৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে নতুন করে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল) স্থাপন প্রকল্পে নির্মাণকাজ শুরুর আগেই বড় অঙ্কের ব্যয় কমানো হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে প্রকল্প ব্যয় থেকে ৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে নতুন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। আগে প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, গত ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেয় এবং বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেয়। ডিটেইল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, নকশা, নির্মাণ তদারকি, কমিশনিং, সংশ্লিষ্ট ভবন ও অবকাঠামো ব্যয় খতিয়ে দেখতে বলা হয়। সেই নির্দেশনা অনুসারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সাবেক চেয়ারম্যান আমিন উল আহসানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে ইস্টার্ণ রিফাইনারী ও বিপিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। কমিটি মূলধনী ব্যয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, প্রিকমিশনিং ও কমিশনিং কার্যক্রম, অভ্যন্তরীণ সড়ক, প্ল্যান্ট সংশ্লিষ্ট ভবন এবং যন্ত্রপাতি খাত পর্যালোচনা করে সংশোধিত ব্যয় ৩১ হাজার কোটি টাকায় নামানোর সুপারিশ করে।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, একনেক অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় এই সংশোধনে ১২.৫৯ শতাংশ ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। সরকারি প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদন সংক্রান্ত ২০২২ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী ১০ শতাংশের বেশি ব্যয় কমলে প্রকল্পটি প্রজেক্ট ইভ্যালুয়েশন কমিটি (পিইসি) সভায় উপস্থাপন বাধ্যতামূলক। এতে করে গত রোববার পিইসি সভায় প্রকল্পটিা সংশোধিত প্রস্তাব তোলা হয়।

খাতভিত্তিক কাটছাঁটে প্ল্যান্টসংশ্লিষ্ট ভবন নির্মাণ ব্যয় ৭৬৮.৮৩ কোটি টাকা কমিয়ে ২৫০ কোটিতে নামানো হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি খাতে ব্যয় ১,৭২৬ কোটি টাকা কমানো হয়েছে, যেখানে আগে প্রস্তাব ছিল ৮ হাজার ২০৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অন্যান্য অবকাঠামো ব্যয় ১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। অন্যান্য মূলধনী ব্যয় ১ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা কমিয়ে ৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ ব্যয়ও ২৮৮ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১৩৮ কোটি টাকা করা হয়েছে। একনেক প্রকল্পটি স্বঅর্থায়নে বাস্তবায়নের অনুমোদন দিলেও স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ইসডিবি) এ প্রকল্পে ১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গত ২২ ডিসেম্বর সংস্থাটি প্রাথমিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ব্যাংকটির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরের পর এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৬৮ সালে ফরাসি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেকনিপের সহায়তায় স্থাপিত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ২০১০ সালে। ২০১৩ সালে ১৩ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন মিললেও প্রকল্প এগোয়নি। ২০২২ সালে বিপিসি নিজস্ব অর্থায়নে ২৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু কাজ শুরু হয়নি। ২০২৪ সালে এস আলম গ্রুপ ২৫ হাজার কোটি টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিলে তা ৯ জুলাই অনুমোদন পায়, তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকল্পটি স্থগিত হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ওই সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৬ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ নিশ্চিত না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় ও বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই প্রকল্পে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪২ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। যা কমিয়ে ৩১ হাজার কোটি টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে।

সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। চাহিদার বাকি ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেলই পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়। ইআরএল২ চালু হলে ইউরো৫ মানের পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদন সম্ভব হবে এবং বিদ্যমান রিফাইনারির ডিজেল, মোটর স্পিরিট ও অকটেনও একই মানে উন্নীত করা যাবে।

বিপিসি ইতোমধ্যে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, যার মাধ্যমে বছরে ৪.৫ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা সম্ভব। নতুন ইউনিট থেকে বছরে ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ৬০ হাজার টন এলপিজি, ৬ লাখ টন ইউরো৫ পেট্রোল, ১১ লাখ টন ইউরো৫ ডিজেল, ২ লাখ টন লুব বেস অয়েল এবং ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি কমে আসবে। এতে কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে ইআরএল২ তে পরিশোধন করে বাজারজাত করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উল্লেখ্যযোগ্য উন্নয়ন ঘটবে। তারা বলেন, ইআরএল২ বাস্তবায়িত হলে দেশে জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতায় বড় ধরনের অগ্রগতি আসবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবন্দরের কার্যক্রমে স্থবিরতা
পরবর্তী নিবন্ধএলপিজির দাম আরো বাড়ল, ১২ কেজির দাম ১৩৫৬ টাকা