বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, গত জুনে সারা দেশে ৫৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬৩ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৩২৩ জন আহত হয়েছে। সংগঠনটির মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হতাহত এ ঘটনাগুলোর ১৭২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, যা মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এসব বাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৭৩ জনের আর আহত হয়েছে ১৩২ জন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলেছে, তাদের দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
সড়কে নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন বিভিন্ন পরিবহনের চালক, যাদের সংখ্যা ১১১। এছাড়া নিহতদের মধ্যে ৭১ জন পথচারী, ৬০ শিক্ষার্থী, ৪৭ শিশু, ৪৫ নারী, ১১ জন পরিবহন শ্রমিক, ১০ শিক্ষক এবং নয়জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছেন। আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্য, একজন সেনা সদস্য এবং একজন প্রকৌশলীর প্রাণ গেছে এসব দুর্ঘটনায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে রেলপথে ৫৩টি দুর্ঘটনায় ৪৫ জনের মৃত্যু এবং আটজন আহত হয়েছে। আর নৌপথে পাঁচটি দুর্ঘটনায় মারা গেছে পাঁচজন এবং আহত হয়েছে পাঁচজন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে জুনে মোট ৫৯০টি দুর্ঘটনায় ৫১৩ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৩৩৬ জন আহত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কম কথা হয়নি। আলাপ–আলোচনায় সড়ক নিরাপদ করার সমাধানসূত্রও মিলেছে। কিন্তু দিনকে দিন সড়কের মৃত্যুফাঁদ হয়ে ওঠা ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রতিদিনই বাড়ছে সড়কে দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুহার। বাড়ি থেকে বেরুনোর মানুষটির জন্য ঘরের মানুষের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। কারণ, যে সুস্থ মানুষটি সকালে কাজের জন্য পথে বেরুল, সে নিরাপদে ঘরে ফিরবে– তার নিশ্চয়তা নেই। অবস্থা দেখে মনে হয়, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বোধহয় গোড়াতেই রয়ে গেছে গলদ। সড়কে যানবাহন চলাচলের আইন আছে, পথচারীদের জন্যও আছে আইন। কিন্তু তার পরও আমাদের রাস্তায় ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে গাড়ি চালানোর সনদ নেই অধিকাংশ চালকের, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের সংখ্যাও কম নয়। এমনকি নিয়ন্ত্রণে আসেনি সড়ক–মহাসড়কের দুপাশের হাটবাজার, দোকানপাট সাজিয়ে বসাও। ফুটপাথে সুযোগ নেই পথচারীদের চলাচলের। সেখানেও পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। ফলে সড়কের বিশৃঙ্খলাই যেন হয়ে উঠেছে অলিখিত নিয়ম।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে– ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; বেপরোয়া গতি; চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা; অদক্ষতা ও শারীরিক–মানসিক অসুস্থতা; মাদকাশক্তি; বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; তরুণ ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; গাড়ির ছাদে যাত্রী বহন করা; ওভারব্রিজ কিংবা আন্ডারপাস বা জেব্রাক্রসিং থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ব্যবহার না করা; দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে পত্রিকায় বলা হয়েছে, দেশে সবসময়ের মত দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনা ঘটার কারণ বহু আছে। তবে দুর্ঘটনা ঘটার কারণ যে শুধু যে বাস, তা না। সড়কে অটো, সিএনজি, নছিমন, মোটরসাইকেল, পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে। তাই সবার আগে সড়কে এসব গাড়ির নিয়ন্ত্রণ আনাটা জরুরি। আসলে সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। চালকদের যেমন সচেতনতার সাথে গাড়ি চালাতে হবে, ঠিক তেমনি যাত্রী বা সাধারণ মানুষের মাঝেও সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সুপারিশ অনুযায়ী সরকার সড়কে দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন কাজ করেও যাচ্ছে। আমরা আশা করছি সামনে সড়কে দুর্ঘটনা কমে আসবে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হবে, সড়কে মৃত্যু বন্ধ করতে হবে– এ দাবির পক্ষে সোচ্চার হতে হবে প্রতিটি মানুষকে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত যেভাবে দীর্ঘ হচ্ছে, তাকে থামাতে হবে।






