মানুষের স্বাধীন সত্তার আকাঙ্ক্ষার হয়ত তখনই উন্মেষ ঘটে যখন সে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে যুথবদ্ধ জীবন যাপন আরম্ভ করে। এখানে তথা ঐ নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রকৃতি, পরিবেশ, খাদ্যাভাস, রীতিনীতি, সংস্কৃতি পরবর্তীতে নৃতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় চেতনাবোধ হয়ত মানুষকে তার সেই নির্দিষ্ট অঞ্চলের একটি অবাধ নিরোপদ্রোপ নিঃস্পেষণ শোষনহীন যুথবদ্ধ জীবন গঠনে তাড়িত করেছে। এই তাড়নাই হয়ত মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে উজ্জীবিত করে।
আমাদের এই জনপদ তথা দেশও এই উদ্বুদ্ধ উজ্জীবিত আর উদ্দীপ্ত হওয়া থেকে ব্যতিক্রম নয়। বাঙালি তার হাজার বছরের ইতিহাসে নানা সংঘাত সংগ্রামে আর স্বাধীনতা অর্জনের কাঙ্ক্ষিত অভিযাত্রায় জীবন উৎসর্গ করে এসেছে অবিরাম। তার পরও স্বাধীনতার সোপানে পৌঁছাতে বাঙালি জাতিকে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে হাজার বছর। এর মাঝে শক্রর ষড়যন্ত্রে অত্যাচার অনাচারে তার অভিপ্সার স্বাধীনতা নয় শুধু তার সব কিছুর উপর আঘাত এসেছে, সময়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে বাঙালি জাতির অস্তিত্বও।
সৈয়দ শামসুল হকের নুরুলদীনের কথা মনে পড়ে যায়, কবিতায় প্রচণ্ড মনোবেদনা নিয়ে কবি সেই দৃশ্যপট নির্মাণ করেছেন এক অপূর্ব দ্যোতনায় একই সাথে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণে ডাক দিয়েছেন মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে অকুতোভয় নুরুনদীনের ফিরে আসার।
নুরুলদীনের কথা মনে পড়ে যায়, এ সৈয়দ শামসুল হক বাঙালির অমানিষার কালকে এভাবেই চিত্রিত করেছেন,
“নষ্ট ক্ষেত, নষ্ট মাঠ, নদী নষ্ট, বীজ নষ্ট
বড় নষ্ট যখন সংসার
আবার নুরুরদীন একদিন আসিবে বাংলায়
আবার নুরুলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক, জাগো বাহে কোনঠে সবাই
নুরুলদীন, তিতুমীর, হাজি শরীয়ত, সূর্যসেনদের ডাকে এই জনপদের মানুষ বর্শা, বল্লম, ব্যাটন বেয়নেট আর গুলি বুক পেতে নিয়ে একটি নিজস্ব স্বাধীন র্সা্বভৌম সত্তা প্রতিষ্ঠায় প্রাণ উৎসর্গ করেছেন।
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় এই আত্মদানের যুপকাষ্টের কথা ভেবে কবি শামসুর রাহমান র্আতনাদের কন্ঠে উচ্চারণ করেন,
“তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা
আর কতবার দেখতে হবে খান্ডব দাহন
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
কবি শামসুর রাহমানের এই হৃদয়ছোঁয়া আর্তনাদের কালে তার মানসপটে নিশ্চিতভাবে ভেসে উঠেছে ৪৭ এ অজস্্র মানুষের রক্ত স্রোতে ভারত পাকিস্তানের বিভক্তি। ৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য বাঙালির অকাতরে প্রাণদান, ৬২ সালে শিক্ষার অধিকার দাবিতে, ৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনে, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে এ জনপদের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মদানের ছবি।
এই খান্ডব দাহন এই রক্তগঙ্গায় অবগাহন করে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পাদপ্রদীপের আলোয় এসে দাঁড়ায়। ৭১ এর সেই ক্রান্তিকালে, ইতিহাসের সেই অমোঘ সন্ধিক্ষনে স্বাধীনতা শব্দটি কিভাবে আমাদের হল তার অপূর্ব ঐতিহাসিক পটভূমি কবি নির্মলেন্দু গুন তাঁর “স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হল” কবিতায় অপূর্ব দ্যোতনায় তুলে ধরেছেন এইভাবে,
“শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে
রবীন্দ্রনাথের দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জন সমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা, কে রুখে তার বজ্রকন্ঠ বাণী ?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতা খানি
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।
কে রুখে তার বজ্রকন্ঠ বাণী? কেউ রুখতে পারেনি। সেই বজ্রকন্ঠের আহবান কৃষক শ্রমিক ছাত্র জনতাকে যেমন হ্যামিলনের বংশীবাদকের মত টেনে নিয়েছিল স্বাধীনতার জন্য বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে, তেমনি চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, জয়দেবপুরে ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং যশোহরে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ঝাপিয়ে পড়তে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত, উদ্বুদ্ধ করেছিল। এরই পাশাপাশি ই পি আর, পুলিশ বাহিনী মাতৃভূমির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রাবাল্যে জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য মন্ত্রে রণাঙ্গনে জীবনকে বাজি রেখেছিলেন।
সর্্বোপরি আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে কারখানার শ্রমিক, গ্রামের কৃষক, খেটে খাওয়া দিনমজুর, ছাত্র জনতা জীবন দিয়ে জীবন জয়ের উৎসব উৎস্বর্গে মেতে উঠে। আত্ম–উৎসর্গের সেই উন্মাতাল সময়ে বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী উপাখ্যান রচনায়–
যে কৃষক ক্ষেতে ফসল রেখে গোয়ালে হালের বলদ লাঙ্গল জোয়াল রেখে আসছি বলে যুদ্ধের মাঠে গিয়ে আর ফিরেনি–
যে শ্রমিক কারখানার আগুন চোখে হানাদারদের মুখামুখি হয়ে লড়তে লড়তে মহাকালের কোলে ঢলে পড়েছে–
যে ছাত্র/যুবক মা বাবার দোয়া নিয়ে যুদ্ধে গিয়ে জীবনের অনাগত অনেক বসন্তকে জাতির জন্য উৎসর্গ করেছে–
যে সৈনিক নিঃশ্চিত নিরাপদ জীবন ছেড়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনে উৎসর্গীকৃত–
এইসব বীরদের জীবনদানের প্রেক্ষাপটকে কবি শামসুর রহমান চিত্রিত করেছেন এইভাবে,
“শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাংক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে
…………….
ছাত্রাবাস বস্তি উজার হল। রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র দানবরূপী ট্যাংক আর সেই খই ফোটানো মেশিন গানের সামনে বুক পেতে দেওয়া লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এই স্বাধীনতা। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের এই মাহেন্দ্রক্ষণে রবীন্দ্রনাথের অমর শব্দাবলীতে রচিত সেই অঝোর ধারার প্রশ্ন জাতির সামনে পুনরাবৃত্তি করছি–
“ বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা
এর যত মূল্য সেকি ধরার ধূলায় হবে হারা?
লেখক : প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,
সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক











