প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য সার্বিক পুষ্টিমান খাদ্যের মাধ্যমে পুষ্টির যোগান শিশুদের ঝরে পড়া রোধ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সম্প্রতি সরকার সারা দেশে ১৫০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা মূলক স্কুল ফিডিং প্রকল্প চালু করেছে। বিগত সরকারও স্কুল ফিডিং নিয়ে নীতি নির্ধারকদের বয় বাবুর্চি নির্বাচন শিক্ষার্থীর মা’দের স্কুলে এসে পালাক্রমে রান্না করা বিদেশ গিয়ে কর্মকর্তাদের রান্নার উপর প্রশিক্ষণ কত তেলেসমাতি কর্মকাণ্ড শুরু করেছিল বেলা শেষে সব পণ্ড। হুজুগে বাঙালি বলে আমাদের একটি অপবাদ আছে সব কিছুর পরিবর্তন হয় কিন্তু এ অপবাদ থেকে আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে তো পারিনি বরং প্রতিটি কাজে হুজুগের তকমার সার্থকতা প্রমাণ করছি। আমাদের দেখতে হবে যে প্রকল্পটি চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে শিশুদের পুষ্টির জোগান ও ঝরে পড়া রোধে আদৌ সেটা আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য কিনা। বর্ণিত সমস্যার সমাধান কি এটাই। স্থান কাল পাত্র ভেদে যাচাই বাছাই না করে হুট করে একটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার পর দেখা যায় মাঝপথে তা মুখথুবড়ে পড়েছে। এ রকম দৃষ্টান্ত অনেক। বিশ্বে অনেক রাষ্ট্র রয়েছে যুদ্ধ বিগ্রহ রাজনৈতিক অস্থিরতা খরা নানা কারণে চরম দারিদ্র্যতার সীমার নিচে বসবাস আবার ভারত পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তির দেশ হলেও ভারতের অনেক প্রদেশে এখনো শিক্ষা সভ্যতার ছোঁয়া লাগেনি বাংলাদেশে হাওড় বাওড় চরাঞ্চল পার্বত্য এলাকা রয়েছে যাদের জীবন মান অনুন্নত ঐ সব এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। একটি দেশের ক্ষুদ্রাংশের জন্য গৃহীত কোন কর্মসূচি বা প্রকল্প সারা দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে তা যুক্তি যুক্ত নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অপূর্ণতার শেষ নেই যা শিক্ষার মৌলিক চাহিদা খাদ্য আর পুষ্টি শিক্ষার উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় নয়।শিক্ষক সমাজের দাবি দাওয়া নিয়ে যখন শিক্ষকেরা রাজপথে পুলিশের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী আর পরম সম্মানিত শিক্ষক এক হয়ে যায় যে পুলিশ সন্ত্রাসী আর শিক্ষককে একই মানদণ্ডে নির্ণয় করে সে দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নে হাজারো প্রেসক্রিপশান কোন কাজে আসবে না এ বাস্তবতা নীতি নির্ধারকেরা যতই পাশ কাটিয়ে যাবে জাতির শিক্ষা সম্পর্কিত সমস্যা দীর্ঘায়িত হতেই থাকবে। জাতির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করে তাদের পরামর্শ মতামত আমলাদের কাছে পাত্তা হীন কাগজে–কলমের অভিজ্ঞতা আর শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা পার্থক্য অনেক। যুক্তি থাকতে পারে পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রে স্কুল ফিডিং চালু আছে সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই তর্কের স্বার্থে যদি বলা হয় সেসব রাষ্ট্রে শিক্ষকেরা রাজপথে আন্দোলন করতে হয় না, শুধু পুলিশ নয় শিক্ষক সর্বত্র সর্বজন শ্রদ্ধার পাত্র, ঐসব রাষ্ট্রে দুর্নীতি নেই, হয়রানি নেই, অবসরকালীন অর্থের জন্য ৪/৫বছর দুয়ারে দুয়ারে ঘুরাঘুরি করে সেন্ডেল ক্ষয় করার নজির নেই, কাজ আটকিয়ে কন্ট্রাক করে ঘুষ নেয়ার দৃষ্টান্ত নেই। সে দেশে এগুলো যারা নিয়ন্ত্রণ করে আমরা তো তাদের মত চরিত্রবান হতে পারিনি শুধু তাদের নিয়মটা দেখলে হবে না নিয়মটা যারা বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করে তাদের চরিত্রও দেখতে হবে শুধু অন্য দেশের দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য যথেষ্ট নয় তাদের পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতার সাথে আমাদের পার্থক্য রয়েছে। দেশে যেকোন প্রকল্প গ্রহণে লুটপাট করার সুযোগ থাকলে সেটা যদিও জাতির জন্য ক্ষতিকর তবু চাপিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি অনেক পুরানো। স্কুল ফিডিংও সেই সংস্কৃতি চর্চার একটি। যে দেশে ভেজাল মানহীন খাদ্যে জনস্বাস্থ্য প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন মানুষ নানা দুরারোগ্যে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু খাদ্য সম্পূর্ণ অনিরাপদ, বিশুদ্ধ পানির অভাব, উচ্চ মূল্যেও ভেজাল মুক্ত খাদ্যের গ্যারান্টি নেই সেখানে স্কুল ফিডিং প্রকল্প জাতীয় পর্যায়ে কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
বরং এর চেয়ে ভেজাল মুক্ত খাদ্য স্বল্প মূল্যে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য বাজারে সহজলভ্য নিশ্চিত করা অধিক ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করি। দেশে সরকারি প্রকল্পের কাজ ঠিকাদারের মাধ্যমে হয়ে থাকে। হাসপাতালে রোগীর পথ্য, দুধ, কলা, রুটি, ডিম সরবরাহ করা হয়। এক কেজি দুধে দশ কেজি পানি, বাজারের কমদামী কলা, মানহীন রুটি, পঁচা ডিম নিয়মিত রুগীদের দেয়া হয় রুগীর ক্ষেত্রে যদি এমন করা হয় স্কুলে ফিডিং সরবরাহে যে স্বাস্থ্য সম্মত পুষ্টিকর খাদ্যের মান বজায় থাকবে এ দেশে সেই নিশ্চয়তা আছে কি? বিগত সরকারের রাউজানের এম পি স্বউদ্যোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করেছিল। প্রতি স্কুলে বিস্কুট রুটি বনরুটি কেক শিক্ষার্থীদের বিতরণ করা হত। ঐ সব খাদ্য প্রথম কয়েক দিন খেয়ে থাকলেও পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা ওগুলো নিয়ে খেলা খেলত। মানহীন বলে তারা খেতে অনীহা প্রকাশ করত। এভাবে কিছু দিন চলার পর সে প্রকল্প চালু রাখা সম্ভব হয়নি। স্কুল ফিডিং বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পড়ালেখার স্বাভাবিক কার্যক্রমের উপর বিরুপ প্রভাব পড়বে এ খাতের বরাদ্দ সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার মৌলিক চাহিদার উন্নয়নে সমন্বয় করলে পুষ্টি ও শিক্ষার মানোন্নয়নে সর্বজনীন সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক














