়ামতের দিন আলো, দলিল ও মুক্তির কারণ হবে এবং যে তা সঠিকভাবে আদায় করবেনা তার জন্য সালাত কিয়ামতের দিন নূর তথা আলো দলিল এবং মুক্তির কারণ হবেনা, ঐ ব্যক্তি হাশরের দিন কারুন, ফেরআউন, হামান ও উবাই ইবনে খালফের ন্যায় কাফিরদের সাথে উঠবে। (আহমদ ৬৫৭৬, ইবনে হিব্বান, ১৪৬৭)
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন, সজাগ দৃষ্টি রেখো! সমস্ত নামাযের প্রতি এবং মধ্যবর্তী নামাযের প্রতি আর দণ্ডায়মান হও আল্লাহর সম্মুখে আদব সহকারে (তরজমা: কানযুল ঈমান সূরা বাকারা: ২ আয়াত: ২৩৮)
অর্থাৎ পঞ্জেগানা ফরজ নামাযসমূহ নির্ধারিত সময়গুলোতে আরাকান ও শর্তাবলীসহকারে আদায় করতে থাকো। এ আয়াতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়া প্রসঙ্গে নির্দেশ করা হয়েছে। বিশেষত মধ্যবর্তী নামায দ্বারা ইমাম আবু হানিফা (র.)’র মতে এবং অধিকাংশ সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম এর মতে আসরের নামায বুঝানো হয়েছে। এ ছাড়াও আয়াত থেকে নামাযে ক্বিয়াম তথা “দাঁড়ানো” ফরজ প্রমাণিত হয়েছে। যার নিকট নামায নেই তার নিকট ধর্মের গুরুত্ব নেই। যে নামায বর্জন করে ইসলামে তার কোন অংশ নেই। নামায কায়েম করা ঈমান, নামায থেকে বিরত থাকা কুফরী। যে নামাযের প্রতি যত্নবান হয় কিয়ামত দিবসে সেটা তার জন্য পরিত্রাণের উপায় হবে। নামাযীগণ আল্লাহর অনুগ্রহধন্য সম্মানিত নবীগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদগণও অলীগণের সাথে হাশরে উপস্থিত হবেন।
মসজিদে জামাতসহকারে নামায আদায় করুন। কুরআন সুন্নাহ অসংখ্য রেওয়াত দ্বারা জামাতের ফজিলত প্রমাণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে রুকু করো, রুকুকারীদের সাথে (তরজমা কানযুল ঈমান: সূরা বাকারা: আয়াত : ৪৩) আয়াতে জামাতের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। জামাতের সাথে নামায পড়া একাকী পড়ার চাইতে সত্তরগুণ বেশী ফজিলত রয়েছে। নামাযের মধ্যে ধীর স্থিরতা অবলম্বন ফরজ করা হয়েছে ধীর স্থির শান্তভাবে যে নামায আদায় করেনা তার নামায শতবার আদায় করলেও পরিপূর্ণ হয়না।
হাদীস শরীফে একাগ্রতা বিহীন তাড়াহুড়া নামায আদায়কারী এক ব্যক্তিকে নবীজি বললেন, তুমি ফিরে যাও ! পুনরায় নামায পড়ো, এভাবে তিনবার বলেছেন।
সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ!
জেনে রাখুন: প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, কিয়ামত দিবসে সর্ব প্রথম নামাযের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। (ইবনে মাযাহ, হাদীস নং ১৪২৫)
নামায যদি সঠিক ও শুদ্ধ হয় সকল কাজ সঠিক ও শুদ্ধ হবে। নামায যদি অশুদ্ধ হয় অন্যান্য কর্ম সমূহ বিনষ্ট হবে। নামায তো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সম্পূর্ক সৃষ্টিকারী এক প্রকার গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এতে আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা ভালবাসা ও বিনয়ের প্রকাশ ঘটে। নামাযের আহবান শ্রবণের পরও যারা দুনিয়ার আহবানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তারা নিতান্ত ক্ষতিগ্রস্ত। মুয়াজ্জিন যখন তার কণ্ঠে “হাইয়্যা আলাস সালাত” হাইয়্যা আলাল ফালাহ” নামাযের দিকে এসো, কল্যাণের দিকে এসো ডাক দিয়ে যায়, মুসলমানদের উপর এ ডাকে সাড়া দিয়ে নামাযে আত্ম নিয়োগ করা অপরিহার্য। অবহেলা উদাসীনতা, অলসতা, প্রদর্শন যাবতীয় ক্ষতি ও ধ্বংসের কারণ।
জামাতে উপস্থিতির মাধ্যমে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ভালবাসা বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি ও ঐক্য জাগ্রত হয়। আল্লাহর স্মরণে মসজিদ আলোকিত হয়। এর দ্বারা ইসলামী নিদর্শনের প্রতি সম্মানবোধ ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হয়। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, মুমীনগণ সফল হয়েছেন যারা তাদের নামাযে নিমগ্ন নামাযের পূর্ণতা একাগ্রতা ও বিনয়ের উপর স্থাপিত। যা অন্তরকে প্রফুল্ল করে আত্মাকে উৎকর্ষ করে। যা বান্দার অন্তরে প্রতিপালকের প্রতি কর্তব্য প্রতিপালনের চেতনা সৃষ্টি করে।
হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নামায হচ্ছে বেহেস্তের চাবিকাঠি আর নামাযের চাবি হচ্ছে পবিত্রতা। (আহমদ হাদীস নং ৩৯)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি প্রিয় নবীজিকে জিজ্ঞেস করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমল কোনটি? উত্তরে বললেন নামায যথা সময়ে আদায় করা। অতঃপর বললাম, অত:পর কোন আমল! বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। অত:পর জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমল? তিনি বললেন আল্লাহর পথে জিহাদ করা। বর্ণনাকারী বলেন রসুলুল্লাহ আমাকে এগুলো বললেন, আমি যদি আরো অধিক জিজ্ঞেস করতাম তিনি আরো অধিক বলতেন। (বুখারী ও মুসলিম, হাদীস নং ৫০৪ ও হাদীস নং ৫০৭)
আল্লাহ আমাদের আপনাদের সকলের প্রতি কুরআনুল করীমের বরকত দান করুন। প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ বিধান অনুসরণে আমাদের নাজাত দান করুন, আমি মহান আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তানের প্রতারণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহতা’আলা এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই মুমীনগণ সফলকাম হয়েছেন, যারা তাদের নামাযে বিনীত এবং যারা অনর্থক কর্ম হতে বিরত থাকে। (তরজমা: কানযুল ঈমান, সূরা : মুমেনুন, আয়াত: ১-৩) আমীন।
লেখক : খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ

x