সাধুমিত্রা বড়ুয়া : নিভৃতচারী মহীয়সী শিক্ষক

জসিম মুহাম্মদ রুশনী | শুক্রবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ

উত্তর চট্টলার জনগুরুত্বসম্পন্ন জনপদ হাটহাজারীর কোলাহলপূর্ণ গ্রাম মির্জাপুর। সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির এই উজ্জ্বল পল্লীর নিভৃত এক কোণায় বড়ুয়া পাড়ার সিকদার বাড়ি। এই বাড়িতে ১৯৮০ সালের ২০ জুন সেনা জওয়ান অরুণ কুমার বড়ুয়ার জীবনসঙ্গিনী হয়ে প্রবেশ করেছিলেন বাঁশখালীর জলদি গ্রামের বিশ্বাম্ভর বড়ুয়ার আদরিনী কন্যা সাধুমিত্রা। লাজনম্র যুবতী বধু রূপে সিকদার বাড়ি আলোকিত করেছিলেন যিনি, তিনি ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি পুরো মির্জাপুরকে বিষাদের ছায়ায় ঢেকে দিয়ে আকাশের তারা হয়ে গেলেন।

বাঁশখালী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর জলদিতে মমতা বড়ুয়ার কোল জুড়ে এসেছিলেন ১৯৫৭ সালের ১২ মে। নিয়মিত বিদ্যাশিক্ষা সমাপন করার পর যেদিন দাম্পত্য জীবনে পা দিয়েছিলেন সেদিনও তিনি অতি সাধারণ এক যুবতী মাত্র। সৈনিক স্বামীর অনুপস্থিতিতে ব্যস্ততার খোপ খুঁজতে গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতার জীবনকে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন বিবাহের বছরেই। শিক্ষক হিসেবে দক্ষতার পরিচয় রেখে প্রধান শিক্ষকের মর্যাদা অর্জন করলেন। গ্রাম থেকে গ্রামে চষে বেরিয়েছেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। যে প্রতিষ্ঠানেই যেতেন তিনি সেই প্রতিষ্ঠানই আবিষ্কার করতো একজন মমতাময়ী মাকে। টানা ৩০ বছর অগণিত শিক্ষার্থীকে জীবন আলোকিত করবার দেশনায় সিক্ত করেছিলেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি একজন সফল মা। যমজ দুই সন্তান আপন ও জীবনকে সুশিক্ষিত সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে দেশের কল্যাণে নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর এক সন্তান সেনাবাহিনীতে, আরেকজন সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। নিজের অবসর ও অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক স্বামীকে নিয়ে মির্জাপুরে পড়ে থেকেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। ইচ্ছে করলেই সন্তানদের শহুরে বাসস্থানে চলে যেতে পারতেন কিন্তু মাটির মমতায় আপাদমস্তক বিজড়িতা জননী হয়ে আমৃত্যু থেকে গেলেন ছায়ামায়াময় পল্লীর আঁচলেই।

সাধুমিত্রা বড়ুয়া কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন অনেকেরই নির্ভরতার আশ্রয়। তাই ৮ জানুয়ারির বিকেলটা বড়ুয়া পাড়ার সিকদার বাড়িতে এক অমোচনীয় বেদনার ছায়া নেমে আসে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই দলে দলে তাঁর সন্তানতুল্য অগণিত ছাত্রছাত্রী, গুণগ্রাহী, সহকর্মী, আত্মীয় পরিজন এসে ভিড় জমালেন। বিরহের বিষন্ন অশ্রু দিয়ে বুকভাঙা বিদায়ের আরতি গাইতে গাইতে একজন অকৃত্রিম মমতাময়ীকে অন্তিম অভ্যর্থনার জন্য সাজিয়ে তুললেন সবাই। ৯ জানুয়ারি বড়ুয়া পাড়ার মহাশ্মশানে তাঁর দেহাবসানের অগ্নিশিখা ধীরে ধীরে নিভে গেলো। মমতাময়ী হারানোর বেদনায় অশ্রুসদৃশ শিশিরও যেন সেদিন ঝরছিলো অবারিত।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅন্তর্স্রোতের অনুকূলে যাত্রা : ভাবনার রূপান্তরেই সাফল্যের আহ্বান
পরবর্তী নিবন্ধআলোকময় ঈদে মেরাজুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম