দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে বড় ধরনের অর্থায়ন নিশ্চিত হলো। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনে ১০০ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ঋণ দেবে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় এ–সংক্রান্ত অর্থায়ন চুক্তি সই হয়েছে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং আইএসডিবি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে চুক্তিতে সই করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মিজানুর রহমান এবং আইএসডিবির কান্ট্রি প্রোগ্রামস বিভাগের মহাপরিচালক আনাসে আইসামি।
দেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে নগরীর পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রায় দেড় দশক ধরে প্রকল্পটি নানা আলোচনা, সমীক্ষা, ব্যয় পুনর্নির্ধারণ ও অর্থায়নের জটিলতায় আটকে ছিল। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো তিন মিলিয়ন টন বার্ষিক শোধন ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১৩ সালে প্রকল্পটির জন্য ওই অর্থের অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন এগোয়নি। অবশেষে অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন এখন সময়ের ব্যাপার বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে নতুন করে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল শোধন করা সম্ভব হবে। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারির মোট বার্ষিক শোধন ক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে। যা বর্তমান সক্ষমতার তিনগুণ।
সূত্র বলেছে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর বড় অংশই বিদেশ থেকে পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার আনুমানিক এক–পঞ্চমাংশ পরিশোধন এবং সরবরাহ করে। নতুন ইউনিট চালু হলে দেশীয়ভাবে পরিশোধিত জ্বালানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পরিশোধিত জ্বালানি কেনার ওপর চাপ কমবে। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের মাধ্যমে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ২০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। এতে বছরে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে। যার একটি বড় অংশ ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ঋণ সহায়তা দিচ্ছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন আসবে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করতে হয়। নতুন ইউনিটে এসব পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ দেশেই উৎপাদিত হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটে বছরে প্রায় ১১ লাখ টন ইউরো–৫ মানের ডিজেল, ৬ লাখ টন ইউরো–৫ গ্যাসোলিন, ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল, ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ২ লাখ টন লুব বেস অয়েল এবং ৬০ হাজার টন এলপিজি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ইউনিটের ডিজেল, মোটর স্পিরিট ও অকটেন উৎপাদনও ইউরো–৫ মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত দ্বিতীয় ইউনিটে বিভিন্ন উৎসের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা থাকবে। বিদ্যমান ইস্টার্ন রিফাইনারি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের উপযোগী করে তৈরি। নতুন ইউনিটে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন উৎসের অপরিশোধিত তেলও প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হবে। এতে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহে বাংলাদেশের ক্ষেত্র আরো বিস্তৃত হবে বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
প্রকল্পটির সঙ্গে সমুদ্রপথে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাসের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম এবং ডাবল পাইপলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল গ্রহণ ও ট্যাংকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে প্রচলিত লাইটারেজের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, এসপিএম ব্যবস্থায় বছরে সর্বোচ্চ ৪৫লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে। যেটি ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিটসহ পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকল্পের কাজ শেষে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটটি চালুর আশা রয়েছে।
১০০ কোটি ডলারের বেশি এ ঋণের পরিশোধকাল ২০ বছর। এর মধ্যে পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড এবং পরবর্তী ১৫ বছরে অর্ধবার্ষিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তবে ঋণটির আর্থিক শর্ত প্রচলিত সহজশর্তের উন্নয়ন ঋণের তুলনায় কঠিন হওয়ায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এটিকে ‘হাইলি নন–কনসেশনাল’ অর্থায়ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।
আইএসডিবি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ আল জাসের গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে আজ ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করছেন। উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে গত বুধবার তিনি ঢাকায় আসেন। তাঁর সফরের মধ্যেই ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য দীর্ঘপ্রতীক্ষিত অর্থায়ন চুক্তি সই হলো।
১৯৬৮ সালের ৭ মে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা ইস্টার্ন রিফাইনারি স্বাধীনতার পর দেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আসে এবং ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনে ন্যস্ত হয়।
প্রায় ৬০ বছর আগে স্থাপিত মূল শোধনাগারের সক্ষমতা ১৫ লাখ টনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দেশের জ্বালানি চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ পরিশোধন সক্ষমতার ঘাটতি পূরণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করা হয়, যার বড় অংশ আসে ভারত ও চীনসহ বিভিন্ন উৎস থেকে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির দামে বড় ধরনের ওঠানামা, ভূ–রাজনৈতিক সংঘাত, সমুদ্রপথে সরবরাহ ঝুঁকি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের প্রেক্ষাপটে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও সূত্র মন্তব্য করেছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শরীফ হাসনাত চুক্তি স্বাক্ষরকে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের অগ্রগতি বলে মন্তব্য করেন।












