ঈদ আসছে শুনলেই স্বপ্নের বুকের ভেতর কেমন যেন ঢিপঢিপ করে ওঠে। স্কুলের ক্লাসে বসে থাকলেও তার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা– কবে বাড়ি যাবে!
স্বপ্ন বাবা–মায়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে থাকে। কিন্তু তাদের আসল বাড়ি গ্রামের ভেতর, সবুজ মাঠের শেষে নদীর ধারে। দাদা–দাদি, চাচাতো ভাইবোন সবাই থাকে সেখানে। ঈদ মানেই বাড়ি যাওয়া।
ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকেই স্বপ্ন গুনগুন করে– “ও মোর রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”।
মা হেসে বলেন, “বাড়ি যাওয়ার সময়ই আনন্দটা বোঝা যাবে!”
যাওয়ার দিন ভোরে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়াতেই বোঝা গেল, শুধু স্বপ্নের পরিবারই না, পুরো শহর যেন বাড়ি যাচ্ছে। লম্বা লাইন, ঠাসাঠাসি ভিড়, গরম আর হর্নের কানফাটা শব্দ।
বাসে উঠে স্বপ্ন একটু বিরক্তি নিয়ে বলল, “আহা, এত ঝক্কি ঝামেলা! না গেলেই হতো!”
বাবা হেসে বললেন, “দেখো, বাড়ি পৌঁছালেই সব কষ্ট ভুলে যাবে।”
বাস থেকে নেমে আবার রিকশা, তারপর নৌকা। নদীর বাতাস এসে মুখে ঝাপটা দিতেই স্বপ্নের মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল। দূরে সবুজ মাঠ, তালগাছ, আর গ্রামের মসজিদের মিনার দেখা যাচ্ছে। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই দাদি ছুটে এলেন, “স্বপ্ন আইছে! স্বপ্ন আইছে!”
দৌড়ে গিয়ে দাদির গলা জড়িয়ে ধরলো সে। মনে হলো, এটাই তো আসল আনন্দ।
গ্রামের ঈদ আলাদা। চাঁদ রাতেই উঠোনে পাটি পেতে সবাই মিলে সেমাই ভাজা, নতুন কাপড় গুছিয়ে রাখা, আর ছোটরা মিলে লুকোচুরি খেলা।
স্বপ্ন আর তার চাচাতো ভাই সামি ঠিক করল, ঈদের দিন নামাজ শেষে কে বেশি সালামি পায় সেটা দেখবে।
ঈদের সকালে মসজিদে যাওয়ার পথে স্বপ্ন ভাবছিল, শহরে এমন খোলা আকাশ তো দেখা যায় না। নামাজ শেষে সবাই কোলাকুলি করল। স্বপ্নের পকেট ধীরে ধীরে ভারি হতে লাগল সালামিতে।
দুপুরে দাদি রান্না করলেন গরুর মাংস, পোলাও আর পায়েস। স্বপ্ন এত খেয়েছে যে হাঁটতেই কষ্ট হচ্ছিল। সন্ধ্যায় সবাই মিলে নদীর ধারে বসে গল্প করলো। দাদা পুরোনো দিনের ঈদের কথা বললেন– কীভাবে একসময় নৌকায় করে হাটে যেতেন।
ছুটির দিনগুলো সহসাই যেন উবে গেল। হঠাৎই মা বললেন, “কাল সকালে ফিরতে হবে।”
স্বপ্নের মনটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। সে চুপচাপ উঠোনে গিয়ে বসে রইলো। সামি এসে বলল, “মন খারাপ করছিস কেন, আবার তো আসবি!”
স্বপ্ন মাথা নাড়ল। কিন্তু তার বুকের ভেতরে কেমন যেন খালি খালি লাগছিল।
ফেরার দিন আবার সেই ভিড়, সেই কষ্ট। বাসে বসে সে গজগজ করে, “যাতায়াতে এতো কষ্ট, কান ধরছি আর বাড়ি যাবো না”
মা মুচকি হেসে বললেন, “এই এক কথাই তো প্রতি বছর বলো।”
শহরে ফিরে আবার স্কুল শুরু হলো। পড়া, কোচিং, ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে দিন কেটে যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে স্বপ্নের মনে পড়ে দাদির হাসি, নদীর বাতাস, উঠোনের গল্প।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে সে মাকে জিজ্ঞেস করল, “মা, আমাদের আসল বাড়ি কোনটা?”
মা একটু অবাক হয়ে বললেন– “কেন?”
স্বপ্ন ধীরে ধীরে বলল– “তোমাকে না দেখলে কেমন যেন লাগে! যেখানেই থাকি তোমার কাছে ছুটে আসি মা। আমরা শহরে তো থাকি, কিন্তু গ্রামের বাড়িতে গেলেই মনে হয় ওটাই আসল বাড়ি। বাড়িটাও কি আমাদের মা?”
মা স্বপ্নকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “বাড়ি শুধু ইট–পাথরের জায়গা না। যেখানে ভালোবাসা আছে, যাদের জন্য মন টানে– সেটাই তো বাড়ি।”
স্বপ্ন চুপ করে রইল।
সত্যিই তো। যতই কষ্ট হোক, ঈদ এলে মন টানে। দাদির ডাক, সামির সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, নদীর হাওয়া– সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত টান।
কয়েক মাস পর আবার রমজান এলো। চাঁদ দেখার রাতে স্বপ্ন ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদটা যেন মুচকি হেসে বললো– “চলো, আবার বাড়ি যাই।”
স্বপ্ন ভেতরে ভেতরে হাসল। সে জানে, এবারও বাড়ি যাবে। কষ্ট হবে, ভিড় হবে, তবু যাবে। কারণ সে বুঝে গেছে– বাড়ি মানে শুধু একটা জায়গা না, বাড়ি মানে দাদির কোলে মাথা রাখা, নদীর বাতাস, আর সবার সাথে মিলেমিশে থাকা।
আর ঈদ মানেই সেই ভালোবাসার কাছে ফিরে যাওয়া।






