হাতি রক্ষায় অভয়ারণ্যের করিডোরে বসছে সেন্সরযুক্ত রোবটিক ক্যামেরা

দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প ব্যয় ৪০ কোটি টাকা

মোহাম্মদ মারুফ, লোহাগাড়া | শনিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৫ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মিত রেলপথের দূরত্ব ১০৩ কিলোমিটার। এরমধ্যে রেলপথের দীর্ঘ ২৭ কিলোমিটার লোহাগাড়ার চুনতি, ফাঁসিয়াখালী ও মেধাকচ্ছপিয়া সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে গেছে। এসব এলাকায় রয়েছে হাতি চলাচলের করিডোর। এভাবে রেললাইন স্থাপনের কারণে হাতি চলাচলের পথে বাধা তৈরি হচ্ছে। যদিও হাতির চলাফেরা নির্বিঘ্ন করার জন্য রেললাইনের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ওভারপাস এবং আন্ডারপাস। এরপরও ঘটছে দুর্ঘটনা। এবার রেলওয়ে দুর্ঘটনার কবল থেকে হাতি রক্ষায় অভয়ারণ্য এলাকায় বসাচ্ছে ৬টি আধুনিক সেন্সর বিশিষ্ট রোবটিক ক্যামেরা। দেশের বাইরে থেকে আনা হচ্ছে এসব ক্যামেরা। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে হাতি চলাচলের যেসব পথ রয়েছে, সেখানে বসানো হবে ক্যামেরাগুলো।

অভয়ারণ্য সূত্রে জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ও বাঁশখালী উপজেলা এবং কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় বিস্তৃত। যার আয়তন ১৯ হাজার ১৮৫ একর। এটি প্রাকৃতিকভাবেই গর্জনগাছ প্রধান এলাকা। আগে এই অঞ্চলে ঘন গর্জন বন থাকলেও বর্তমানে অল্প কিছু গর্জনগাছ অতীতের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। এই বনের উল্লেখযোগ্য প্রাণীদের মধ্যে হাতি অন্যতম। বর্তমানে চুনতি অভয়ারণ্যে প্রায় ৪০৫০টি হাতি আছে। এই হাতির পাল লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চকরিয়ার বনজুড়ে চলাচল করে। খাবার বা পানির খোঁজে বন্যহাতির চলাচলের সময় তাদের রেললাইন পার হতে হয়, যা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। রেললাইনের জন্য বনের ২০৭ একর জায়গাকে সংরক্ষিত বন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ৬টি ক্যামেরা, সংকেতবাতি ও বৈদ্যুতিক কাজ মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা। সেন্সরক্যামেরা ও সংকেতবাতি একই সাথে কাজ করবে, যাতে রাত বা কুয়াশার মধ্যেও হাতি শনাক্ত করা যায়। এতে বেঁচে যাবে হাতি। কমবে দুর্ঘটনাও। চলতি বছরের মধ্যেই এই প্রকল্প শেষ করার ইচ্ছা রয়েছে রেলওয়ের। এরই মধ্যে ট্রেনচালক ও পরিচালকদের (গার্ড) এক দফা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যেখানে সংকেত পাওয়া মাত্র কীভাবে দ্রুত গতি কমিয়ে ট্রেন থামাতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প শেষ হলে আরো প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। চলতি বছরের মধ্যেই হাতি চলাচলের করিডোরে ক্যামেরাগুলো স্থাপন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকাকক্সবাজার রুটে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের উদ্বোধন করা হয়। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে যুক্ত হয় পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন। একই সনের ৮ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রামকক্সবাজার রুটে চালু করা হয় ঈদ স্পেশাল ট্রেন। চলতি সনের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে চট্টগ্রামকক্সবাজার রুটে চালু করা হয় ‘সৈকত এক্সপ্রেস’ ও ‘প্রবাল এক্সপ্রেস’ ট্রেন। বর্তমানে ঢাকাচট্টগ্রামকক্সবাজার রেলপথে পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, সৈকত এক্সপ্রেস ও প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর উপজেলার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এলিফ্যান্ট ওভারপাস এলাকায় চট্টগ্রামগামী ট্রেনের ইঞ্জিনে কাটা পড়ে এক গরুর বাছুরের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালের ৭ এপ্রিল একই এলাকায় কক্সবাজারগামী পর্যটন এক্সপ্রেস ট্রেনে কাটা পড়ে ৩টি গরুর মৃত্যু হয়। একই সালের ১৩ অক্টোবর উপজেলার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকায় ঢাকাগামী কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনের ধাক্কায় ১০ বছর বয়সী একটি ফিমেইল হাতি শাবক গুরতর আহত হয়। ১৫ অক্টোবর রেলওয়ের একটি রিলিফ ট্রেন আহত বন্যহাতিটি উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ডুলাহাজার সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালে নিয়ে যান। একইদিন সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বন্যহাতিটির মৃত্যু হয়। হাতির মৃত্যুর পর এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় রেলপথ মন্ত্রণালয়। ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর এক অফিস আদেশে বলা হয়, দেশের বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান এলাকা অতিক্রম করার সময় ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২২ জুলাই চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ব্যারিয়ার না থাকা অংশ দিয়ে রেললাইনের উপর চলে আসে একটি বন্যহাতি। রেললাইনের উপর হাতি দেখতে পেয়ে লোকোমাস্টার (ট্রেনচালক) জরুরি ব্রেক চেপে ট্রেনটি থামান। একই হাতি রেললাইন থেকে নেমে পেছনে গিয়ে ট্রেনের বগিতে ধাক্কা দেয়। ট্রেন চলে যাবার পরে হাতিটি আন্ডারপাসের র‌্যালিং ভেঙে পূর্বপাশে সংরক্ষিত বনের দিকে চলে যায়। এতে কেউ হতাহত না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ট্রেনের বগি।

দোহাজারীকক্সবাজার রেললাইনে শুধু হাতিই নয়, প্রায় সময় মারা যাচ্ছে মানুষও। এই রেললাইনের অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো রীতিমতো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। উদ্বোধনের ২০ মাসে লোহাগাড়া উপজেলা অংশে ট্রেন দুর্ঘটনায় শিশুসহ ১১ জনের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ৫ জনের মৃত্যু ও ৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২ আগস্ট কক্সবাজারের রামুতে ট্রেনের ধাক্কায় সিএনজিচালিত টেক্সির পাঁচ যাত্রী নিহত হন। রেললাইন চালু হয়েছে দুই বছরও হয়নি। এরই মধ্যে মারা গেছেন অন্তত ৩০ জন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, রেললাইনের ৭২টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৫৬টিতে কোনো গেটম্যান নেই। নেই কোনো ব্যারিয়ার। বরাবরই লোকবল সংকটের কথা বলছে রেলওয়ে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ও প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন গণমাধ্যমকে বলেন, ক্যামেরাগুলো হাতির অবয়ব চিহ্নিত করতে পারবে। যদি কখনো হাতি বা হাতির পাল রেললাইনে চলে আসে, তাহলে তা ছবি আকারে সিগন্যাল বা সংকেত পাঠাবে। এই সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে রেললাইনের পাশে থাকা লাল বাতিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠবে। এই লাল বাতি দেখে চলন্ত ট্রেনের চালক (লোকোমাস্টার) বুঝতে পারবেন, রেললাইনে হাতির পাল বা হাতি রয়েছে। তখন তিনি ট্রেনের গতি কমাবেন এবং থামাবেন। সংরক্ষিত বনের ভেতরে ২৭ কিলোমিটার রেললাইন রয়েছে। হাতির করিডোর থাকায় ওভারপাস, আন্ডারপাস নির্মাণসহ বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। হাতির পাল এসব আন্ডারপাস এবং ওভারপাস ব্যবহার করে। তারপরও মাঝেমধ্যে রেললাইনে চলে আসে। এখানে আসার পর যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, সেজন্য ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো রোবোটিক ও সেন্সর ক্যামেরা হিসেবে কাজ করবে। এরসাথে সংকেতব্যবস্থা যুক্ত থাকবে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের উপবন সংরক্ষক আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ জানান, বন্যহাতি রক্ষায় এই ধরনের ক্যামেরা বসানোর জন্য রেলওয়েকে আমরা প্রায় দুই বছর আগে থেকে বলে আসছি। আগে এ ব্যাপারে একবার ট্রেনচালকদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে আর তা বসানো হয়নি। এছাড়া অভয়ারণ্যের ২৭ কিলোমিটার অংশে নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে ট্রেন চলাচলের অভিযোগ করেছেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজ জানান, হাতি রক্ষায় অভয়ারণ্য এলাকায় সেন্সরযুক্ত আধুনিক রোবটিক ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চয় ভালো হবে। তবে আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, সেটা হচ্ছে কিছু যন্ত্রপাতি স্থাপনের পরে তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এছাড়া এসব যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য দক্ষ লোকবলও পাওয়া যায় না। ফলে তোড়জোড় কিছু একটা করা হলে সেটা কিছুদিন যেতে না যেতেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। মোটকথা ক্যামেরাগুলো সচল রাখা গেলে বন্যহাতি রক্ষায় নিশ্চয় সুফল পাওয়া যাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখাগড়াছড়ি জেলায় ব্লাড ব্যাংক না থাকায় ভোগান্তি
পরবর্তী নিবন্ধরাউজানে কোটি টাকায় নির্মিত ৪ কালভার্ট এখন আবর্জনার ভাগাড়