দিনটি ছিল ২০১৬ সালের কোনো এক সকাল। ঢাকা শহরের ব্যস্ততা আর পরনির্ভরশীল জীবনের পাট চুকিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি গ্রামের নিজ ভিটায় ফিরেছিলেন মোহাম্মদ জামাল। পকেটে খুব বেশি পুঁজি ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল স্বাধীন কিছু করার তীব্র স্বপ্ন। সুদূর বগুড়া থেকে মাত্র ১০০টি কোয়েল পাখির বাচ্চা কিনে এনে শখের বশে বাড়ির এক কোণে ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তখন হয়তো গ্রামের কেউ ভাবেনি, এই সামান্য ১০০টি পাখিই একদিন বদলে দেবে জামালের ভাগ্য, তৈরি করবে একটি বিশাল হ্যাচারি সাম্রাজ্য। ২০১৬ থেকে ২০২৬, দীর্ঘ এক দশকের ব্যবধানে মোহাম্মদ জামাল শুধু একজন সফল খামারিই নন, বরং পুরো ফটিকছড়ি অঞ্চলের বেকার যুবকদের জন্য এক অনুকরণীয় আলোর দিশারী।
তবে, শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু জামালের ছিল ধৈর্য আর পাখির প্রতি গভীর যত্ন। প্রথম দিকের সেই ১০০টি পাখির ডিম থেকে তিনি পরম মমতায় ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা বাড়াতে থাকেন। পাখির সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে তার খামারের পরিধিও। একটার পর একটা শেড বা খামার তৈরি হতে থাকে জামালের আঙিনায়। কিন্তু জামাল শুধু সনাতন পদ্ধতিতে আটকে থাকতে চাননি। ব্যবসার মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি নিজের জমানো টাকা দিয়ে প্রথম একটি ডিজিটাল ইনকিউবেটর মেশিন কেনেন। নিজে নিজেই ডিম থেকে কৃত্রিম উপায়ে বাচ্চা ফুটানোর কৌশল আয়ত্ত করেন তিনি। প্রযুক্তির এই ছোঁয়াই তার খামারকে রূপ দেয় একটি আধুনিক হ্যাচারিতে। ১০ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে জামালের খামারের চিত্র এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে তার হ্যাচারিতে শোভা পাচ্ছে ১২টি বিশাল ডিজিটাল ইনকিউবেটর মেশিন। এই মেশিনগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, একসাথে মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পাখি উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমানে খামারের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। প্রতি ৩ দিন পর পরই ইনকিউবেটরের দরজা খুলে ফুটিয়ে বের করা হচ্ছে ৬ হাজার সতেজ কোয়েল পাখির বাচ্চা। বছরের যে সময়টাতে কোয়েলের চাহিদা তুঙ্গে থাকে তখন প্রতি মাসে জামাল প্রায় ১ লাখ কোয়েল পাখি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করছেন। জামালের খামারে উৎপাদিত প্রতিটি পাখির ওজন যখন ১০০ থেকে ২৫০ গ্রাম হয়, তখনই সেগুলো বিক্রির উপযুক্ত হয়ে ওঠে। ফটিকছড়ির গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি ও খুচরা বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে তার এই পাখি। বর্তমান পাইকারি বাজারে প্রতি পিস কোয়েল পাখি ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
জামালের এই অভাবনীয় সাফল্য শুধু তার নিজের সংসারেই সচ্ছলতা আনেনি, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে রাখছে বড় অবদান। বর্তমানে তার এই আধুনিক হ্যাচারিতে ১০ জন স্থানীয় শ্রমিকের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে, যারা মাসিক ভিত্তিতে এখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সব খরচ, শ্রমিকদের বেতন এবং রক্ষণাবেক্ষণ বাদ দিয়ে বর্তমানে এই খামার থেকে মোহাম্মদ জামালের মাসিক নিট আয় প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। নিজের এই দীর্ঘ পথচলা এবং সফলতা নিয়ে মোহাম্মদ জামাল বলেন– আমি যখন ২০১৬ সালে ঢাকা থেকে সব ছেড়ে ফটিকছড়ির হারুয়ালছড়ি গ্রামে ফিরে আসি, তখন অনেকেই ভেবেছিল আমি ভুল করছি। পকেটে টাকা ছিল না, শুধু বগুড়া থেকে আনা ১০০টি কোয়েলের বাচ্চা দিয়ে শখের বশে কাজটা শুরু করি। আজ ১০ বছর পর যখন পেছনে তাকাই, তখন বুঝ্তিপরিশ্রম আর সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার কখনো বৃথা যায় না। চাকরি না পেয়ে যারা হতাশ হয়ে বসে আছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলব– ছোট দিয়েই শুরু করুন, কিন্তু সততা আর ধৈর্য নিয়ে লেগে থাকুন। নিজের মাটিতেই যে সোনা ফলানো সম্ভব, আমার ১২টি ইনকিউবেটর আর এই কোয়েল পাখির খামারই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
চাকরির পেছনে না ছুটে, নিজের মেধা আর শ্রমকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছানো যায়, মোহাম্মদ জামাল তার জীবন্ত প্রমাণ। ফটিকছড়ির হারুয়ালছড়ি গ্রামের এক কোণে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট শখের খামারটি আজ একটি সফল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। জামালের এই রূপকথার মতো জয়যাত্রা প্রমাণ করে– সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আর লেগে থাকার মানসিকতা থাকলে যেকোনো সাধারণ মানুষই অসাধারণ হয়ে উঠতে পারেন।











