সাম্যের লড়াইয়ের মাশুল গুনতে হয় বেঁচে যাওয়া সৈনিকদের

এরিন হেইন্স, ভাবানুবাদ: নিগার সুলতানা | শনিবার , ৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ

ক্ষমতার দম্ভের মুখে সত্য উচ্চারণে নারীদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ডলোরেস হুয়ের্তা দীর্ঘকাল ধরে একজন অগ্রণী যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সিজার চাভেজকে নিয়ে তার দীর্ঘ নীরবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যেকোনো বড় আন্দোলনে টিকে থাকার জন্য নারীদের কত বড় মূল্য চুকাতে হয়।

কয়েক দশক ধরে ডলোরেস হুয়ের্তা এমন একটি গোপন সত্য লুকিয়ে রেখেছিলেন যা প্রকাশ পেলে তার প্রিয় আন্দোলনটি টিকবে না বলে বিশ্বাস করতেন: আর তা হলো, খোদ সিজার চাভেজের হাতে তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। যে কৃষক শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হুয়ের্তা তার জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছিলেন, চাভেজ ছিলেন সেই আন্দোলনের এক অবিসংবাদিত মহীরুহ।

গত বৃহস্পতিবার ‘ল্যাটিনো ইউএসএ’র মারিয়া হিনোজোসাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুয়ের্তা বলেন, সে সময় বিশ্বাস করতাম মুখ খুললে আন্দোলনটি তার প্রাথমিক পর্যায়েই শেষ হয়ে যেত। এটি ছিল আমার ব্যক্তিগত বেদনা, আমার ব্যক্তিগত বোঝা। আর আমি এও বিশ্বাস করতাম (আন্দোলনের জন্য) এই ত্যাগ সার্থক। নিউইয়র্ক টাইমসে চাভেজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর এটিই ছিল হুয়ের্তার প্রথম সাক্ষাৎকার। অনেক মানুষের কাছে বিশেষ করে নারীদের কাছে হুয়ের্তার উচ্চতা চাভেজের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। টাইমসের সেই তদন্তে নারী ও শিশুদের ওপর পদ্ধতিগত নির্যাতনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে ভুক্তভোগীদের তালিকায় হুয়ের্তার নাম থাকাটা পুরো ল্যাটিনো ও চিকানো সমপ্রদায়ের জন্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।

হুয়ের্তা দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতার দম্ভের মুখে নারীদের সত্য উচ্চারণে উদ্বুদ্ধ করে এসেছেন। কিন্তু চাভেজকে নিয়ে তার এই দীর্ঘ নীরবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যেকোনো আন্দোলনে টিকে থাকার জন্য নারীদের কত বড় মূল্য চুকাতে হয়; প্রগতির পথে তাদের ব্যক্তিগত ত্যাগ কতটা বিশাল হতে পারে। অনেক সময় সাম্যের লড়াইয়ের মাশুল গুনতে হয় তাদেরই।

১৯৬০এর দশকে এবং তার পরবর্তী কয়েক দশকেও হুয়ের্তা জানতেন যে, মুখ খোলার অর্থ হলো ন্যায়বিচার, সমতা এবং যাদের সম্মানের জন্য তিনি লড়ছেন, সেই পুরো আন্দোলনটিকেই লাইনচ্যুত করে দেওয়া। তাছাড়া হয়তো তখন মুখ খুললেও বিশেষ কিছু হতো না: কারণ অতি সমপ্রতি নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কোনো জায়গা ছিল না এবং অভিযুক্ত পুরুষদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ঘটনা ছিল বিরল।

হুয়ের্তা বলেন, তার (চাভেজের) এমন একটি অন্ধকার দিক ছিল, তা জানা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু এটি আরও বড় একটি বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে। তা হলো আমাদের সমাজে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব। এই ধরনের আচরণ আমরা যতটা স্বীকার করতে চাই, তার চেয়েও অনেক বেশি প্রচলিত। পুরুষরা সবসময়ই পার পেয়ে যায়, আর এটাই আমাদের মোকাবিলা করতে হবে।

আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে যে পুরুষেরা সবসময় পার পেয়ে যায়

হুয়ের্তার এই কাহিনীটি এমন এক সময়ে সামনে এল যখন হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলনের যুগ। এই আন্দোলন ভুক্তভোগীদের জন্য তাদের গল্প বলার এবং বিশ্বাসযোগ্যতা পাওয়ার এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা এক দশক আগেও ছিল না। তা সত্ত্বেও, নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যখন হুয়ের্তাকে এই অভিযোগগুলো নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন তিনি বেশ অনিচ্ছার সাথেই নিজের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন।

হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা তারানা বার্ক বলেন, যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার গল্পগুলো এমনকি যে পুরুষদের আমরা বীর হিসেবে দেখি তাদের বিরুদ্ধেও। আজকাল মানুষ অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারে। তারা এখন বুঝতে শিখছে যে, লিঙ্গভিত্তিক এবং যৌন সহিংসতা আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কতটা গভীরভাবে গেঁথে আছে।

বার্ক আরও বলেন, এর সাথে ক্ষমতার এক নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। ক্ষমতাকে অপব্যবহার করার এই ধরনটিই সবখানে ধ্রুব সত্য হিসেবে দেখতে পাবেন। কল্পনা করুন, যার বয়স প্রায় ৯৬ বছর এবং অসংখ্য মানুষের কাছে সাহসের এক মূর্ত প্রতীক, তাকে এমন একটি সত্য বয়ে বেড়াতে হয়েছে। এটি যেমন অসহনীয় ভারাক্রান্তকর, তেমনি এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনাও বটে।

হুয়ের্তার প্রজন্মের নারী সহযোদ্ধাদের একটি কঠিন পছন্দ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল: আপনি কি নিজের জন্য ন্যায়বিচারের লড়াই করবেন, নাকি আপনার সমপ্রদায়ের জন্য লড়বেন? হুয়ের্তা তার আন্দোলনের প্রতি দায়বদ্ধতাকেই বেছে নিয়েছিলেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই অনুসন্ধানটি প্রথমবারের মতো সেইসব নারীদের গল্পও তুলে ধরেছে যারা সিজার চাভেজের বিরুদ্ধে ছোটবেলায় প্রলুব্ধ ও নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন। হুয়ের্তা সেইসব নারীদের সাহসিকতাকে স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, তাদের সাহসই আমাকে মুখ খোলার শক্তি জুগিয়েছে।

হুয়ের্তা আক্ষেপ করে বলেন, মানুষ সবসময় সব কিছু বোঝে না। তারা হয়তো উল্টো নারীদেরই দোষারোপ করে বা তাদের দিকেই প্রশ্ন তোলে। কারণ চাভেজকে একজন জিনিয়াস বা প্রতিভাধর এবং বহু মানুষের অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা হিসেবে দেখা হতো।’

ল্যাটিনো ইউএসএ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হুয়ের্তা প্রকাশ করেন যে, তিনি এই নির্যাতনের বিষয়ে কখনোই চাভেজের মুখোমুখি হননি। চাভেজ ১৯৯৩ সালে ৬৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

তারানা বার্ক ২০০৬ সালের আগে এই আন্দোলন শুরু করেননি, কিন্তু নারীদের ওপর বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রকৃত হিসাবনিকাশ বা ‘রেকোনিং’ শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে এটি শুরু হয়, যা ছিল হলিউডের ক্ষমতাধর প্রযোজক হার্ভে ওয়াইনস্টাইনকে নিয়ে। খুব দ্রুত এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রভাবশালী পুরুষরা অভিযুক্ত হন এবং কেউ কেউ পরিণতির মুখোমুখিও হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই আগে সমাজে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেন। ২০১৮ সালে, লক্ষ লক্ষ আমেরিকানের প্রিয় ব্যক্তিত্ব অভিনেতা বিল কসবি গুরুতর অশোভন আচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন, যদিও পরবর্তীতে সেই সাজা বাতিল করা হয়। এই সপ্তাহেই তার এক অভিযোগকারীকে সিভিল জুরি ১৯ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রায় দিয়েছে।

তবে হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলন গতি পাওয়ার সাথে সাথে কিছু অভিযোগকারী ন্যায়বিচার পেলেও, অনেক নারীকেই মুখ খোলার কারণে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সবসময় কিছু প্রশ্ন তোলা হয়: কেন এখন? এত বছর পর একজন বীরকে কেন টেনে নামানো হচ্ছে? আগে কেন কিছু বলেননি? বার্ক বলেন, এমনকি কোনো ক্ষতি থেকে বেঁচে ফেরার পরেও নারীদের তাদের কথা বলার সিদ্ধান্তকে ডিফেন্ড করতে হয় বা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয়।

হুয়ের্তা ‘ল্যাটিনো ইউএসএ’কে বলেন, নারীরা যখন এগিয়ে আসে, তখন সমর্থনের বদলে প্রায়ই তাদের আক্রমণ করা হয় বা বিশ্বাস করা হয় না। ইতিহাসজুড়ে আমরা এটাই দেখে এসেছি। তিনি আরও যোগ করেন যে, কোনো সমালোচনা আসলে তিনি তা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।

বার্কের মতে, সে সময় এবং বর্তমান সময়ে হুয়ের্তার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে একজন ‘সারভাইভার’ বা লড়াকুর ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবেই আমাদের বিবেচনা করা উচিত।

তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি না যে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য মানুষকে জনসমক্ষে তাদের গল্প বলতেই হবে। তিনি হয়তো সারা জীবন এটি প্রকাশ না করেই পার করে দিতে পারতেন এবং সেটিই ছিল তার অধিকার। এখন যেহেতু গল্পটি সামনে এসেছে, এটি অনেকের উপকারে আসবে। কিন্তু আমাদের এটাও স্বীকার করতে হবে যে এটি হয়তো এমন কিছু ছিল যা তিনি কখনোই সবার সাথে শেয়ার করতে চাননি।

এই সত্যগুলো বার্ককে তার নিজেকে একজন সারভাইভার হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতার কথা ভাবিয়ে তুলেছে। নিজের শক্তি এবং সাহসের জন্য নন্দিত হওয়া সত্ত্বেও, বার্ক এই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হন যে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই পরিচিতি পেয়েছেন তার জীবনের ঘটে যাওয়া সব থেকে খারাপ ঘটনার জন্য। একজন নারীর ট্রমাকে বা যন্ত্রণাকে জয়ে রূপান্তরিত করার ক্ষমতাকে উদযাপন করতে গিয়ে অনেক সময় তার পেছনের সেই ভারী বোঝাটি আড়ালে পড়ে যায়।

বার্ক আরও বলেন, সময়ের সাথে সাথে এমন আরও অনেক গল্প সামনে আসবে। এবং এটি কেবল আন্দোলনের বিষয় নয়, বরং এটি প্রতিটি আন্দোলনের জন্য একটি আত্মজিজ্ঞাসা বা আত্মসমীক্ষার ডাক। এটি কেবল এই আন্দোলনের জন্য অনন্য নয়। মানুষ সবখানেই এমনটা করে থাকে।

ইতিহাসজুড়ে হুয়ের্তার মতো নারীরা তাই বয়ে বেরিয়েছেন, সেই ক্ষতি, সেই নীরবতা এবং সেই চরম মূল্য।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে উঠে আসা এই গল্পগুলো আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, বরং এই গল্পগুলো দিয়েই আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছে এবং টিকে আছে। বর্তমান সময়টি তারই এক স্বীকৃতি।

এটি ক্ষমতার সাথে চলমান এক বোঝাপড়ার অংশ। ক্ষমতা কী রক্ষা করে, আর যারা আমাদের সবার জন্য লড়াই করে, সেই নারীদের কাছে ক্ষমতা আসলে ঠিক কী দাবি করছে?

পূর্ববর্তী নিবন্ধসৌদি আরবে নারী শ্রমিকের সম্ভ্রম ও আমাদের দায়বদ্ধতা
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম দরবারে ছুফী বৈঠক সোমবার