কেবল আমেরিকায় নয়। হল্যান্ড, সুইডেন সহ গোটা ইউরোপ জুড়ে কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন পথ ধরে, দালালের হাত ধরে আসা বিদেশিদের ধরে প্রথমে ডিটেনশন ক্যাম্প, অতঃপর জোর করে প্লেনে তুলে দিয়ে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ভাগ্যের সন্ধানে আসা এই লোকগুলি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষায় ‘এলিয়েন‘, যার অর্থ বিদেশী। আবার যার অর্থ বহিরাগত বা অস্বাভাবিক ব্যক্তি। অর্থাৎ এরা মানুষ হলেও স্বাভাবিক নয়, যেন ভিন কোন গ্রহ থেকে আসা– এমনটাই ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝানো। অর্থাৎ ওরা আমাদের মত নয়। ওরা ভিন্ন। ইউরোপ কিংবা আমেরিকা ভুলে যায় অতীত। কেননা এই সব ‘এলিয়েনরা‘ একটা সময় এই সমস্ত দেশকে উন্নত করতে কেবল মাথার ঘাম পায়ে ফেলেনি, প্রাণও দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। বৈরী প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে পাথরের–পাহাড় কেটে সমতল ভূমি বানিয়েছে, পাহাড় কেঁটে তার নিচে সুড়ঙ্গ বানিয়েছে, বিশাল রাস্তা বানিয়েছে, প্রাসাদ বানিয়েছে এই সমস্ত ‘ভুখা নাঙ্গা‘ বিদেশিরা। যখন তাদের প্রয়োজন হয়েছিল তখন তাদের অনেকটা জামাই আদরে জাহাজে চড়িয়ে এদেশে এনে থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে সবার ভাগ্যে তেমনটি জোটেনি। আফ্রিকা থেকে মানবেতর অবস্থায় শারীরিক নির্যাতন করে, লোহার শেকল গলায় পায়ে পরিয়ে ইউরোপ–আমেরিকায় ক্রীতদাস–বাণিজ্য হয়েছে। সম্পদের পাহাড় গড়েছে ওলন্দাজ, ফরাসি, স্পেন, বেলজিয়াম,পর্তুগাল ও আরো অন্যান্য দেশের ক্রীতদাস ব্যবসায়ীরা। পাহাড়ের সম্পদ গড়েছে ডাচ রাজ পরিবার। পূর্বসূরিদের এই অপরাধের জন্যে মাস দেড়েক আগে ডাচ রাজা উইলিয়াম সুরিনামে গেলে সেখানে এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। তাই বলি, ‘এলিয়েন খেদাও‘ নামে যে অমানবিক কর্মকান্ড আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে চলমান, তা ইউরোপের অনেক দেশে তারও আগ থেকে চলমান। তবে চোখে পড়ে কেবল আমেরিকার ঘটনাবলী। কারণ সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প যা ঘটান, তা ঘটান ঘটা করে, ঢাক–ঢোল পিটিয়ে। আর ইউরোপে যেটি ঘটে চলেছে তা ঘটে চলেছে নীরবে। অনেকটা আর দশজনে না জানার মতো।
আমেরিকার মেনিনসোয়েটা রাজ্যে ‘আইনগত ডকুমেন্ট‘ ছাড়া বসবাসকারী বিদেশী নাগরিকদের ধরার জন্যে ‘আইস‘ নামক যে বাহিনী রাস্তায় নামানো হয়েছে, তাদের কার্যকলাপ দেখে মনে হয় যেন ‘মশা মারতে কামান দাগা‘। বাড়ির দরোজা জানালা ভেঙে, গাড়ির জানালা ভেঙ্গে টেনে হিচঁড়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার অমানবিক ও ভীতিকর দৃশ্য আমরা প্রতিদিন দেখছি টেলিভিশনের পর্দায়। দেখেছি কী করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নিরীহ, নিরস্ত্র আমেরিকান নাগরিকদের কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় মদদে। ইউরোপে এই ধরণের বর্বরতা ঘটছে না, এই ধরনের দৃশ্য চোখে পড়েনা। সত্যি কথা বলতে কী ব্রিটিশ, ডাচ কিংবা ইউরোপের পুলিশ অনেক সভ্য। এখানে পুলিশ প্রকৃতপক্ষে জনগণের বন্ধু। আমেরিকার ‘আইস‘ বাহিনী যেভাবে তাদের ভাষায় অবৈধ, ড্রাগ সরবরাহকারী, সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখে ধরছে, পুকুরে মাছ শিকার করার মত, ইউরোপে তেমনটি ঘটছে না। কিন্তু নীরবে, চুপি চুপি তথাকথিত অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং তাদের ‘ডিপোর্ট‘ করা হচ্ছে নিজ দেশে।
২) সুইডেন! আপাত শান্ত একটি উন্নত ইউরোপীয় দেশ। নোবেল মিউজিয়াম এই দেশে অবস্থিত। নোবেল পুরস্কারের প্রবক্তা আলফ্রেড নোবেলের জন্ম এদেশে, রাজধানী স্টকহোমে। শান্তি সহ ছয়টি বিষয়ে ফি–বছর নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। এই নোবেল পুরস্কারের জন্যে কী না আলোচনা–বিতর্ক। ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছেন এই পুরস্কার পাবার জন্যে। নিন্দুকেরা বলেন, কী দরকার ছিল, এমন করে বেচারা যখন চাইছেন তাকে দিলেই তো হয়, ল্যাঠা চুকে যায়। তাহলে হয়তো উনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট, নিকোলাস মাদুরোকে জঙ্গি স্টাইলে তুলে আনতেন না। গাজায়ও এতো হত্যাকান্ড ঘটতে দিতেন না। বিশ্বজুড়ে এতো অশান্তি হতোনা। বিদেশিদের খেদাও–আন্দোলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেটি পেশী বলে করছেন সেই একই কাজটি অতি সূক্ষ্মভাবে করছে ইউরোপের অতি উন্নত এই দেশটির সরকার। সুইডিশ সরকার ‘ইমিগ্রেশন ক্র্যাকডাউন‘ এমনভাবে শুরু করেছে যার ফলে এই দেশে দীর্ঘ ১৫/২০ বছর ধরে বসবাসকারী অনেক বিদেশির ঘুম এখন হারাম হয়ে গেছে। প্রতিটি মুহূর্তে তাদের আশংকা কখন না জানি সুইডিশ ইমিগ্রেশন পুলিশ দোরগোড়ায় এসে তাদের তুলে নিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয় এবং সেখান থেকে নিজ দেশে। এদের বেশির ভাগকে, পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ধরে ডিটেনশন ক্যাম্পে আনা হয়েছে, অথচ এরা এদেশে অনেক বছর ধরে আছে এবং এদের কাজ ছিল, এরা ভাষা জানে। তেমন একটি পরিবার উজবিকেস্তান থেকে আসা তিন সন্তানের মা, সোফিয়া। লন্ডনের ‘দি গার্ডিয়ান‘ পত্রিকায় স্টোকহোম থেকে পাঠানো মিরান্ডা ব্রায়ান্টের এক প্রতিবেদনে সোফিয়ার করুণ ্ল্লকাহিনী উঠে এসেছে সমপ্রতি। সোফিয়া ২০০৮ সালে এই দেশে আসে এবং একটা সময় ভাষা রপ্ত করে সুন্দর জীবন গড়ে তোলে। কাজ করে স্থানীয় মিউনিসিপাল অফিসে। তার ছেলেমেয়েরা সুইডেনের স্কুলে পড়াশোনা করছে এবং তার সবার ছোট ছেলেটির জন্ম এই দেশে। তার ১৮ বছরের ছেলে, হামজা টেকনিশান হবার লক্ষ্যে একটি কলেজে পড়ছে এবং সে এই দেশের জীবন ব্যবস্থা ছাড়া আর কোন দেশের সাথে পরিচিত নয়। তিন বছর আগে তারা তৃতীয়বারের মত রেফুইজি স্টেটাস পাবার জন্যে আবেদন করলে তা নাকচ করে দেয়া হয়। ফলে সোফিয়া তার কাজ করার অধিকার হারায় এবং এখন প্রতি মুহূর্তে ডিপোর্টেশনের অপেক্ষায় আছে, স্টকহোমের অরলান্ডা বিমানবন্দরের ধারে কাছে একটি ডিটেনটন সেন্টারে। অজানা দিনের আশংকায় দিন গুনছে। সোফিয়া বলেন, ‘আমি ঘুমাতে পারিনা ঠিকমত। মাত্র এক কী দুই ঘন্টা ঘুমাই। আমি জানিনা আমি মানসিক, শারীরিকভাবে কী করবো। সন্তানদের সাথে কথা বলতে পারিনা স্বাভাবিক ভাবে, এমনই আমার টেনশন।‘
৩) সবুজে সবুজে ভরা এই চমৎকার দেশটি এক দশক আগেও এমনটি ছিলনা। বর্তমানে রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় আছে সেন্টার–রাইট সরকার, যারা ক্ষমতায় টিকে আছে ফার রাইট (চরম ডান) সুইডেন ডেমোক্র্যাটস–এর সমর্থনে। এই সরকার চায় সুইডেন ‘শরণার্থী আশ্রয়প্রার্থীদের গ্রহণ করার‘ দেশ থেকে বেরিয়ে এসে ‘লেবার ইমিগ্রেশনের (অভিবাসনের) দেশে‘ পরিণত হোক। বিষয়টি মন্দ নয়, মন্তব্য মোহাম্মদ রাসেলের (আসল নাম নয়)। রাসেল ১৪ বছর ধরে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে বাস করছে। দেশ থেকে মাস্টার্স শেষ করার পর এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করার জন্যে চলে আসে। পড়াশোনার পাশাপাশি রেস্টুরেন্টে, বাংলাদেশি ছোটখাট সুপারশপে পার্টটাইম করে খরচ চালিয়েছে। পড়াশুনা ও এদেশের ভাষা রপ্ত করেছে। পরবর্তীতে দেশ থেকে স্ত্রীকে নিয়ে আসে। বর্তমানে তাদের দু সন্তান। কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। এখন ইউরোপীয় পাসপোর্ট। সেটি পেয়েছে বছর কয়েক আগে। এখন ভালো চাকরি করে। তার স্ত্রীও ভাষা রপ্ত করে চাকরি করছে। এরপর দেশে গিয়ে ঘুরে এসেছে। রাসেলের স্ত্রী তার বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে পারেনি। তখন দেশে গেলে আর ফিরে আসতে পারবে না এই আশংকায়। কারণ তখনও সে তার ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা স্থানীয় পাসপোর্ট কোনোটাই পায়নি। এখন আছে, ফি–বছর দেশে যায়, ঘুরে আসে। সুখেই আছে। কিন্তু এমন সুখ সবার কপালে জোটেনা, জুটেনি। উজবেকিস্তানের সোফিয়ার মতো অনেক নারী–পুরুষ ডিটেনশন ক্যাম্পে অনিশ্চয়তায় তাদের দিন কাটাচ্ছে। গোটা সুইডেনে এই ধরনের ডিটেনশন সেন্টারে বর্তমানে ১১ হাজার শরণার্থী রয়েছে বলে জানা যায়। এই চিত্রই বলে দেয় সুইডেন সরকারের অনুসৃত ‘এন্টি এসাইলাম এন্ড মাইগ্রেশন পলিসির‘ মূল চেহারা।
অবৈধ অভিবাসনকে নিরুৎসাহিত করতে ও ঠেকাতে সামপ্রতিক সময়ে সুইডিশ সরকার যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: আগে এসাইলাম সিকারদের (আশ্রয় প্রার্থনাকারীদের) আলাদা ‘ব্যক্তিগত বাসস্থানে‘ রাখা হতো। এখন তা বাতিল করে কম সুযোগ–সুবিধায় ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়, অনেকের সাথে। নাগরিকত্ব অর্জন ও পারিবারিক পুনর্মিলনের ক্ষেত্রে শর্তাবলী আরোপ কঠোর করা হয়েছে। এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নথিপত্র সরবরাহ করতে হয়। এ ছাড়া সুইডেনে আশ্রয়প্রার্থীদের কেউ যদি কোন অপরাধ করে থাকে তাহলে তাকে ফেরত পাঠানোর আইন চালু করা হয়েছে। অবশ্য এই পদক্ষেপ সে–দেশে বসবাসকারী বিদেশী নাগরিকরা যারা বর্তমানে সুইস নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তারা সাধুবাদ জানান। কেননা তাদের মতে, সোমালিয়ার মত কিছু দেশ থেকে আসা কিছু জনগণ এদেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। তারা নিজেদের এদেশের ভাষা, সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারছেনা এবং সৃষ্টি করছে নানা সামাজিক সমস্যা। ২০১৬ সালের এক তথ্য মতে, সুইডেনে ৭০ হাজারের মত সোমালিয়ান বংশোদ্ভুত নাগরিক স্থায়ীভাবে বসবাস করতো। ইতিমধ্যে সেই সংখ্যা নিঃসন্দেহে অনেক বেড়েছে। সুইডিশ তথ্য মতে, আশির দশকের শেষের দিকে সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় সে দেশের নাগরিকরা সুইডেনে পাড়ি জমাতে শুরু করে। ১৯৯০ সালে সুইডেনে বসবাসের জন্যে মাত্র এক হাজার সোমালিয়ান শরণার্থী আশ্রয় প্রার্থনা করে। সুইডেন সরকারের তথ্য মতে, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে মোট ৪৪০ জনকে অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে সুইডেন থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। সরকারের সোজা কথা, ‘আপনারা যদি এই সমাজের অংশ হতে না চান, তাহলে আপনাদের সুইডেনে আসা উচিত নয়।‘
কী তড়িৎ বদলে গেছে অভিবাসন চিত্র। মাত্র এক দশক আগে, ২০১৪ সালে যখন মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলি থেকে আশ্রয়প্রার্থীরা সুইডেনে আসা শুরু করেছিল তখন তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী ফ্রেডেরিক রেইনফেল্ড সুইডেনবাসীদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘ওপেন ইউর হার্ট‘। অর্থাৎ নবাগতদের স্বাগত জানাও। এখন সে–দিন গেছে। চিরদিনের তরে। কেবল সুইডেনে নয়। গোটা ইউরোপে। হল্যান্ডেও অভিন্ন চিত্র। সামনের বছর সুইডেনে সাধারণ নির্বাচন। কিন্তু ইতিমধ্যে এসাইলাম নিয়ে প্রবর্তিত নীতির কোন পরিবর্তন হবে বলে মনে হয়না। কেননা বিরোধী সেন্টার–লেফট সোশ্যাল ডেমোক্রেটস সহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির এই ব্যাপারে অভিন্ন নীতি। সুইডেনের মূলধারার জনগোষ্ঠী অভিবাসীদের নিয়ে ত্যাক্ত–বিরক্ত। সর্বশেষ এক সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ৮৩.২১২ জন শরণার্থী এদেশে থাকার অনুমতি না পেয়ে নিজ দেশে ফিরে গেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের বছরের তুলনায় আশ্রয়প্রার্থীর (এসাইলাম সিকার্স) সংখ্যা ৩০% ভাগ কমেছে। একই চিত্র উত্তর পাড়ের এই অতি উন্নত দেশ হল্যান্ডেও। এই নিয়ে পরে কোন এক সংখ্যায় লেখা যাবে। (২৯–০১–২০২৬)
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।












