ব্রিটিশ আমলে প্রথমে আইনবিদ বা এডভোকেট তারপর স্বল্পকালীন মুন্সেফ বা বিচারকের চাকরি থেকে নিজ যোগ্যতা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সফল রাজনীতিবিদ, দূরদর্শী শিল্পপতি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম রূপকার হিসেবে যিনি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন, তিনি হলেন মরহুম আবুল কাসেম খান– যিনি আমাদের সবার কাছে এ. কে. খান হিসেবে সমধিক পরিচিত। গত ৩১ মার্চ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী নীরবে অতিক্রান্ত হলো এবং ৫ এপ্রিল তাঁর জন্মবার্ষিকী। ১৯০৫ সালে তাঁর জন্ম । এই সময়টিতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি। চট্টগ্রামের এই কৃতী সন্তানকে আমি পূর্ব পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পায়নের অন্যতম জনক হিসেবে বিবেচনা করি। অনেকেই হয়তো জানেন না, তাঁর কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল একজন এডভোকেট ও বিচারক হিসেবে। বিচারক জীবনে তিনি ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও বিচক্ষণতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজও অনুকরণীয়।
তিনি একটি প্রাচীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে গৌড়ের মন্ত্রী শমশের খানের পুত্র হামজা খানের ভাই শেরবাজ খানের উত্তরপুরুষ হলেন জনাব এ. কে. খান। পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ তাঁর ব্যক্তিত্বকে শৈশব থেকেই দৃঢ় ভিত্তি দেয়। তাঁর পিতা আলহাজ আব্দুল লতিফ খান ছিলেন ফতেয়াবাদের সাব–রেজিস্টার ও একজন শিক্ষিত, মার্জিত ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। মাতা মরহুমা ওয়াহাবুন্নিসা চৌধুরাণী ছিলেন স্নেহশীলা ও আদর্শবান নারী। শিক্ষাজীবনে তাঁর মেধার স্বাক্ষর ছিল অসাধারণ। ফতেয়াবাদ হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন, চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আই.এ.-তে বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন এবং মহসিন বৃত্তি লাভ এসব ছিল তাঁর প্রতিভার প্রাথমিক প্রকাশ। পরে ১৯২৭ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ. (অনার্স), ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি.এল. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান এবং ইংরেজিতে এম.এ. তেও প্রথম শ্রেণি অর্জন তাঁর শিক্ষাগত উৎকর্ষকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। আইনবিদ হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে কর্মজীবন শুরু করলেও তিনি শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের জুনিয়র হিসেবে শিক্ষানবিশী করেন। পরে সিভিল সার্ভিস (বিচার বিভাগীয়) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৩৫ সালে মুন্সেফ হিসেবে যোগদান করেন। বিচারক থাকাকালে বরিশালে এক মামলায় একজন উচ্চপদস্থ শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তি প্রদান করে তিনি ন্যায়বিচারের সাহসী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
১৯৩৫ সালে বার্মায় অবস্থানকারী প্রতিপত্তিশালী বাঙালি ব্যবসায়ী ও তৎকালীন বিখ্যাত বেঙ্গল বার্মা স্টীম নেভিগেশন কোম্পানীর মালিক জনাব আব্দুল বারী চৌধুরীর কন্যা শামসুন্নাহার বেগমের সাথে তাঁর বিবাহ রাজকীয় জাঁকজমকের সাথে সম্পন্ন হয়। ১৯৪৪ সালে তিনি বিচার বিভাগের নিরাপদ ও সম্মানজনক চাকরি ত্যাগ করেন। এই সিদ্ধান্তই ছিলো তাঁর জীবনের সবচেয়ে সাহসী মোড়। দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন তাঁকে ব্যবসায় নামতে উদ্বুদ্ধ করে। শ্বশুর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল বারী চৌধুরীর প্রেরণাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মাত্র কয়েক হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি এ. কে. খান অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময় মুসলমানদের জন্য ভারী শিল্পে প্রবেশ ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘এ. কে. খান জুট মিল’ এ অঞ্চলের শিল্প ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে ওঠে। টেক্সটাইল, ম্যাচ ফ্যাক্টরি, শিপিং, ডকিং ও চা শিল্প প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সাফল্য আমাকে বিস্মিত করে। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তাঁর মন্ত্রিত্বকাল পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পায়নের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বিষয়ে তাঁর দূরদর্শিতা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম অঙ্গীকার। চট্টগ্রামে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ ভবন এ. কে. খান ফাউন্ডেশনের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত। যা একজন আইনের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে বিশেষভাবে গৌরবের বিষয়।
এ. কে. খান ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে ভারতীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হলেও কায়েদে আজমের নির্দেশে তাতে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আইন সভার সদস্য হন। ১৯৫৮ সালে পাক প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের মন্ত্রী সভায় যোগদান এবং শিল্প, পূর্ত, সেচ, বিদ্যুৎ ও খনিজ বিভাগের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন এবং ১৯৬২ সালে পদত্যাগ করেন । ১৯৬২ সালের সংবিধান রচনা ও মূল্যায়নেও তাঁর অবদান রয়েছে। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলীয় সদস্য হন। বিদ্যুৎ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়ে পাক–ভারতের মধ্যে সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন হয় । শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বস্ত্র ও পাট শিল্পের দ্রুত প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ এবং দেশের দু‘অংশের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের প্রয়াস চালানো হয়। এখানে চট্টগ্রাম ইস্পাত কারখানা, কর্ণফুলী রেয়নমিল স্থাপন করেন। তৎকালীন সরকারের বৈষম্য নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ঢাকায় পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপনের প্রস্তাব প্রদান করেন । যাতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন এখানে বসতে পারে এবং অধিবেশনকালে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ এখানে চলতে পারে। এ প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ঢাকায় শেরে বাংলা নগর স্থাপন হয়। তাঁর মন্ত্রী থাকাকালে পূর্ব পাকিস্তান শিল্প গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা, বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন ও পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক স্থাপিত হয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার সঙ্কট নিরসনে রাজনৈতিক সমাধানের আশায় এয়ার মার্শাল আসগর খানের তেহরিকে ইশতেকলাল পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দান করেন ।
ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তাঁর অবদান আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ১৯৭১ সালে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার ইংরেজি খসড়া প্রস্তুতে তাঁর ভূমিকার কথা বহু সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। সূত্র:- বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: পঞ্চদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা –১৯১। দেশের সংকটময় সময়ে তাঁর দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ ছিল অসাধারণ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মৃত্যুর মাত্র একদিন পূর্বে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের ৩০% শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্ম ও জনকল্যাণে দান করার জন্য উইল করে যাওয়া তাঁর মানবিক মহত্ত্বের সর্বোচ্চ উদাহরণ। আমি মনে করি, এখানেই তিনি অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি ব্যক্তির জন্য নয়, জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ৫৬ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে তাঁর সহধর্মিণী শামসুন্নাহার বেগম ২৮ শে জানুয়ারি, ১৯৯১ মৃত্যুবরণ করেন। তিনি স্ত্রীর অনুপস্থিতি বেশিদিন সহ্য করতে পারেননি । ১৯৯১ সালের ৩১ মার্চ এই মহান কর্মবীর ইন্তেকাল করেন।
ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁকে চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদে জুমার নামাজে অংশ নিতে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। লেখক ও সাংবাদিক হেলাল হুমায়ুন ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁর পুত্র সাবেক মন্ত্রী ও এমপি জহির উদ্দিন খান এবং শাহী জামে মসজিদ মুসল্লি পরিষদের সভাপতি আলহাজ্ব সালাউদ্দিন কাসেম খান সাহেবের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার সূচনা ঘটে। যা আমার জীবনের এক মূল্যবান স্মৃতি। আমি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি তিনি যেন মরহুম এ. কে. খানের সকল উত্তম কাজ কবুল করেন এবং তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমীন।
তথ্যসূত্র: এ. কে. খান স্মারক গ্রন্থ, সম্পাদনায় সাংবাদিক হেলাল হুমায়ুন।
লেখক : আইনবিদ, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।














