আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

আহমাদ মাযহার

শুক্রবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
31

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের অবদান আমাদের সমাজে অশেষ ও অপরিমেয়। আমরা কি ভেবে দেখেছি একালে বাংলা নববর্ষ, বসন্তমেলা, পৌষমেলা, যাত্রা, চর্যাগীতি ইত্যাদিকে জীবনযাপনের অঙ্গীভূত করে তাঁকে বাঙালিত্বের গৌরবময় উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করতে শিখেছি কার দেখানো পথ ধরে? আমাদের মনে কি প্রশ্ন জাগে না ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ করার প্রেরণা জাগে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে তাঁর সাংস্কৃতিক শনাক্তি কীভাবে সম্ভব হয়েছে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের জীবনব্যাপী কাজের ফল থেকে? দেশ ও জাতি সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি থেকে যদি ভবিষ্যতে পাথেয় খুঁজে নিতে না পারি তাহলে আমাদের দিক্‌ভ্রান্ত হয়ে কেবল ঘুরতেই থাকতে হবে। এই কম চেনা বড় মানুষটিকে সেজন্যেই ভালোভাবে চিনে নিতে হবে আমাদের।

বাংলাসাহিত্যের ছাত্রদের কাছে হয়তো আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ নামটি কম চেনা নয়। বিশেষ করে যাঁরা বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ে কৌতূহলী তাঁদের কাছে মুন্সী আবদুল করিম নামটি ভালোভাবেই পরিচিত হওয়ার কথা। কিন্তু সাধারণ সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে তিনি কতটা পরিচিত? কয়েকদিন আগে বাংলাসাহিত্যের একজন প্রবীণ অধ্যাপককে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সম্পর্কে যে মন্তব্য করতে শুনেছি তাতে মনে হয়েছে যে, তাঁর কর্ম ও অবদান সম্পর্কে বাংলাদেশের বৌদ্ধিক মহলও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নন। সাহিত্যবিশারদের উচ্চ অবদান সম্পর্কে সেই প্রাজ্ঞ অধ্যাপকের ধারণাগত অবস্থা জেনে আমার হৃদয় আর্তনাদ করে উঠেছে! মনে হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র যে প্রায় দুইশ বছর আগে ‘বাঙালির ইতিহাস নাই’ বলে ক্রন্দন করে উঠেছিলেন তার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এখনো হয়নি!
সামপ্রতিককালে পত্র-পত্রিকার আধিক্যের সুবাদে সাহিত্যবিশারদের জন্ম-মৃত্যুদিনে দু-একটা লেখা বের হয় বলে তাঁর নামটি প্রতি বছরই উল্লিখিত হতে দেখি আমরা। এসব রচনায় মোটা দাগে যে পরিচিতি তুলে ধরা হয় তাতে মুন্সী আবদুল করিমের ‘পুঁথি-সংগ্রাহক’ পরিচয়টিই বড় হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্যপ্রভাবিত আধুনিকতাবোধ আমাদের এমন একটা উপলব্ধির সামনেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যে, আদিতে বাংলা ছিল সাহিত্যের দিক থেকে নিতান্তই নিষ্ফলা। তাছাড়া লক্ষ্য করেছি যে, আধুনিকতাভিমানী সাহিত্যানুরাগীদের কাছে মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য নিতান্তই করুণাযোগ্য বলে মনে হয়েছে। মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যকে শৈল্পিক মানদণ্ডে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই এমন একটা মনোভাবই আমরা প্রধানরূপে দেখতে পাই! এই যখন বাংলাসাহিত্যের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে মনোভাব, তখন এই সাহিত্যের একজন ‘পুঁথি-সংগ্রাহকে’র মূল্য আর কতটাই-বা হতে পারে!
ইউরোপীয় সাহিত্য-পাঠের অভিজ্ঞতালব্ধ নান্দনিকতার রুচিগত অবস্থান থেকে বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্য-করিয়েরা বাংলা পুঁথিসাহিত্যকে খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না। সম্ভবত সে-কারণেই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদও সমাজের কাছে পান না যথাযথ গুরুত্ব। তাঁর পুঁথির বিশাল সংগ্রহ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিংবা বাঙালি জাতির ইতিহাসে কী প্রভাব রেখেছে তাঁকে নিয়ে যেসব মৌসুমি লেখা হয় তাতে সে সম্পর্কে খুব স্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায় না। ফলে যতটা চেনা থাকার কথা ততটা চেনা কিন্তু তিনি হয়ে ওঠেননি। আমি ভুলে যাচ্ছি না, যাঁরা আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে নিয়ে গভীরভাবে চর্চা করেছেন তাঁদের কথা। তাঁদের, অর্থাৎ ব্যতিক্রমী দু-একজনের বিচার ও উপলব্ধির প্রকাশ থেকেই আমাদের অনুভব করার সুযোগ ঘটেছে বাঙালির সাহিত্য-ইতিহাসে ও জাতীয়তাবোধে কী ভূমিকা রেখেছে তাঁর এইসব পুঁথির বিপুল সংগ্রহ।
এ কথা জোরের সঙ্গে বলতে চাই যে, তিনি কেবল একজন ‘পুঁথি-সংগ্রাহক’ই ছিলেন না। পাশাপাশি তিনি পুঁথি-ব্যাখ্যাকারের দায়িত্বও পালন করেছেন অতীব যোগ্যতার সঙ্গে। গভীর আগ্রহ ও অনুরাগ নিয়ে পুঁথি পাঠ করতে করতে তাঁর মনে হয়েছিল, ‘…পুরাতন পুঁথি কঙ্কালেরই মত। কিন্তু আমি তাঁহার ভিতর যুগযুগান্তের রক্তধমন ও নিঃশ্বাসের প্রবাহধ্বনি শুনিয়াছি।’ [চট্টগ্রাম সংস্কৃতি সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণ :১৬ মার্চ ১৯৫১] নিজের আবিষ্কৃত ও সংগৃহীত প্রাক-ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদলের আবির্ভাবের আগের পুঁথির বিশাল ভাণ্ডারের ওপর ভিত্তি করে তিনি যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা আমাদের সাহিত্যের ও সামগ্রিকভাবে জাতির ইতিহাস-উন্মোচনে বড় ভূমিকা রেখেছে। কত বড় সে ভূমিকা তা আমাদের ভালোভাবে বিচার করে দেখতে হবে। সমগ্র জীবনপরিপ্রেক্ষিতে আলাওলের পদ্মাবতীর প্রাচীন পাণ্ডুলিপির আবিষ্কার আবদুল করিমের জীবনের প্রথম ও স্মরণীয় ঘটনা। এটি জাতির পক্ষেও এক মূল্যবান আবিষ্কার। এই আবিষ্কারকে ভিত্তি করে আজ জাতির প্রাচীন সাহিত্য সাধনার সৌধ গড়ে উঠেছে। ড. এনামুল হকের এই বিচারও খুবই যথার্থ।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের বাঙ্গালা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ (১৯১৩ ও ১৯১৪) থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সৃষ্টি হয়েছে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য সাধনায়। পরবর্তীকালে তাদের আধুনিক শিক্ষা ও মানসবিকাশে এর প্রভাব অপরিসীম। বাঙালি মুসলমান তার অতীত ঐতিহ্যের সন্ধান পেয়ে শুধু যে হীনম্মন্যতাবোধের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে তা নয়, বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যে নিজের শেকড়ের গভীর ও দৃঢ় বিস্তার রয়েছে তাকেও যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে।
অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকার ১৮৯৬ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় তিনি লেখেন ‘অপ্রকাশিত প্রাচীন পদাবলী’। এ দিয়েই বলতে গেলে শুরু হয় শাশ্বত সমাজ অভিমুখে তাঁর যাত্রা। তিনি যখন একের পর এক পুঁথির পাঠোদ্ধার করতে থাকলেন তখনই অনুভব করলেন এগুলো প্রকাশনার গুরুত্বের কথা। কিন্তু জীবনের শেষপর্বে এসেও তিনি এগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে না পারার সেই বেদনাবোধ থেকে মুক্তি পাননি। আবদুল হক চৌধুরীকে তিনি আক্ষেপ করে লিখেছিলেন,
… আমি মোস্লেম রচিত প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্য পরিচয় নাম দিয়া প্রাচীন পুঁথির বিবরণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে কয়জন ধনীর কাছে সাহায্য ভিক্ষা চাহিয়াছি। কিন্তু ধনীরা যতই ধনবান হউক, সাহিত্যের মর্যাদা বুঝে না। তাই তাদের কাছে কিছু পাইবার আশা করি না। সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানের মারফত সাধারণের কাছে ভিক্ষার ঝুলি ধরিয়াছি। সকলে ২/৪ টাকা করিয়া দিলে আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হইবে।…২৬/০৬/১৯৪৭, আবদুল হক চৌধুরীকে লেখা চিঠি।
ধনীরাই কেবল নয়, সাহিত্যের অভিভাবক-ধারক-বাহকেরাও অনেক সময় সাহিত্যের মর্যাদা বোঝেন না। তা না হলে আবদুল করিম কেন তাঁদের কাছে কেবল পুঁথি সংগ্রাহকই রয়ে গেলেন! পুঁথি সংগ্রহ, পাঠোদ্ধার, ইতিহাসের সন্ধান এবং প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়াসকে তাঁরা উপলব্ধি করতে পারলেন না! ভবিষ্যতের বাংলাদেশে যে সমৃদ্ধির প্রত্যাশা আমরা দেখতে চাই তার ভিত্তিগুলোকে না চিনে যদি সৌধ গড়তে যাওয়া হয় তাহলে তা স্থায়ী হওয়া দূরে থাকুক, তার ধ্বংস রোধ করার উপায়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসকারগণ মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছিলেন তাতে মনে হতো বাংলা কেবল হিন্দুর ভাষা। এই ভাষায় মুসলমানের কোনো অবদান নেই। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের আবিষ্কৃত, সংগৃহীত ও পাঠোদ্ধৃত পুঁথির আলোকেই প্রধানত নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, প্রাচীনকালে বাংলাভাষার যে চর্চা ছিল তাতে মুসলমান লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। বাংলাভাষার আধুনিক রূপ গড়ে উঠেছে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের সম্মিলিত সুদীর্ঘ পদযাত্রার মধ্য দিয়ে।
বাংলা সাহিত্যে মুসলিম অবদানের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে আবদুল করিম মনে করেন, সৃষ্টিপ্রাচুর্য ও শিল্পসৌকর্যের দিক থেকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ সময় ছিল সপ্তদশ শতাব্দী! ব্রিটিশ শাসনামল শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ছিল এই সক্রিয়তা! আর সপ্তদশ শতকের রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর কাছে আলাওল। আলাওলের নানা রচনার অনেকগুলো পুঁথি থেকে তিনি সৃষ্টিমুখর বৈচিত্র্যপূর্ণ আলাওলকে খুঁজে বের করে আনেন। বাংলার মুসলমানের অন্তরে রোপণ করলেন গভীর আত্মবিশ্বাস! জাগিয়ে তুললেন আত্মমর্যাদা! সৃষ্টি করলেন মাতৃভাষার প্রতি অনুরাগ। বাঙালি মুসলমান সমাজে সম্ভব করে তুললেন পুনর্জাগরণকে।
যে সামাজিক পটভূমিতে তাঁর জন্ম ও বিকাশ তাতে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ প্রায় ছিলই না। ফলে বিদ্যায়তনিক লেখাপড়ায় বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেননি তিনি; গবেষণার পাঠ নেওয়ার জন্য পাননি যোগ্য পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু অসাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের ওপর ভর করে তিনি পথ চলেছেন। এই পুঁজি দিয়েই পুঁথি সম্পাদনার অতি উচ্চ শৈলীগত মান অর্জন করেছিলেন। তাঁর সম্পাদনার মান কতটা উঁচু ছিল সে সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার জন্য আমরা হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর শরণ নিতে পারি। সাহিত্যবিশারদ সম্পাদিত নরোত্তম দাসের ‘রাধিকার মানভঙ্গ’ বইয়ের মুখবন্ধে তিনি বলেছেন,
…শ্রী আবদুল করিম চট্টগ্রামের একটি বাঙ্গালা বিদ্যালয়ের পণ্ডিত। তাঁহার সাংসারিক অবস্থা ভাল নহে। তথাপি তিনি সাহিত্য-সেবায় অকাতর পরিশ্রম করিয়া থাকেন। বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগের প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না। তিনি এই দুর্লভ গ্রন্থের সম্পাদনা-কার্য্যে যে রূপ পরিশ্রম যে রূপকৌশল, যে রূপ সহৃদয়তা ও যে রূপ সূক্ষ্মদর্শিতা প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা সমস্ত ভারতেও বোধ হয় সচরাচর মিলে না। এক একবার মনে হয় যেন কোনো জর্মান এডিটর এই গ্রন্থ সম্পাদনা করিয়াছেন।
মুনশী শ্রী আবদুল করিম সংকলিত, বাঙ্গালা পুঁথির বিবরণ [কলিকাতা, ১৩২০ বঙ্গাব্দ] বইয়ের ‘নিবেদন’ অংশে শ্রী ব্যোমকেশ মুস্তফী জানাচ্ছেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পুঁথি সংগ্রহ করতে কী ক্লেশই না স্বীকার করতে হয়েছিল তাঁকে! প্রেমিকসত্তার তীব্রতা না থাকলে কারো পক্ষে এমন লাঞ্ছনা বরণ করে পুঁথি সংগ্রহে ব্যাপৃত হওয়া যায়! গভীর অন্তর্দৃষ্টি না থাকলে কার অন্তরে জাগে পুঁথির অতলে ডুব দেওয়ার এমন তীব্র প্রেরণা?
…পুঁথি অনুসন্ধান করিতে গ্রামে গ্রামে ঘুরিয়া বেড়াইবার অবসর ও ব্যয় নির্বাহের মত আর্থিক সচ্ছলতা তাঁহার নাই, মূল্য দিয়া তিনি পুঁথি ক্রয় করিতে পারেন এমন অর্থ ত তাঁহার নাই-ই, তথাপি কেবল মাতৃভাষার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, প্রীতি ও ভক্তিবশতঃ তিনি জীবনের দীর্ঘকাল এই পুঁথি সংগ্রহে যথাসাধ্য ব্যয় করিয়াছেন, যথেষ্ট কষ্ট সহ্য করিয়াছেন এবং এই সকল পুঁথির আলোচনায় কাটাইয়াছেন। … সর্বাপেক্ষা তাঁহাকে যে উৎপীড়ন সহিতে হইয়াছে তাহা যেমন অদ্ভুত তেমনি বিস্ময়কর। তিনি মুসলমান, কোনো হিন্দু আঙিনায় ত৭াহার প্রবেশাধিকার নাই, কিন্তু হিন্দুর ঘরে পুঁথি আছে শুনিয়া তিনি ভিখারীর মত তাঁহার দ্বারে গিয়া পুঁথি দেখিতে চাহিয়াছেন। পুঁথি সরস্বতীর পূজার দিনে পূজিত হয়; অতএব মুসলমানকে ছুঁইতে দেওয়া হইবে না বলিয়া অনেকে তাঁহাকে দেখিতেও দেন নাই। অনেকে আবার তাঁহার কাকুতি মিনতিতে নরম হইয়া নিজে পুঁথি খুলিয়া পাতা উল্টাইয়া দেখাইয়াছেন। মুনশী সাহেব দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া হস্তস্পর্শ না করিয়া কেবল চোখে দেখিয়া নোট করিয়া সেই সকল পুঁথির বিবরণ লিখিয়া আনিয়াছেন। এত অধ্যবসায়ে, এত আগ্রহে, এমন করিয়া কোন হিন্দু অন্তত তাহার নিজের ঘরের পুঁথিগুলির বিবরণ লিখিতে বা অন্য কোন কার্য্যে হাত দিয়াছেন কিনা জানি না। মুনশী সাহেবের নিকট বাঙ্গালা সাহিত্য-সমাজের কৃতজ্ঞতার পরিমাণ যে কত বেশী তাহা ইহা হইতেই অনুমান করা যায়।
গবেষক আবদুল হক চৌধুরীকে ২. ১০. ১৯৪৪ তারিখে লেখা চিঠিতে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ লিখেছিলেন, ‘তেঁতুল দেখিলে যেমন জিহ্বায় জল আসে, পুঁথির নাম শুনিলেও আমার তাহা না দেখা পর্যন্ত সোয়াস্তি থাকে না।’ পুঁথি সংগ্রহের প্রতি তাঁর আকর্ষণ নিয়ে রীতিমতো কিংবদন্তি গড়ে উঠেছিল। এ কথা হয়তো এখানে বলে নেওয়া ভালো যে, সাহিত্যবিশারদের পুঁথি সংগ্রহের অভিযান ও তা নিয়ে সাধনার গভীরতা সম্পর্কে সামন্যই হয়তো তুলে ধরা গেল আগের কথাগুলো থেকে। কিন্তু তাঁর মধ্যেকার সাধকসত্তার সঙ্গে বিজ্ঞানদৃষ্টির মিলিত প্রবর্তনায় বাংলা ভাষার প্রতি যে অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তার মূল্যায়ন করার জন্যও দরকার তাঁকে আন্তরিকভাবে অনুভব করার সাধনা। সে সাধনার নিদর্শন আমাদের সমাজে এখন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নেই বলেই বাংলাসাহিত্যের একজন অধ্যাপকের পক্ষেও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ব্যক্তিত্বের, দেশপ্রেমের কিংবা জ্ঞানের গভীরতাকে অনুধাবন করা সম্ভব হচ্ছে না।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ছিলেন জ্ঞানী একজন মানুষ। নিজস্ব প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন পুঁথি সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা। আর প্রাপ্ত পুঁথি পাঠলব্ধ প্রজ্ঞা দিয়ে করেছিলেন তার বিশ্লেষণ। তাঁর সে ক্ষমতারও পরিচয় আমরা পদে পদে পাই! যেমন,
১ … আমাদের ভাষার গ্রহণশক্তি ও প্রকাশশক্তি অসাধারণবিরাট রবীন্দ্র সাহিত্য ইহার অন্যতম দৃষ্টান্ত। আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজি যে কোন শব্দ ও তার প্রকাশভঙ্গি বাংলাভাষা আত্মস্ত করিতে ও হজম করিতে পারে। অতি অল্পকালের মধ্যে নজরুল ইসলাম তাঁহার গদ্য ও পদ্য রচনায় এবং অজস্র ইসলামী গানে তাঁহার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত দেখাইয়াছেন।
২ … মুসলমান হিসেবে আরব পারস্যের সঙ্গে চিরকাল আমরা একটি আন্তরিক যোগ অনুভব করিয়াছি। আবার এই দেশী আবহাওয়া ও অন্নে গঠিত গভীর সম্পর্ক ছিল একান্তভাবে এই দেশের সঙ্গেই। ফলত আমাদের সাধনা চিরকাল দুই ধারায় প্রবাহিত হইয়াছে। একটি এই দেশের সহজ অনুভূত প্রাণবন্ত জাতীয় ধারা। অপরটি মননচিন্তনের ধর্মীয় বা আদর্শমূলক ধারা। একদিকে ধর্মবোধে স্বাতন্ত্র্য সাধনা, অপরদিকে জাতীয়তাবোধ সমন্বয়ক সাধনা। এই দুই ধারায় আমাদের সাধনা চলিয়াছে। -কুমিল্লার পূর্ব-পাক সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণ :২২ আগস্ট ১৯৫২
৩ … সংস্কৃতির জন্ম-প্রেরণা যেখান হইতেই হউক না কেন, সংস্কৃতির উন্মেষ, বিকাশ ও প্রসার পরিবেশ-নিরপেক্ষ নহে। এই পরিবেশের প্রধান উপাদান ঐতিহ্য। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার অর্থ ভিত্তিকে অস্বীকার করা। মাটি ভিত্তি করিয়া তাজমহল দাঁড়াইয়া আছে। সেই মাটির গুরুত্ব অনেকখানি। ইহা ছাড়া তাজমহল তৈরী সম্ভব ছিল না। তেমনি ঐতিহ্য-সম্পর্কবিহীন সংস্কৃতি-সাধনাও অসম্ভব। ঐতিহ্যের যাহা কিছু ভাল তাহার অনুসরণ এবং যাহা কিছু নিন্দনীয়, তাহার বর্জনেই নূতন জীবনাদর্শের সন্ধান মিলে। সংস্কৃতির রূপান্তরও এইভাবেই ঘটে, অগ্রগতিও আসে এই পথে।
-কুমিল্লার পূর্ব-পাক সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণ :২২ আগস্ট ১৯৫২
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের লেখা থেকে এই রকম তীক্ষ্ণ মননশীল দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি দেওয়া যাবে। তিনটি মাত্র দৃষ্টান্ত দিয়ে তাঁর ভাবনার স্তর কতটা উচু তা হয়তো অনুধাবন করা যাবে সামান্যই। কিন্তু তাঁর মনোগঠনটি বোঝা যাবে এই তিনটি মাত্র উদ্ধৃতি থেকেই। বোঝা যাবে কতটা কাণ্ডজ্ঞানের অধিকারী একজন মানুষ ছিলেন তিনি। অনুভব করা যাবে যে, তাঁর জ্ঞানের ভিত্তি ছিল স্বদেশের মাটি। বোঝা যাবে তাঁর মন ছিল কতটা উদার। তাঁর লেখার চরণে চরণে দেখা যাবে গভীর উপলব্ধির শিখা। চেতনার আলো। তাঁর চেতনার আলোয় পথ চিনে চিনে বাংলার মুসলমান স্বদেশে ফিরে এসেছে। তাঁর চেতনার বীজ থেকেই মহীরুহ হয়ে উঠেছে সমন্বয়বাদী অসামপ্রদায়িক বাঙালিত্বের বোধ, ধর্মীয় জীবনচেতনার মধ্য থেকে ওঠা মনুষ্যত্বের উপলব্ধি!
এককভাবে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের অবদান আমাদের সমাজে অশেষ ও অপরিমেয়। আমরা কি ভেবে দেখেছি একালে বাংলা নববর্ষ, বসন্তমেলা, পৌষমেলা, যাত্রা, চর্যাগীতি ইত্যাদিকে জীবনযাপনের অঙ্গীভূত করে তাঁকে বাঙালিত্বের গৌরবময় উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করতে শিখেছি কার দেখানো পথ ধরে? আমাদের মনে কি প্রশ্ন জাগে না ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ করার প্রেরণা জাগে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে তাঁর সাংস্কৃতিক শনাক্তি কীভাবে সম্ভব হয়েছে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের জীবনব্যাপী কাজের ফল থেকে? দেশ ও জাতি সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি থেকে যদি ভবিষ্যতে পাথেয় খুঁজে নিতে না পারি তাহলে আমাদের দিক্‌ভ্রান্ত হয়ে কেবল ঘুরতেই থাকতে হবে। এই কম চেনা বড় মানুষটিকে সেজন্যেই ভালোভাবে চিনে নিতে হবে আমাদের।

[গ্রন্থসূত্র :আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ: ঐতিহ্য অন্বেষায় প্রাজ্ঞ পুরুষ, ২০১১, ঢাকা; আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আহমদ শরীফ, ঢাকা]

x