হালদা নদীর দুই তীরে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭২৯টি প্রজাতি এর আগের কোনো গবেষণায় পাওয়া যায়নি–যা নদীটির উদ্ভিদবৈচিত্র্য গবেষণায় এক অনন্য সংযোজন। এছাড়া নদীটির কর্ণফুলীর মোহনা (মদুনাঘাট) থেকে হাটহাজারী নাঙ্গলমোড়া পর্যন্ত ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের নির্দেশক উদ্ভিদ কেওড়ার উপস্থিতি রয়েছে, যা উজানের দিকে লবণাক্ত পানির প্রভাব বাড়ার ইঙ্গিত দেয় এবং এটি হালদার স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি। এছাড়া শনাক্তকৃত উদ্ভিদের মধ্যে ৫১৭টি ঔষধি ও ২৩টি বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। পাশাপাশি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা না হলে ভবিষ্যতে বিপন্ন হতে পারে এমন ১০০ প্রজাতির প্রজাতির উদ্ভিদও রয়েছে সেখানে। শনাক্তকৃত উদ্ভিদের মধ্যে স্থানীয় প্রজাতি রয়েছে ৭৬৫টি এবং ২৪৪টি বিদেশি প্রজাতি রয়েছে। নতুন এই আবিষ্কার হালদার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের (২০২৬) অক্টোবর পর্যন্ত বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা–ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো)-এর উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় হালদা নদীর উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের এ চিত্র উঠে আসে। হালদা নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ৮১ কিলোমিটার এলাকার পরিচালিত গবেষণাকর্মটির নেতৃত্ব দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল। সহযোগী নেতৃত্বে ছিল ইকো’র সায়েন্টিফিক অফিসার ও চবি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী মো. খন্দকার রাজিউর রহমান, সজীব রুদ্র, মো. আরিফ হোসাইন, মো. শহিদুল ইসলাম, টুকি মারমা ও সনাতন চন্দ্র বর্মন। গবেষণায় সহযোগিতা করে বাংলাদেশ স্টিল রি–রোলিং মিলসের (বিএসআরএম)।
গতকাল মঙ্গলবার নগরের লালখান বাজারের একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। এসময় গবেষক দলের পাশাপাশি গবেষণা তত্ত্বাবধানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি ও মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন ও বিএসআরএম হেড অব সিএসআর রুনি রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণায় হালদায় ২৯ টি উৎস পাওয়া গিয়েছে যা নদীটি দূষণের জন্য দায়ি। অধিকাংশ দূষণের উৎস মদুনাঘাট থেকে নাজিরহাট ব্রিজ পর্যন্ত জায়গায় অবস্থিত এবং অধিকাংশ বালু উত্তোলন করতে দেখা গেছে ফটিকছড়ি থেকে মানিকছড়ির যোগ্যাছলা পর্যন্ত। এছাড়া হালদা নদীর একাধিক সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল শনাক্ত করা হয়।
হালদার উদ্ভিদবৈচিত্র্য : অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল জানান, হালদা নদীর দুই তীরে শনাক্তকৃত ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদগুলোর মধ্যে ৫৮৭টি গণভুক্ত এবং ১৫২টি পরিবারের অন্তর্গত। এদের মধ্যে বড় বৃক্ষ ২১২ প্রজাতির, গুল্ম ১৩৩ প্রজাতির, লতা ১৩৩ প্রজাতির, বীরুৎ ৫২২ প্রজাতির এবং পরজীবী ৯ প্রজাতির। ২টি নগ্নবীজি উদ্ভিদ, ১৩টি মসগোত্রীয় এবং ৩৫টি ফার্ন প্রজাতি রয়েছে। এছাড়া ছত্রাক পাওয়া গেছে ৭ প্রজাতির। স্থানীয় প্রজাতি রয়েছে ৭৬৫ এবং বিদেশি প্রজাতি ২৪৪। একবীজপত্রী উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে ২২৩ প্রজাতি আর দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে ৭৪৯ প্রজাতির। দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদসমূহের মধ্যে ফ্যাবেসি গোত্রভুক্ত গাছ সর্বাধিক শনাক্ত হয়েছে। একবীজপত্রী উদ্ভিদের সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে পোয়াসি (ধান/ঘাস জাতীয়) গোত্র থেকে।
এছাড়া দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ এর মধ্যে বট এবং কড়ই জাতীয় গাছ সর্বাধিক শনাক্ত হয়েছে। একবীজপত্রী উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে। সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে লোমশ ক্রোটন, আচারগুলা, অমলকুচি, গুলঞ্চ, কুর্চি, হোগলা, বনবড়ই, তোকমা, কাক ডুমুর, কাশফুল, লজ্জাবতী।
এ গবেষণায় শনাক্তকৃত উদ্ভিদের মধ্যে সর্বমোট ৫১৭ টি ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে আছে কুর্চি, বচ, আপাং, সুগন্ধমূল, অর্কমূল, কালমেঘ, বেগনিয়া, বন অড়হর, হিজল, ছাতিম, আকন্দ, তুফানি লতা, হাতিশুঁড়, সোনালু ও স্বর্ণলতা। শনাক্তকৃত ২৩টি বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ এর মধ্যে রয়েছে বাটনা লেইস্যা গর্জন বা লেকুয়া গর্জন, চাউ তাল।
ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল বলেন, বর্তমান অবস্থায় যদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তবে ভবিষ্যতে বিপন্ন হতে পারে এমন ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে বনিপদ, নীলভুট্টা, তেজবহুল, ফাইজ গাছ, সিধা জারুল, কুর্চি পাম, নাট অলকুশি, খনা, অশোক, বরুন, লবঙ্গ লতা।
তিনি বলেন, হালদা নদীকে কেন্দ্র করে পূর্বে দূষণবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা পরিচালিত হলেও নদীটির সামগ্রিক প্রাণ–প্রকৃতি ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য নিয়ে এ ধরনের পূর্ণাঙ্গ গবেষণা এই প্রথম সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে পরিচালিত একটি গবেষণা হাটহাজারী উপজেলার নদীর একটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ ছিল। পূর্ববর্তী গবেষণার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণে বর্তমান গবেষণায় নথিভুক্ত মোট ১০২৯টি উদ্ভিদের মধ্যে ৭২৯টি উদ্ভিদের প্রথম রেকর্ড পাওয়া গেছে।
হালদা নদীর উদ্ভিদবৈচিত্র্য ধ্বংসের আশঙ্কা : নদী দখল ও দূষণ রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে হালদা নদীর তীরবর্তী উদ্ভিদবৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষণাকর্মের নেতৃত্ব দেয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল। তিনি বলেন, নদী দখল, দূষণ ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের ফলে এসব উদ্ভিদসহ অন্যান্য প্রজাতির অনেকগুলোই হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর ফলে শুধু উদ্ভিদবৈচিত্র্যই নয়, বরং নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ, বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য এবং ঔষধি উদ্ভিদভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই হালদা নদীকে রক্ষা করতে নদী দখল ও দূষণ বন্ধ করা, নদীতীরের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং উদ্ভিদবৈচিত্র্যের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
দুর্লভ প্রজাতির সন্ধান : গবেষক দল কিছু দুর্লভ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ প্রজাতির সন্ধান পায়। যেমন–লেইস্যা গর্জন বা লেকুয়া গর্জন পাখা ঢেকিয়া ইত্যাদি। যেগুলোর পূর্বে চট্টগ্রাম জেলায় উপস্থিতির নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। এসব উদ্ভিদের উপস্থিতি হালদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের উদ্ভিদবৈচিত্যের সমৃদ্ধি ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভিদ জন্মানোর হার কম–এমন এলাকাও শনাক্ত : গবেষণায় দেখা গেছে, হালদা নদীর নাজিরহাট সেতু থেকে নারায়ণহাটের আগ পর্যন্ত নদীতীরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো উদ্ভিদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। এর অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হলো নদীর উভয় তীরে কৃষিকাজ ও ফসল চাষের ব্যাপকতা, যা প্রাকৃতিক উদ্ভিদের বিস্তার ও আবাসস্থলকে সীমিত করতে পারে।
উজানের দিকে লবণাক্ত পানির আধিক্য : ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল বলেন, আমাদের পরিবেশে অনেক ধরনের নির্দেশক উদ্ভিদ রয়েছে, যাদের উপস্থিতি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে। তেমন একটা উদ্ভিদ হলো কেওড়া। কেওড়া গাছ সাধারণত উপকূলীয় (ম্যানগ্রোভ) অঞ্চলের উদ্ভিদ যেটি লবণাক্ত পরিবেশে জন্মায়। আমাদের গবেষণায় কর্ণফুলীর মোহনা (মদুনাঘাট) থেকে হাটহাজারী নাঙ্গলমোড়া পর্যন্ত কেওড়া গাছের উপস্থিতি দেখা গেছে। অর্থাৎ, উজানের দিকে লবণাক্ত পানির আধিক্য বাড়ছে যা নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি।
হালদা নদীর একাধিক সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল শনাক্তকরণ : গবেষকদল হালদা নদীর উৎপত্তিস্থল থেকে মোহনা পর্যন্ত প্রায় ৮১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সরেজমিন জরিপ পরিচালনা করে। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে নদীটির উৎপত্তিস্থল হিসেবে রামগড় উপজেলার হাসুকপাড়া নামক স্থানের উল্লেখ পাওয়া গেলেও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন ছোট–বড় জলধারা থেকে পানি এসে নদীতে মিশেছে। এসব স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গরু কাটা, যা রামগড় উপজেলার ১ নম্বর পাতাছড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত। বিষয়টি অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য গবেষকদল উভয় সম্ভাব্য উৎসধারা বরাবর জরিপ পরিচালনা করেছে এবং গবেষকদল এর মতে, গরুকাটাও হালদা নদীর একটি উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
হালদা দূষণ : গবেষণায় হালদার পানি দূষণের ১৩টি, বায়ুদূষণের ১০টি ও মাটিদূষণের ১১টিসহ বিভিন্ন ধরনের দূষণের ৫৭টি উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি উৎস সরাসরি নদীদূষণ করছে।









