মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে কৌশলগত সুবিধা নিজেদের দিকে টেনে নিচ্ছে বলে বার্তা দিচ্ছে ইরান। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ এবং আঞ্চলিক জলপথে নিয়ন্ত্রণ দাবি। সব মিলিয়ে তেহরান এখন প্রতিরোধ নয়, বরং প্রভাব বিস্তারের অবস্থান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। সর্বশেষ, গতকাল ইসরায়েলের উত্তরের শহর হাইফার বাজান তেল শোধনাগারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। হামলার পর স্থাপনাটিতে আগুন ধরে যায় এবং ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সূত্রে প্রকাশিত ভিডিওতে এর সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে। গত ১৯ মার্চ তেহরানে ইসরায়েলি হামলার জবাব হিসেবেই এই আঘাত হানে ইরান, যা সরাসরি জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে তাদের কৌশলগত পাল্টা আক্রমণের অংশ। এর আগে ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের একটি রাসায়নিক কারখানায় আঘাত হানে। এতে প্রাণহানি না হলেও অগ্নিকাণ্ড ও রাসায়নিক ঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, ইরাকেও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি সরাসরি চাপে পড়েছে। গতকাল রাজধানী বাগদাদের কাছে অবস্থিত মার্কিন ‘ভিক্টরি বেস’ লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালানো হয়েছে। এতে একটি পরিবহন উড়োজাহাজে আগুন ধরে যায়। এক সময় এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নিরাপদ ঘাঁটি মনে করা হতো। একইসঙ্গে কুর্দি অঞ্চল এরবিলে মার্কিন কনস্যুলেট লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা করা হয়।
যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা তৈরি হয়েছে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। হরমুজ প্রণালির পর এবার ওমান উপসাগরের ওপরও ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ দাবি করেছে ইরান। দেশটির নৌবাহিনীর এক শীর্ষ কমান্ডার জানিয়েছেন, এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি এতটাই শক্তিশালী যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানি কমান্ডার দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক মহড়া ও ক্ষেপণাস্ত্র তৎপরতার কারণে মার্কিন রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ইরানি জলসীমা থেকে শত শত মাইল দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ইরানি কমান্ডার আরও দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির পূর্বাংশ এবং পুরো ওমান উপসাগর এখন তাদের নৌবাহিনীর কার্যকর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তেলকূপ ও খার্ক ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্পের : ইরানে যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বসহকারে আলোচনা চালাচ্ছে। কিন্তু খুব শিগগিরই একটি চুক্তি না হলে ইরানের খার্ক দ্বীপ এবং তাদের তেলকূপ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে দেওয়া সর্বসামপ্রতিক এক পোস্টে ট্রাম্প এই হুমকি দেন। তিনি লেখেন, (আলোচনায়) বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু যদি কোনও কারণে শিগগিরই চুক্তি না হয়; যা (চুক্তি) সম্ভবত হবে, এবং যদি হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে ‘ব্যবসার জন্য খুলে দেওয়া’ না হয়, তবে আমরা ইরানে আমাদের সুন্দরভাবে থাকা শেষ করব। তাদের সব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, তেল কূপ এবং খারক দ্বীপ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেব।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহণে বাধা দেওয়া বন্ধ না–করলে তেলভান্ডারেও হামলা চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে সেনা সংখ্যা বাড়াচ্ছে। প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫০০ সেনা ইতিমধ্যেই পৌঁছেছে। এই সেনা বাড়ানোর মধ্যেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনাও চলছে।
এছাড়া, ইরানে স্থল অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড (প্রায় ৪০০ কেজি) সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কব্জায় আনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হতে পারে। এজন্যই এই ইউরেনিয়াম সঞ্চয় করে রেখেছে ইরান।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অভ্যন্তরীন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এক প্রতিবেদনে বলেছে, ট্রাম্প তার পরামর্শদাতাদেরকেও ইরানকে চাপ দিতে বলেছেন, যেন যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে তারা এই পারমাণবিক উপাদান যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়। ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছেন, ইরান এই উপাদান রাখতে পারবে না। আলোচনার টেবিলে ইরান রাজি না হলে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে এই ইউরেনিয়াম দখলে নেওয়ার কথাও তিনি আলোচনা করেছেন। ট্রাম্প ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নেপথ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। তবে একটি বিষয়ে ট্রাম্প বরাবরই অনড় ছিলেন যে, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রাখা চলবে না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউরেনিয়াম দখলের অভিযান অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা ইরানে প্রবেশ করতে হতে পারে, যা বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ডেকে আনতে পারে।
এদিকে, ইরান কখনো পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি এবং ভবিষ্যতেও তেমন কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই। গতকাল সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। বাগাই জানান, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) সই করে ইরান আসলে কতটা সুফল পাচ্ছে, তা নিয়ে দেশটির পার্লামেন্ট এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। মুখপাত্র বাগাই বলেন, ইরান এখনো এই চুক্তির সদস্য হিসেবে এতে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে চুক্তির আওতায় দেশ হিসেবে ইরানের যেসব অধিকার পাওয়ার কথা, তা আসলে তারা ভোগ করতে পারছে কি না–সেটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ দিন ধরেই ইরানের এই দাবির বিরোধিতা করে আসছে এবং তেহরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র তৈরির গোপন চেষ্টার অভিযোগ তুলে আসছে।
যুদ্ধে জড়াবো না : যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার বলেছেন, ব্রিটিশ বাহিনী ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করবে না। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা আছে কিনা, এ নিয়ে একজন সাংবাদিকের করা একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই যুদ্ধ আমাদের না, আমরা এতে জড়াবো না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থান তুলে ধরে বলেন, যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাজ্য ‘প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ নিচ্ছে, যাতে ‘ব্রিটিশ নাগরিকদের জীবন, যুক্তরাজ্যের স্বার্থ এবং আমাদের আঞ্চলিক মিত্রদের’ সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। স্টারমার আরও জানান, যুক্তরাজ্য নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার জন্য চেষ্টা করবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমাদেরকে কোনোভাবেই এই যুদ্ধে জড়ানো যাবে না।
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত গত ২৪ ঘণ্টায় ১১টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৭টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪১টি ড্রোন এবং ৪৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় আরও জানায়, এসব হামলায় আমিরাতে এখন পর্যন্ত ১৭৮ জন আহত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ বাহরাইনও তাদের আকাশসীমায় ৮টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৭টি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে। বাহরাইন প্রতিরক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট ১৮২টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৯৮টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
অপরদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের ২৬১ জন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কতজন সেনা মারা গেছেন, সেই সংখ্যা প্রকাশ করেনি ইসরায়েল। ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আহত ৬ হাজার আটজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২১ জন এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অন্তত ২৩২ জন আহত ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।










